রাজনীতির মত জনসমর্থনও বদলায়

মাসুদা ভাট্টি
মাসুদা ভাট্টি মাসুদা ভাট্টি , সাংবাদিক, কলামিস্ট
প্রকাশিত: ১২:৪৭ পিএম, ২৯ জানুয়ারি ২০১৯

৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচন সম্পর্কিত দেশের পরাজিত পক্ষটির দাবি ক্রমশঃ ম্রিয়মান হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে থেকে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের যে ভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জড়িয়ে ফেলা হয়েছিল তাতে মনেই হচ্ছিলো যে, নির্বাচনে কোনো রকম ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটলে এবার আর রক্ষা নাই, বিদেশিরা নতুন সরকারকে হয় স্বীকৃতি দেবে না, না হয় নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানাবে কিংবা চাপ দিয়ে সরকারকে নতুন নির্বাচন দিতে বাধ্য করাবে।

আর তার মানেই হচ্ছে এই মুহূর্তে যারা পরাজিত তাদের ক্ষমতাপ্রাপ্তি। কিন্তু নতুন সরকারের বয়স প্রায় এক মাস হতে চললো, কোনো দেশ বা পক্ষের পক্ষ থেকেই নতুন সরকারের প্রতি কোনো ধরনের চাপ এসেছে বলে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। উল্টো নির্বাচনের পর পরই বিশ্বের নতুন ও পুরাতন পরাশক্তির পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানানো হয়েছে এবং নতুন সরকারের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে।

সর্বশেষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট একটি চিঠি দিয়ে টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং নির্বাচন ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নিয়ে তার মতামত ব্যক্ত করেছেন। এরই মধ্যে বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা গিয়ে জড়ো হয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর চা-চক্রে। গণভবনের সবুজ লনে শীতের বিকেলকে আরও উজ্জ্বল করে দিয়ে কূটনীতিকরা নতুন সরকারকে আরো দৃঢ়তা দিয়েছে সামনের দিনগুলিতে কাজ করার জন্য।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ অন্যান্যদের সঙ্গে কূটনীতিকদের দেখে সেরকমই মনে হয়েছে। এর আরও একটি অর্থ হতে পারে, আর তাহলো, কূটনৈতিক-যুদ্ধেও পরাজিত হয়েছে বিএনপি-জামায়াত তথা ঐক্যফ্রন্টের রাজনীতি। কিন্তু তার অর্থ কি এটাই যে, কূটনীতিক বা বিদেশিরা আওয়ামী লীগ সরকারকে সকল ক্ষেত্রে ‘ওয়াক-ওভার’ বা সমর্থন দেওয়া অব্যাহত রাখবে? অতীত অভিজ্ঞতা সেটা বলে না।

বাংলাদেশের গুরুত্ব কেবল ভূ-রাজনৈতিক নয়, বাংলাদেশের গুরুত্ব আরো অনেক ক্ষেত্রেই এখন গুরুত্ববাহী। বিশেষ করে অর্থনীতি ও বাজার-অর্থনীতিতে বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশের গুরুত্ব যে কতোটা হতে পারে তা চীন আমাদের শিখিয়ে দিয়েছে। চলমান শতকের শূন্য দশকে চীন হঠাৎ করেই যেনো সিনেমার পোস্টারের মতোই বিশ্বময় তাদের শনৈঃ শনৈঃ অর্থনীতির জয়যাত্রা ঘোষণা করতে শুরু করলো। দিকে দিকে অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লো সেই বারতা।

মাত্র দুই দশকেই চীন এখন চলমান শতকের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ। চীনকে কেন্দ্র করেই এখন অনেক দেশের অর্থনীতি নির্মিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে ভারতও কম যায় না। ভারতও নিজেদের অর্থনৈতিক সঙ্গতিকে এমন এক পর্যায়ে উন্নীত করেছে যে, বিশ্বময় তার প্রভাব-প্রতিপত্তি কেবল বেড়েছে তাই-ই নয়, ব্রিটেনের মতো দেশের অর্থনীতিকে অতি দ্রুত ভারত ধরে ফেলতে সক্ষম হবে বলে বৈশ্বিক অর্থনীতির সূচকগুলো আমাদের জানাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে বিশ্বের বিস্ময়।

এতো দ্রুততার সঙ্গে যে বাংলাদেশ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পণ্ডিতদের পক্ষেও ভাবা সম্ভব হয়নি। কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিসরে যখন বাংলাদেশের এই অভাবনীয় উন্নয়নের সাফল্যগাথা উচ্চারিত হচ্ছে, তখন সকলেই নড়েচড়ে বসে একে ‘বাংলাদেশ প্যারাডক্স’ বলে চোখ কপালে তুলছেন।

যারা বিশ্বাস করেননি তারা মূলতঃ একারণেই করেননি যে, বাংলাদেশে একপক্ষ উন্নতি করতে চাইলে আরেকপক্ষ সেটা করতে দেবে না বলেই এতোদিন তারা জেনে এসেছেন এবং ভেবেছেন যে, রাজনৈতিক ভাবে এতো ভয়ংকর বিভক্তি আর শত্রুতা নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্ক কখনোই গড়ে উঠবে না আর জামায়াততো দেশের চিহ্নিত শত্রু, ফলে এই ত্রয়ী রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্যে একটি চতুর্থ ও অ-রাজনৈতিক শক্তি এদেশে দীর্ঘদিন ক্ষমতার ভরকেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে, যাদের সঙ্গে আবার বিদেশিদের সম্পর্ক কেবল ভালো তাই-ই নয়, বরং এই চতুর্থ পক্ষকে মূলতঃ বিদেশিরাই পরিচালিত করে এসেছে।

এতোগুলো পক্ষের টানাপড়েনে বাংলাদেশের পক্ষে খুব বেশি কিছু করা সম্ভবপর হবে না, এটাই ছিল ধারণা। কিন্তু ২০০৮ সালের নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশই যে ‘বাংলাদেশ প্যারাডক্স’ বা বিস্ময়কর বাংলাদেশ, তাতে কোনোই সন্দেহ নেই। কারণ, এরপর থেকেই বাংলাদেশকে আর কোনো ক্ষেত্রেই পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। অর্থনীতির সূচক যেমন উর্ধ্বমুখী হয়েছে তেমনই দুর্নীতির সূচক প্রতিবছরই নিন্মমুখী হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের সামনে কোনো বাধাই আর বাধা হয়ে থাকেনি।

কিন্তু আর কোনো পথ খুঁজে না পেয়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্র কমে যাচ্ছে বলে সর্বত্র জিকির তোলা হয়েছে। দেশে-বিদেশে বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে ওপরে কথিত সেই চতুর্থ বর্ণের অ-রাজনৈতিক পণ্ডিতেরা বাংলাদেশে তথাকথিত গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার জন্য লবিস্ট নিয়োগ করা থেকে শুরু করে নিজেদের শ্রম ও অর্থ খরচ করেছে। কিন্তু কোনোভাবেই তারা এই সত্যটি বুঝতে চায়নি যে, বাংলাদেশের মানুষ কী চায়।

মানুষের জীবন দিয়ে উপলব্ধি করা সত্যকে তারা যেমন বুঝতে চায়নি তেমনই চায়নি নিজেদের রাজনৈতিক শক্তিকে কাজে লাগাতে। একথা না হয় বোঝা গেলো যে, বিএনপি জন্মলগ্ন থেকেই একটি ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে ক্ষমতা-চর্চা করায় তারা ক্ষমতা ছাড়া অন্যকিছুই আর ভাবতে পারে না কিন্তু বিএনপি’র রাজনীতিটা কি এতোদিনেই এদেশের মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়েছে?

হ্যাঁ ভারত-বিরোধীতা, জামায়াতের জমজ ভাই হিসেবে পাকিস্তানপন্থী রাজনীতিকে এদেশে বাঁচিয়ে রাখা ছাড়া প্রকাশ্য কোনো রাজনীতি বা অর্থনৈতিক প্রোগ্রাম বিএনপি’র আছে বলে বোঝার উপায় নেই, অন্ততঃ গত দশ বছর ধরে আমরা সেটা জানতে পারিনি।

বরং সাধারণ জনগণ বার বার এটাই দেখেছে যে, বিএনপি-জামায়াত কেবলই যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে চায়, আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে নামাতে চায় এবং দুর্নীতির দায় থেকে তাদের নেতাকর্মীদের বাঁচাতে চায় এর বাইরে তাদের মুখে দেশ ও জনগণের ভবিষ্যত নিয়ে কোনো বক্তব্য কেউ শুনতে পেরেছে বলে মনে করতে পারবে না।

২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত নিজেদের রাজনীতিকে বিএনপি-জামায়াত ধ্বংসাত্মক পথে পরিচালিত করেছে, দেশের ক্ষতি করে, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে যে গণতন্ত্র তারা আদায় করতে চেয়েছে তা যে পুরোনো ও দখলীকৃত দেশেই কেবল সম্ভব সেটি তারা ভুলে গেছিলো।

ফলে সরকারকে দেশ ও জনগণের স্বার্থেই শক্ত হতে হয়েছিল এবং জনগণ এই শক্তি প্রয়োগকে সমর্থনও দিয়েছিল। না হলে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পরে আওয়ামী লীগের পক্ষে পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকা সম্ভব ছিল না। এই সত্যটিও বিএনপি-জামায়াত বুঝেছে বলে মনে হয় না। ফলে যখনই তারা বিদেশিদের কাছে বাংলাদেশে গণতন্ত্র নেই বলে প্যাঁচাল পারতে গিয়েছে তখন নিশ্চিত ভাবেই এই প্রশ্নটিই মুখ্য হয়ে উঠেছে যে, কোন্ গণতন্ত্র তারা চাইছে?

জ্বালাও-পোড়াও ও নির্বিচারে মানুষ হত্যার গণতন্ত্র নাকি একটি সুষ্ঠু রাজনৈতিক সংস্কৃতির গণতন্ত্র? যেহেতু তাদের প্রশ্নের ও দাবির কোনো ভিত্তি ছিল না সেহেতু সরকার হিসেবে আওয়ামী লীগও কঠোর হয়েছে। তাতে দেশের গণতন্ত্রের কতোটা ক্ষতি হয়েছে সে বিষয়টি গবেষণার দাবি রাখে।

এরপর যখন আরেকটি নির্বাচনের সময় এলো তখন একেবারে শেষ সময় পর্যন্ত নির্বাচনে যাওয়া না-যাওয়া নিয়ে যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব এবং তারপর শেষ সময়ে এসে দেশের চতুর্থ পক্ষ বলে পরিচিত অ-রাজনৈতিক শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচনের মাঠে নেমেও নির্বাচনে পরাজিত হয়েই নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি বলে প্রমাণের চেষ্টা যে ভ্রান্তপথ ছিল সেটা এখন পদে পদে প্রমাণিত হচ্ছে।

এই মুহূর্তে দল বা জোটের ভেতরই চলছে টানাপড়েন নির্বাচিতদের শপথ নেওয়া না-নেওয়া নিয়ে। নিজেদের জোটেই যখন রাজনীতির এই অবস্থা, তখন তারা দেশ বা জাতির জন্য বৃহৎ কিছু নিয়ে ভাবছেন বলে ভাববার কোনো কারণ নেই।

আগামী বছরখানেক তারা নির্বাচনের অনিয়ম নিয়ে কথা বলবেন এবং তারপর বয়স্করা রাজনীতি থেকে দূরে সরবেন এবং অপেক্ষাকৃত তরুণরা হয় রাজনীতির কৌশল বদলাবেন না হয় পুরোনো কৌশলেই আবার শুরু থেকে আরম্ভ করবেন। ততোদিনে দেশ আরো আগাবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। প্রশ্ন হলো, সেই সময়ের উপযোগী রাজনীতিটা তারা ধরতে পারবেন তো?

এখনইতো দেশের মানুষের কাঙ্খিত রাজনীতিটি তারা করছেন না, ফলে ক্রমাগতভাবেই পিছিয়ে পড়ছেন। এভাবে পিছিয়ে থাকলে রাজনীতির দৌড়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যে পারাটা সম্ভব নয় সেটাতো প্রমাণিত। যে কেউ এখন এই প্রশ্নটিই তুলবে যে, সবার আগে বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতিটা আসলে কি?

একদিকে জামায়াতকে রেখে অন্যদিকে কেবলমাত্র ড. কামাল হোসেনকে রেখে বিদেশিদের কাছে ধর্না দিয়ে বাংলাদেশে তাদের কাঙ্খিত ‘গণতন্ত্র’ আসবে কি? আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক পরিকল্পনা জাতির কাছে স্পষ্ট। কিন্তু আওয়ামী-বিরোধীদের কিছুই জনগণের কাছে স্পষ্ট নয়, কেবলমাত্র আওয়ামী-বিরোধীতা ছাড়া।

শুধু আওয়ামী-বিরোধীতাকে পুঁজি করে রাজনীতি করলে যে, এদেশে রাজনীতি টেকানো যায় না, তা যদি এতোদিনে না বুঝে থাকেন তাহলে সত্যিই সেটা দুঃখজনক এবং দেশের যে জনগোষ্ঠীর আপনাদের প্রতি সমর্থন আছে তাদের প্রতিও যে এটা এক ধরনের না-ইনসাফি সেই উপলব্ধিও কোথাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

রাজনৈতিক সমর্থন বদলায় এবং তা রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডের কারণেই দেশে দেশে এই সত্য প্রমাণিত, বাংলাদেশেও তার প্রমাণ ভুরি ভুরি রয়েছে। একদা জনপ্রিয় মুসলিম লীগ এখন কোথায় সে প্রশ্নটি তুললেই বাকিসব বুঝতে কারো সময় লাগার কথা নয়।

ঢাকা ২৯ জানুয়ারি, মঙ্গলবার ২০১৯
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।

এইচআর/পিআর

রাজনৈতিক সমর্থন বদলায় এবং তা রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডের কারণেই দেশে দেশে এই সত্য প্রমাণিত, বাংলাদেশেও তার প্রমাণ ভুরি ভুরি রয়েছে। একদা জনপ্রিয় মুসলিম লীগ এখন কোথায় সে প্রশ্নটি তুললেই বাকিসব বুঝতে কারো সময় লাগার কথা নয়

আপনার মতামত লিখুন :