অনন্য উচ্চতার এক রাজনীতিক সৈয়দ আশরাফ

অঘোর মন্ডল
অঘোর মন্ডল অঘোর মন্ডল , এডিটর, দীপ্ত টিভি
প্রকাশিত: ১০:০৯ এএম, ০৬ জানুয়ারি ২০১৯

তিনি চলে গেলেন! নাকি আমরা তাঁকে হারালাম! গণমাধ্যমে শিরোনাম যাই হোক নির্মম সত্য হচ্ছে সৈয়দ আশরাফ আর নেই। তবে রাজনীতিবিদ সৈয়দ আশরাফ বছর দুয়েক আগেই ক্রমশ অন্তরালে চলে যান। এবার আক্ষরিক অর্থেই তিনি বিদায় নিলেন।

তাঁর চলে যাওয়ার মানে- একজন সজ্জন, পরিচ্ছন্ন এবং দূরদৃষ্টি সম্পন্ন রাজনীতিবিদের জীবনাবসন নয়। এটা খানিকটা শাব্দিক এবং আলঙ্কারিক ব্যাখ্যা। আগামীর ইতিহাস তাঁকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে সেটা সময় বলে দেবে। তবে আপাত মনে হচ্ছে সৈয়দ আশরাফের জীবনাবসান মানে একটা যুগাবসানও বটে।

যুগাবসান। শব্দটা নেহাত লেখার জন্য লেখা নয়। বলার জন্য বলা নয়। বিশ্বাস থেকে লেখা। কারণ, রাজনৈতিক ভদ্রতা আপাতত বিগত যুগের স্মৃতি। সেই স্মৃতিটুকুকেও মনে হচ্ছে সংগে করে নিয়ে গেলেন সৈয়দ আশরাফ। জনপ্রিয়তামুখি রাজনীতির স্রোত এখন বাংলাদেশের বুকে। সেই স্রোতে তিনি ভাসেননি। আবার জনপ্রিয়তার পেছনেও তিনি ছোটেননি! অথচ তিনি অসম্ভব এক জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব!

তাঁর মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে গণমাধ্যমে হাজার শব্দে অজস্র কণ্ঠে সেই শব্দটা লেখা হলো। বলা হলো। সৈয়দ আশরাফের চলে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে দেশজ রাজনীতির অন্যরকম এক রুগ্ন চেহারা আরো স্পষ্ট হলো। কেন?

তার হয়তো একটা বড় রকম ব্যাখ্যা দাবি রাখে। কিন্তু অল্প কথায় এইটুকু বলা যায়; ক্ষমতায় থেকেও তিনি কখনও বোঝাতে চাননি তিনি ক্ষমতাবান। সেটা মুখের ভাষায়। শারীরিক ভাষায়। কিংবা কাজে! এই জায়গায় তিনি কী অন্যদের থেকে আলাদা হয়ে গেলেন না? অথচ তিনি ছিলেন দেশের সবচেয়ে প্রবীণ এবং ঐতিহ্যবাহী একই সংগে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের সাধারণ সম্পাদক।

দু'টো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলেছেন। তাঁকে ফোনে পাওয়া যায় না! তিনি অফিসে ঠিক সময়ে যেতে পারেন না! এরকম অনেক কথা তাঁর দলের নেতা-কর্মীদের মুখে শোনা গেছে। অথচ তাঁর মন্ত্রণালয়ে ফাইলের গায়ে ধুলো পড়েনি। কোন ফাইল জমে থাকেনি।

মন্ত্রী হিসেবে তাঁর দক্ষতা-সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস তাঁর শত্রুরাও তুলতে পারবেন না। আগেও পারেননি। ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদককে তাঁর দলীয় কর্মীরা পাননা! এরকম একটা অনুযোগ যারা তুলেছেন এখন তাঁরাও টের পাচ্ছেন তাঁর অনুপস্থিতি।

সৈয়দ আশরাফের জন্ম রাজনৈতিক পরিবারে। সব সময় রাজনীতির ভেতরেই ছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক প্রচার-প্রচারণা এসব থেকে সযত্নে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পেরেছেন। আওয়ামী পরিবারে তাঁর জন্ম। বাবা সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি।

southeast

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু আর তাঁর আদর্শের প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে গেছেন। বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী হিসেবে সৈয়দ আশরাফ সেই আদর্শের পতাকাটাকে উচিয়ে রেখেছেন নিজের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত। এই জায়গায়ও তিনি দৃষ্টান্তমুলক উচ্চতার রাজনীতিক।

সৈয়দ আশরাফের দায়বদ্ধতা ছিল তাঁর দলের কাছে। নেতার কাছে। তবে তার চেয়েও বেশি দায়বদ্ধ ছিলেন তিনি আদর্শের কাছে। নৈতিকতার কাছে। বিবেকের কাছে। নিজের বিবেক-বুদ্ধি-নীতিকে বিসর্জন দিয়ে তিনি রাজনীতি করেননি। দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে বর্তেছিল এক বৈরি সময়ে। ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ সময়ে দলকে সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় রাখার কঠিন চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করেছিলেন তিনি।

দলের সভানেত্রী জেলে। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ফাঁদে পা দিয়েছিলেন দলের অনেক সিনিয়র-জুনিয়র নেতা। সেই সময় দলকে সাংগঠনিকভাবে সুসংহত রাখার কাজটা কারেছেন তিনি নিভৃতচারীর মত। দলকে আট বছর পর ক্ষমতায় ফেরালেন। দল তাঁকেই আবার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে রাখলো।

কিন্তু সময়টা আবার বৈরি। কারণ, বিরোধী দল সন্ত্রাস আশ্রয়ী রাজনীতির পথ বেছে নিলো। সেই সময় অবিচল থেকেছেন ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে।

কঠিন সময় পার করে দলকে টানা দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আনলেন সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। এরপর তিনি যখন দায়িত্ব থেকে সরে গেলেন ২০১৬ সালের অক্টোবের। আবেগময়ী কিন্তু যুক্তিনির্ভর বিদায়ী বক্তৃতায়ও তিনি আশার কথা জানিয়ে গিয়েছিলেন আবার ক্ষমতায় আসতে হবে আওয়ামী লীগকে।

তিনি ব্যাংককে হাসপাতালের বিছানায় শুনে জেনে গেছেন তাঁর দল বিশাল জয় নিয়ে ক্ষমতায়। সবাই যেদিন নতুন ভাবে শপথ নিলেন সংসদ সদস্য হিসেবে। সেই দিন তিনি পাড়ি জমালেন না ফেরার দেশে।

মিডিয়ার এই বিস্ফোরণের যুগেও সৈয়দ আশরাফ বেশি পছন্দ করতেন মিডিয়া থেকে দূরে থাকতে। এবং সেটা সযত্নে, সচেতনভাবে। তবে তিনি যখন মিডিয়ায় কথা বলতেন তখন সেটা বহুমাত্রিক অর্থ নিয়ে ধরা দিত রাজনৈতিক সমাজে।

২০০৬ সালে ২১ এ জানুয়ারি ঘোষিত নির্বাচনে মহাজোটের সবাই যখন মনোনয়পত্র জমা দিয়ে প্রচারণাও নেমে পড়েছিলেন, সেই সময় নিজের নির্বাচনী এলাকায় এক মতবিনিময় সভায় তিনি বলেছিলেন; 'সবাই নির্বাচন দেখছেন। আমি কিন্তু নির্বাচন বাদে অন্য কিছুই দেখছি।' কি দেখতে পাচ্ছিলেন সেটা আজ ইতিহাস। ওয়ান ইলেভেন। এই হচ্ছেন সৈয়দ আশরাফ।

রাজনীতিতে যখন যুক্তি ও বুদ্ধির অভাব দেখা দেয়, তখন শুরু হয় কুকথার স্রোত। নীতি ও আদর্শের ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে যে রাজনীতি সেখানে কুকথা বা সস্তা মন্তব্যের কোন ঠাঁই নেই। সেই বিশ্বাস থেকে এক চুলও সরেননি তিনি জীবনের শেষ মুহূর্তপর্যন্ত। তাঁর মৃত্যুর পর মনে হচ্ছে, আক্ষরিক অর্থেই আদর্শ-নৈতিকতা-বিবেকের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা একটা যুগের পদধ্বনি থেমে গেলো কী! শেষ বাক্যটাকে অসত্য প্রমাণের দায়িত্ব আগামী দিনের রাজনীতিবিদদের।

লেখক: সিনিয়র জার্নালিস্ট ও কলামিস্ট।

এইচআর/এমএস

‘মিডিয়ার এই বিস্ফোরণের যুগেও সৈয়দ আশরাফ বেশি পছন্দ করতেন মিডিয়া থেকে দূরে থাকতে। এবং সেটা সযত্নে, সচেতনভাবে। তবে তিনি যখন মিডিয়ায় কথা বলতেন তখন সেটা বহুমাত্রিক অর্থ নিয়ে ধরা দিত রাজনৈতিক সমাজে।’