নতুন মন্ত্রিসভা ও প্রত্যাশার পারদ

আমীন আল রশীদ
আমীন আল রশীদ আমীন আল রশীদ , সাংবাদিক, কলামিস্ট
প্রকাশিত: ০৬:৫৬ এএম, ১১ জানুয়ারি ২০১৯

 

১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গার বোঝা যখন বাংলাদেশের কাঁধে, ঠিক তখনই গণমাধ্যমে খবর এসেছে, ভুয়া পাসপোর্ট ও কাগজপত্র ব্যবহার করে সৌদি আরবে পাড়ি জমানো কয়েকশো রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাচ্ছে রিয়াদ।

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই (এমইই)-এর খবর অনুযায়ী, জেদ্দার শুমাইসি ডিটেনশন সেন্টারে পাঁচ থেকে ছয় বছর ধরে বন্দি রয়েছেন ওই রোহিঙ্গারা। বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিরোধিতা করায় তাদের কয়েকজনকে হাতকড়া পরিয়ে রাখা হয়েছে বলেও খবরে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাখাইনে মিয়ানমার সরকারের জাতিগত নিধনের শিকার হয়ে দলে দলে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ঢল যখন বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক নানা বিষয়ে বেজায় চাপ তৈরি করে, তখন আরেক উদ্বেগের খবর আসে প্রতিবেশী ভারতের আসাম রাজ্য থেকে। সেখানেও সংখ্যালঘু মুসলমানরা বড় ধরনের সংকটে রয়েছেন।

আসামে কথিত অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করতে যে নাগরিক নিবন্ধন করেছে রাজ্য সরকার, সেই তালিকায় বাদ পড়া মুসলমানরাও একসময় বিতাড়িত হয়ে রোহিঙ্গাদের মতো বাংলাদেশে চলে আসতে বাধ্য হয় কি না, সেই আশঙ্কাও অনেকে উড়িয়ে দিচ্ছেন না।

ফলে একরকম জটিল কূটনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির চ্যালেঞ্জ নিয়ে যিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন, তার আগামীর পথচলা যে খুব কুসুমাস্তীর্ণ হবে না, তা চোখ বন্ধ করেই বলে দেয়া যায়। ফলে এসব সমস্যার সমাধানে নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে মানুষের প্রত্যাশার পারদও বেশ উঁচুতে। এই চাপ সামলাতে কতটা প্রস্তুত মি. এ কে আব্দুল মোমেন?

তার আরেকটা পরিচয় তিনি সদ্য বিদায়ী অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের ভাই। শিক্ষিত ও সজ্জন বলে পরিচিত। কাজ করেছেন জাতিসংঘে বাংলাদেশ মিশনের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনীতির কূটচাল সম্পর্কে তিনি সম্যক অবহিত বলেই ধরে নেয়া যায়। প্রশ্ন হলো, সেই জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা তিনি কতটা কাজে লাগাতে পারেন, তারউপর নির্ভর করবে আগামী বাংলাদেশ রোহিঙ্গা কূটনীতিতে কতটা সফল হবে অথবা ব্যর্থ।…

২.
মি. মোমেনের ভাই আবুল মাল আবদুল মুহিত বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের অর্থমন্ত্রী এবং টানা ১০টি বাজেট দিয়ে রেকর্ড করেছেন। কিন্তু তার অস্বস্তি বা ব্যর্থতাও খুব কম নয়। বিশেষ করে তিনি অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকাকালে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি, ব্যাংকে খাতে অভাবনীয় লুটপাট, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অনিয়ম মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। ফলে নতুন অর্থমন্ত্রী হিসেবে যিনি দায়িত্ব নিলেন, তিনি অর্থের সঙ্গে যুক্ত পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করলেও এবার কাঁধের ওপর বোঝাটা আরও অনেক ভারী।

আ হ ম মুস্তফা কামাল এই চাপ কতটা সামলাতে পারবেন বা এই ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়বেন কি না, তারউপর অনেকটাই নির্ভর করবে আগামীতে দেশের অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি। বিশেষ ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং অতীতের দুর্নীতির বিচারের উদ্যোগ তিনি নেবেন, এই প্রত্যাশা জনমনে আছে। ফলে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো তার কাছেও জনপ্রত্যাশার পারদ বেশ উঁচুতে।

৩.
একসময়ের বামপন্থি নেতা, নুরুল ইসলাম নাহিদের সততা নিয়ে কারো প্রশ্ন ছিল না। কিন্তু গত এক দশকে যে কয়টি মন্ত্রণালয় বিতর্কিত হয়েছে, নিঃসন্দেহে শিক্ষা তার অন্যতম। পাবলিক ও নিয়োগ পরীক্ষায় নকল, প্রশ্ন ফাঁস, ভর্তি জালিয়াতি, জিপিএ ফাইভের নামে অসুস্থ প্রতিযোগিতার চর্চা এবং পিইসি ও জেএসসি নামে শিশুদের পাবলিক পরীক্ষা চালু করে পড়ালেখাকে আতঙ্কের বিষয়ে পরিণত করা হয়েছে তার আমলেই। যদিও যেসব অনিয়ম হয়েছে, তার অনেকগুলোই আইনশৃঙ্খলার সাথে যুক্ত। কিন্তু তারপরও শিক্ষান্ত্রী হিসেবে মি. নাহিদ এগুলোর দায় এড়াতে পারেন না।

এবার শিক্ষামন্ত্রী করা হলো ডা. দিপু মনিকে যিনি বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনিও শিক্ষিত ও সজ্জন হিসেবেই পরিচিত। ফলে শিক্ষাব্যবস্থায় এখন যে অরাজকতা চলছে বলা যায়, সেই অরাজকতা দূর করতে তিনি কতটা পদক্ষেপ নিতে পারবেন, তা বলা কঠিন। কারণ শিক্ষা এখন একটি বিশাল ব্যবসা।

এই ব্যবসার সাথে বহু মাফিয়া জড়িত। ফলে তার নিজের আন্তরিকতা এবং সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা যতই থাকুক, এই মাফিয়া তথা দুষ্টুচক্র ভেদ করে তিনি কতটা কী করতে পারবেন তা বলা মুশকিল। তবে দিপু মনির সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে রয়েছেন তরুণ নেতা মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল; চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর ছেলে। যিনি এরইমধ্যে নিজের যোগ্যতা ও দক্ষতার সাক্ষর রেখেছেন।

টেলিভিশনে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার কথাবার্তা শুনে মনে হয়েছে, তিনি ভালো কিছু করতে চান। সুতরাং দিপু-নওফেল জুটি যদি দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একটা গুণগত পরিবর্তন আনতে পারেন, বিশেষ করে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধ তথা বেসরকারি স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে টাকার খেলা বন্ধ করতে পারেন, শিক্ষাকে ব্যবসা নয় বরং অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে মোটামুটি একটা উদ্যোগ নিতে পারেন, শিক্ষার্থীদের কাস্টমার বানানোর ভয়াবহ প্রবণতা দূর করার ক্ষেত্রে উদ্যোগ নিতে পারেন, জাতির কাছে তারা নমস্য হয়ে থাকবেন।

৪.
আগের মন্ত্রিসভার হাতে গোনা যে কয়জন নতুন মন্ত্রিসভায়ও জায়গা পেয়েছেন, তাদের অন্যতম ওবায়দুল কাদের। অনেক দিন ধরেই সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয় সামলাচ্ছেন। তার আমলেই নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো বিশাল প্রকল্পের কাজ শুরু ও দৃশ্যমান হয়েছে। যদিও সড়কে মৃত্যুর মহামারি রোধে তিনি যে আশানুরূপ কোনো সাফল্য পাননি, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ নিরাপদ সড়কের দাবিতে তার আমলেই দেশের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব কিশোর আন্দোলন গড়ে ওঠে। পক্ষান্তরে প্রতি দুই ঈদে মানুষের ঢাকা ত্যাগ ও ঢাকায় ফেরা নির্বিঘ্ন করতে তিনি নিজে যেভাবে রাস্তায় দৌড়ঝাঁপ করেন, অতীতের কোনো সড়ক বা যোগাযোগমন্ত্রীকে ততটা তৎপর দেখা যায়নি।

তবে মি. কাদেরের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ দ্রুত পদ্মা সেতুর কাজ শেষ করা এবং এর খরচের লাগাম টেনে ধরা। এরইমধ্যে এর নির্ধারিত বাজেট অনেক ছাড়িয়ে গেছে। কারণ নির্ধারিত সময়ে এর কাজ শেষ হয়নি। কাজ শেষ হতে যত বিলম্ব হবে, এর খরচও হুহু করে বাড়তে থাকবে। যেহেতু এটা নিজস্ব অর্থায়নে হচ্ছে, ফলে এর এক টাকা খরচ বাড়লেও সেটা কোনো না কোনোভাবে দেশের মানুষের কাছ থেকেই আদায় করা হবে। সেইসাথে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং মেট্রোরেলের কাজ শেষ করার চ্যালেঞ্জও তার সামনে রয়েছে। এসব কাজের মান নিশ্চিত করা এবং সেইসাথে বড় প্রকল্পে বড় দুর্নীতি ঠেকানোর প্রত্যাশাও রয়েছে।

৫.
বাংলাদেশের ইতিহাসে আসাদুজ্জামান খাঁন কামালই সম্ভবত একমাত্র স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, যিনি টানা ৫ বছরে একটি বেফাঁস মন্তব্য করেননি যা গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়। তার পূর্বসূরিদের কেউই বিতর্কের উর্ধ্বে থাকেননি। একটা সময়ে মানুষের ধারণা এমনই হয়েছে যে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মানেই একটা বেফাঁস মন্তব্য এবং তা নিয়ে রসিকতা।

আল্লাহর মাল আল্লায় নিয়া গেছে; লুকিং ফর শত্রুজ; ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সাগর-রুনির হত্যাকারী গ্রেপ্তার করা হবে; দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো; বিএনপির লোকেরা পিলার নাড়িয়েছে বলে রানা প্লাজা ধসে পড়েছে ইত্যাদি মন্তব্য করে বিতর্কিত হয়েছেন অতীতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা। কিন্তু মি. কামাল পুরো মেয়াদে স্বল্পভাষী, স্থির এবং ঠাণ্ডা মাথার ব্যক্তি হিসেবেই পরিচিত থেকেছেন।

তার আমলে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ জঙ্গি হামলা হলি আর্টিজান ট্র্যাজেডি হলেও জঙ্গি দমনেও অভাবনীয় সাফল্যও এসেছে তার হাত ধরেই। তবে বেশ কিছু অভিযানে সাফল্য আসা এবং তালিকাভুক্ত অধিকাংশ শীর্ষ জঙ্গি নিহত হলেও তাদের দোসররা কোথায় কীভাবে কোন নাশকতার ছক আঁকছে, তা নিশ্চিত নয়। ফলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সামনে এখনও এটি একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সামনে একটি বড় চ্যলেঞ্জ পুলিশ বাহিনীতে সুশাসন নিশ্চিত করা তথা দুর্নীতি বন্ধ করা। একশো ভাগ দুর্নীতি বন্ধ করা আদৌ সম্ভব কি না তা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ থাকলেও অন্তত পুলিশ বাহিনীতে শুদ্ধি অভিযানটা শুরু করা দরকার। সাধারণ মানুষের মনে যে থানা ও পুলিশভীতি রয়েছে, সেটি দূর করতে তিনি এই মেয়াদে উদ্যোগ নেবেন— এমন প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের মনে আছে।

৬.
সাংবাদিক হিসেবে আমার বিশেষ আগ্রহ তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদের ব্যাপারে। অতীতে বন ও পরিবেশ এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই রাজনীতিকের এখন মূল কাজ হবে সরকারের মুখপাত্র হিসেবে সব বিষয়ে গণমাধ্যমকে অবহিত করা। তার সামনে যতটা না চ্যালেঞ্জ তার চেয়ে তার কাছে সাংবাদিকদের প্রত্যাশার পরিমাণ অনেক বেশি। নিয়মিত নানা অনুষ্ঠানে সমসাময়িক বিষয়ে বক্তব্য দিয়ে এমনিতেই আলোচিত হাছান মাহমুদ।

এখন সাংবাদিকদের সঙ্গে তার সম্পর্কের রসায়নটা কেমন হবে, তারউপর নির্ভর করবে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ঘাড়ে বছরের পর বছর যে সমস্যাগুলো জগদ্দল পাথরের মতো চেপে আছে, বিশেষ করে এখানে পেশাদারিত্বের যে ভয়াবহ সংকট— সেই সংকট মোকাবিলায় তিনি কতটা গণমাধ্যমের বন্ধু হবেন, তারউপর অনেকটাই নির্ভর করবে আগামীর গণমাধ্যমের গতিপ্রকৃতি।

তথ্যপ্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারার আতঙ্ক না কাটতেই যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে সাংবাদিক সমাজের তরফে বারবার উদ্বেগ জানানো হয়েছে, এমনকি ভোটের পরদিনও খুলনায় একজন সাংবাদিককে এই আইনে গ্রেপ্তার করা হলো, তাতে তার কাছে সাংবাদিক হিসেবে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, এই আইনটি আর যাই হোক, কোনো পেশাদার সাংবাদিকের বিরুদ্ধে যেন ব্যবহৃত না হয়, হাছান মাহমুদ সেটি নিশ্চিত করবেন।

তথ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি গণমাধ্যমকে সরকারের উন্নয়ন অংশীদার ভাবার পাশাপাশি প্রতিটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান তার সম্পাদকীয় নীতি মেনে স্বাধীনভাবে চলতে পারে, সেটি নিশ্চিত করার পথে কোনো ধরনের বাধা তৈরি না করে বরং সহায়তা করবেন—সেই প্রত্যাশা।

লেখক : সাংবাদিক।

এইচআর/এমএস

‘দিপু-নওফেল জুটি যদি দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একটা গুণগত পরিবর্তন আনতে পারেন, বিশেষ করে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধ তথা বেসরকারি স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে টাকার খেলা বন্ধ করতে পারেন, শিক্ষাকে ব্যবসা নয় বরং অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে মোটামুটি একটা উদ্যোগ নিতে পারেন, শিক্ষার্থীদের কাস্টমার বানানোর ভয়াবহ প্রবণতা দূর করার ক্ষেত্রে উদ্যোগ নিতে পারেন, জাতির কাছে তারা নমস্য হয়ে থাকবেন।’

আপনার মতামত লিখুন :