শেখ হাসিনাই পারেন, পারবেনও

মোস্তফা কামাল
মোস্তফা কামাল মোস্তফা কামাল , সাংবাদিক
প্রকাশিত: ০৯:৩২ এএম, ০৯ জানুয়ারি ২০১৯

অনন্য উচ্চতা নিয়ে চতুর্থ বারের মতো ক্ষমতার স্টিয়ারিংয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নানা ঘটনা, সময়, পরিস্থিতিও তাকে এই ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে এসেছে। রাজনীতিতে চমকের সঙ্গে ম্যাজিক প্রদর্শনেও তার সমকক্ষ কেউ নেই। চ্যালেঞ্জ জয়ে পারঙ্গমতাসহ উচ্চতার এ ভিন্নতা এখন শেখ হাসিনার প্রতিটি পদক্ষেপেই। সব প্রতিকূলতা-সমালোচনা ভেদ করে ড্যামকেয়ারে এবার শুধু বিজয়ের নোঙ্গরে নৌকাই ভেড়াননি, কেবিনেট সাজিয়েছেন একেবারে নিজের খাসপছন্দে। বঞ্চিতদেরও টুঁ শব্দ করার হিম্মত হয়নি। আমাদের কুমিল্লার আঞ্চলিক ভাষায় একে বলে, রাও করার ভাও নাই।

৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের মাধ্যমে আবারও প্রমাণ হয়েছে শেখ হাসিনার ভিন্ন উচ্চতা। প্রতিপক্ষ নিশ্চিৎ- আন্দোলন বা রাজনৈতিকভাবে তাকে পরাজিত করা অসম্ভব। কিন্তু ‘অচেনা শত্রু’ কি তা ভাবছে? রাজনীতির ভাষায় এদের বিভীষণও বলা হয়। শেখ হাসিনা তার চেনা শত্রু দমনে যে ম্যাজিক দেখিয়েছেন, বিভীষণদের শায়েস্তা করতে ততো না-ও লাগতে পারে। তিনি সেটা করবেন কি-না বা পারবেন কি-না?- ঘুরপাক খাচ্ছেই প্রশ্নটি। কারো সন্দেহ নেই চাইলেই তিনি অসম্ভব অনেক কিছুকে সম্ভব করতে পারেন, পেরেছেন। পারবেনও।

ইস্পাত কাঠিন্যে লুজ দেওয়া বা এ অবস্থা থেকে পিছু হটার সুযোগও শেখ হাসিনার আর নেই। চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই-এ কথা মাঝেমধ্যেই জানান দিচ্ছেন তিনি। চারবারের মতো শপথ নেয়ার অভিষেক অনুষ্ঠানেও তার ভাবগাম্ভীর্যে মনে হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীত্ব তার কাছে এখন তেমন প্রাপ্তি বা অর্জনের বিষয় নয়, বরং স্রেফ দায়িত্ব। তার চতুর্থবারের মতো শপথের দিনটিতেই রাজধানীতে গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলন। সহিংসতা। মিরপুরে আধিপত্যের লড়াইয়ে ছাত্রলীগের হাতে যুবলীগ কর্মী খুন। ঘটনাগুলো ভালো বার্তা দেয় না।

শেখ হাসিনার ক্যারিশমায় চেনা শত্রু নিপাত গেছে। বিএনপি রিক্ত, জীর্ণ। ভোটের ম্যাজিকে নিঃস্ব। কিন্তু এমন ফাঁকামাঠে অচেনা শত্রু মোটাতাজা হচ্ছে কি-না, প্রশ্নটি সামনে আসছে শপথের দিনের দুটি ঘটনায়। প্রধানমন্ত্রী তা সামলে ফেলার ক্ষমতা রাখেন বলে আলোচনাও ব্যাপক।

নির্বাচনে মহাজোটগতভাবে জিতে সরকারে একদলীয় হয়ে যাওয়ার মধ্যেও শেখ হাসিনার সাহস ও অন্য উচ্চতার প্রকাশ পেয়েছে। নতুন মন্ত্রিসভা নিয়ে কারো কারো প্রশ্ন - আওয়ামী লীগ একলা কেন? নতুন মন্ত্রিসভায় জাতীয় পার্টিকে রাখা হয়নি। নেই ১৪ দলের অন্য শরিকরাও। এর আগে তিনবারের একবারও শেখ হাসিনা একলা হননি। দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা একা দেশ চালাননি। এ সময় তিনি মন্ত্রিসভা গঠন করেন জাতীয় পার্টি এবং তৎকালীন জাসদ (রব)-কে নিয়ে।

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ একা দুই তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ঐ মন্ত্রিসভায় প্রথমে জাতীয় পার্টি, পরে জাসদ (ইনু) কে নেয়া হয়। পরে ওয়ার্কাস পার্টির নেতা রাশেদ খান মেননও মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হন। ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের পর প্রধান বিরোধী দল হয়েও সরকারে শরীক করে জাতীয় পার্টিকে। সঙ্গে নেয় জেপি, জাসদ (ইনু) এবং ওয়ার্কার্স পার্টিকেও। এবার বিএনপিকে আচ্ছা নাকানি- চুবানি খাওয়ানোর পর গঠিত সরকারে আওয়ামী লীগ কেন সাথী করেনি মিত্রদের? তা উপেক্ষানীতি? না-কি এটাও কোনো চমক?

যদিও আওয়ামী লীগ বলা হয়েছে, এটা একটা ধাপ মাত্র। কিছুদিনের মধ্যেই আসবে নতুন ধাপ। তখন ১৪ দলের শরিকদের থেকে দু’একজন মন্ত্রী নিয়ে আরেক চমক দেখানো হবে। সেই চমকে রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু বা আনোয়ার হোসেন মঞ্জুদের মন্ত্রী না করে শিরিন আক্তার, ফজলে হোসেন বাদশার মতো কাউকে অন্তর্ভুক্ত করেও অতি চমকও আসতে পারে।

চমক তৈরির পর্যাপ্ত রসদ রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর হাতে। সেই ম্যাজিকও তিনি জানেন। যার জেরে বাদ পড়াদের নিয়ে সমালোচনা তেমন নেই। তবে, আলোচনা চলছে তাদের বাদ পড়ার রহস্য নিয়ে। তাদের মধ্যে কয়েকজন টানা আর কয়েকজন সময়ে সময়ে বিতর্কিত। বেশি সমালোচিত-বিতর্কিত শাজাহান খান। নৌমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা এই শ্রমিক নেতা নানা কারণে সমালোচিত হয়েছেন বিগত সরকারের আমলে।

বিতর্কিত ভূমিকার কারণে সড়ক দুর্ঘটনা এবং সড়ক খাতে কোনো কিছু হলেই আলোচনায় আসে পরিবহন খাতের নেতা ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের নাম। সড়ক দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থীর প্রাণহানির ঘটনায় তার দাঁত কেলানো হাসি সরকারকে বাড়তি ঝামেলায় ফেলে দেয়। এরপর আসে ধর্মমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের নাম। ধর্মমন্ত্রী থাকাকালে হজ্ব নিয়ে কয়েকদফায় গণ্ডগোল পাকান তিনি। সমলোচিত ছিলেন আত্মীয়-স্বজনের অপ্রিয় কর্মকাণ্ডের জন্যও।

আরেকজন মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। পুত্রদের ও কন্যার জামাতাকে ঘিরে বিতর্ক পিছু ছাড়েনি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণের দায়িত্বে থাকা এই মন্ত্রীর। আওয়ামী লীগের শুরু হওয়া ১৯৯৬ সালে শাসনকালের মেয়াদে মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে বড় ছেলে দীপু চৌধুরীকে ঘিরে নানা কাহিনী গোটা সরকারকেই বিব্রত করে।

বিদায়ী রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক সমালোচনার পাশাপাশি বিয়ে-সাদী, যমজ বাচ্চা জন্ম দেওয়াসহ ব্যক্তিগত কিছু বৈশিষ্ট্যের কারণে তাকে নিয়ে রসঘন আলোচনা ছিল। তবে, সমালোচিত ছিলেন রেলের দুর্ভোগ নিয়ে। বাদ পড়া আরেকজন শামসুর রহমান ডিলু । একদিকে বয়সের ভার অন্যদিকে পরিবারে বিরোধ ও স্বজনপ্রীতির পাশাপাশি ও দলীয় কর্মীদের অবমূল্যায়নের অভিযোগও ছিল এই বিদায়ী ভূমিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বাদ পড়া নুরুল ইসলাম নাহিদও আলোচনায় হটকেক।

গুরুতর অভিযোগ না থাকার পরও মন্ত্রিসভায় ঠাঁই না পাওয়াদের মধ্যে সব’চে আলোচিত আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী। আরো রয়েছেন আসাদুজ্জামান নূর, মির্জা আজম, ইসমত আরা সাদেক, মেহের আফরোজ চুমকি। শেখ হাসিনাই পারেন, পারছেন, পারবেন তা বোঝা ও মানার সুফল পেয়েছেন ডা. দীপু মনি, ড. হাছান মাহমুদ, ড. মো. আবদুর রাজ্জাক, মুন্নুজান সুফিয়ানরা।

এর আগে নবম জাতীয় সংসদের মন্ত্রিসভায় থাকলেও দশম জাতীয় সংসদের মন্ত্রিসভায় স্থান না পাওয়া এ চারজনকে এবার ফিরিয়ে আনা শেখ হাসিনার সক্ষমতা ও ক্যারিশমার উদাহরণ। গেল মন্ত্রিসভায় ঠাঁই না পাওয়ায় তারা হতাশ হননি। টুঁ শব্দও করেননি। লেগে থেকেছেন। শেখ হাসিনার ভিন্ন উচ্চতার সুফল পেয়েছেন তারা।

বাদ পড়াদের অন্যতম আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, মোহাম্মদ নাসিমের মতো হেভিওয়েটরাও সময়ান্তে প্রধানমন্ত্রীর এই উচ্চতা দেখেছেন। ভুগেছেন। আবার পেয়েছেনও। সেই বোধ-বুদ্ধির প্রকাশও তারা ঘটিয়েছেন। তোফায়েল আহমেদ, নুরুল ইসলাম নাহিদ, শাজাহান খানদের বলতে হয়েছে, নতুনদের জায়গা দিতে হয়। নতুন মন্ত্রিসভা ভালো হয়েছে। নতুনরা ভালো করবেন।

আওয়ামী লীগকে শেখ হাসিনা অতিমাত্রায় বামাসক্ত করে ফেলেছেন বলে সমালোচনা ছিল। যার উদাহরণ আওয়ামী লীগ সরকারের বিগত আমলগুলোতে বাম ঘরানার মন্ত্রিত্বের আধিক্য । ২০০৮ সালের মন্ত্রিসভায় বেশ কয়েকজন ছাত্র ইউনিয়ন থেকে উঠে আসা মন্ত্রী ছিলেন। তাদের মধ্যে আবুল মাল আবদুল মুহিত, ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, বেগম মতিয়া চৌধুরী, নুরুল ইসলাম নাহিদ, রাশেদ খান মেনন, আব্দুল মান্নান, দিলীপ বড়ুয়া, ইয়াফেস ওসমান অন্যতম। এবার দেখিয়ে দিয়েছেন কি-না পারেন তিনি? একমাত্র স্থপতি ইয়াফেস ওসমান ছাড়া সব সাফা করে দিয়েছেন। ইয়াফেস ওসমানও রয়েছেন টেকনোক্র্যাট কোটায়।

টানা প্রায় ৩৮ বছর ধরে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের দলীয় প্রধানের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সরকারেও লাগাতার উচ্চতার প্রমাণ রাখার সুযোগ শেখ হাসিনারই। চারবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকার এমন দৃষ্টান্ত বাংলাদেশে আর নেই। টানা তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার এ রেকর্ড তারই। এরইমধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় প্রধানমন্ত্রী থাকা ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা থাকার রেকর্ডও শেখ হাসিনার।

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন।

এইচআর/পিআর

টানা প্রায় ৩৮ বছর ধরে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের দলীয় প্রধানের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সরকারেও লাগাতার উচ্চতার প্রমাণ রাখার সুযোগ শেখ হাসিনারই। চারবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকার এমন দৃষ্টান্ত বাংলাদেশে আর নেই। টানা তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার এ রেকর্ড তারই। এরইমধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় প্রধানমন্ত্রী থাকা ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা থাকার রেকর্ডও শেখ হাসিনার

আপনার মতামত লিখুন :