হেরে যাবে গণতন্ত্র?

অঘোর মন্ডল
অঘোর মন্ডল অঘোর মন্ডল , স্পোর্টস এডিটর, দীপ্ত টিভি
প্রকাশিত: ১০:০৬ এএম, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

 

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না বিএনপি। সিদ্ধান্তটা তাদের রাজনৈতিক। রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্ত রাজনীতির হিসাব-নিকেশ কষেই হবে। এটাই স্বাভাবিক। তবে হিসাবে গলদ থাকলে রাজনীতির অংক মেলানো কঠিন হয়ে যায়। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। এটা খুব সহজ একটা বাক্য। কিন্তু রাজনীতির বিশ্লেষণে গেলে এটাকে বেশি সরলীকরণ মনে হচ্ছে!

পাটিগণিতের সরল অংক কখনোই খুব সহজ না। যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ সবই থাকে সেই অংকে। ভোটের গণিতটাও তাই। খুব সহজে মিলে যাবে তা নয়। কিন্তু নির্বাচনে অংশ না নেয়া , নির্বাচন বর্জন, এসব গত এক দশকে বিএনপি নামক দলটার রাজনৈতিক চরিত্রের অংশ হয়ে গেছে!

অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন, কেন, গেলো ৩০ ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনে তো অংশ নিয়েছে বিএনপি? হ্যাঁ, নিয়েছে। তবে সেটা শুধুই অংশ নেয়া। অনেকে বলেছেন রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের নিবন্ধন রক্ষার জন্যই বিএনপির অংশ নেয়া। আবার বিএনপির পক্ষ থেকে পাল্টা যুক্তি আছে। নির্বাচনে তারা অংশ নিয়েছে। কিন্তু সমতল মাঠ নয়। নির্বাচনে অংশ নেয়ার মত মাঠও তারা পায়নি।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনী মাঠে তারাই টিকে থাকতে পারে, যাদের সাংগঠনিক শক্তি যত বেশি। মানছি টানা দশ বছর ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগ খানিকটা বাড়তি সুবিধা পেয়েছে। তারা বলতে পেরেছেন; সরকারের ধারাবাহিকতা বজায়ে থাকলে উন্নয়নের গতি বাড়ে। মানুষের সামনে উন্নয়নটাও দৃশ্যমান।

অন্যদিকে বিএনপি সাংগঠনিকভাবে দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়েছে। ক্ষয়িষ্ণু রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে যাচ্ছে তারা। অথচ তারাও প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রায় দেড় দশক দেশশাসন করেছে। সেই দলটার এই দুরবস্থার জন্য দায়ী তাদের প্রতিপক্ষ নাকি বিএনপি নিজে? কঠিন এই প্রশ্নের উত্তর বিএনপিকেই খুঁজে নিতে হবে। সঠিক উত্তর খুঁজতে ব্যর্থ হলে বিএনপিকে আরো বিপর্যের মুখোমুখি হতে হবে, এটাই বাস্তবতা।

সেরকম এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন বর্জন করলো বিএনপি! তারা হয়তো আগাম ধরেই নিয়েছে নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে না! তাদের এই ধারণা তাদের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের মনে স্থায়ী দাগ ফেললে সাধারণ মানুষ কেন তাদের ওপর ভরসা রাখবে?

আর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলের সামনে গতন্ত্রের বিকল্প কী আছে? আন্দোলন! বিএনপি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গিয়েছিল আন্দোলনের অংশ হিসেবে। কিন্তু বিএনপির কী আন্দোলন করার সাংগঠনিক ক্ষমতা আছে? গত এক দশকে বিএনপি কি সত্যিকার অর্থে কোন আন্দোলন গড়ে তুলতে পেরেছে? বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইস্যুর অভাব ছিল কী?

জনস্বার্থেই তারা আন্দোলনে নামলে হয়তো জনগণের সাড়া পেলেও পেতে পারতো। কিন্তু তাদের আন্দোলনের সব কথাবার্তাই নিজেদের নেতা-নেত্রীদের মামলা-মোকদ্দমা নিয়ে! বড় বড় আইনজ্ঞ বিএনপিতে আছেন। আইনী লড়াই তারা করছেন। কিন্তু তাতে জনগণের কী লাভ হচ্ছে? আর নির্বাচন বর্জন করেই বা বিএনপির কী লাভ হচ্ছে? একটা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অংশ না নিয়ে বিএনপি জনগণকে কী বার্তা দিতে চাইছে?

এই সরকারের অধীনে কোন ভাল নির্বাচন হতে পারে না! যদি তাদের কথাই ঠিক হয়, তাহলেও এই সরকার অবৈধ হয়ে যাবে! নাকি এই সরকারের পতন হয়ে যাবে! বরং বিএনপি যদি নির্বাচনকে আন্দোলনের অংশ হিসেবেও নিত তাতে অন্তত তাদের সাংগঠনিকভাবে কিছুটা লাভ হলেও হত।

মোটা দাগে বললে বলতে হবে, বিএনপি নিজেই তাদের প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করছে। আর এককভাবে আন্দোলন-সংগ্রাম করে সরকারের পতন ঘটানোর ইতিহাস বিএনপির নেই। পক্ষান্তরে আন্দোলন-সংগ্রামে সরকার পতনের ইতিহাসটা আওয়ামী লীগের অনেক সমৃদ্ধ।

তবে গণতন্ত্র শক্তিশালী করতে হলে নির্বাচন শুধু অংশগ্রহণমূলক নয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলকও হওয়া দরকার। এভাবে বিএনপির নির্বাচন বর্জনের পুনরাভিনয় দলটার জন্য যতোটা ক্ষতির কারণ ঠিক একইভাবে গণতন্ত্রের জন্য স্বাস্থ্যকর নয়। সেটা বিএনপি-আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দলকেই উপলব্ধি করতে হবে।

তবে একটা অংশগ্রহণমূলক এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অবাধ-সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য বড় ভূমিকা রাখার কথা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের। তাদের দায়িত্বটা শুধু গণমাধ্যমের সামনে কথা বলে নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেয়া নয়।

নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা তাদের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব আরো সুচারুভাবে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই পালন করছেন তারা সেটা দৃশ্যমান হতে হবে। সেই বিষয়টা নিয়ে নির্বাচন কমিশনেরও ভাবার অনেক জায়গা রয়েছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিচ্ছে না। যাতে সাধারণ মানুষের মনে ধারণাটা প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী-ই জয়ী হতে যাচ্ছেন। আওয়ামী লীগ জিতবে। বিএনপি হয়তো নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না তাই ভাবতে পারছে তারাতো হারলো না! কিন্তু তাহলে হারছে কে?

উত্তর একটাই। স্থানীয় সরকার নির্বাচন যখন দলীয় মনোনয়নে হচ্ছে তা হলে হারছে গণতন্ত্র। কারণ, সব দল নির্বাচনে অংশ না নিলে গণতন্ত্র সৌন্দর্য হারায়। অতএব হার গণতন্ত্রের। গণতন্ত্রের এই হেরে যাওয়ার মর্মবেদনাটা কে যেন আমাদের রাজনীতিবিদরা ঠিক বুঝেও বুঝতে চান না। তারা শুধু জিততে চান। সবাই যখন যে কোনভাবে জয়ী হতে চায় তখন সত্যি-ই গণতন্ত্র হেরে যায়!
লেখক: সিনিয়র জার্নালিস্ট ও কলামিস্ট।

এইচআর/এমএস

‘ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিচ্ছে না। যাতে সাধারণ মানুষের মনে ধারণাটা প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী-ই জয়ী হতে যাচ্ছেন। আওয়ামী লীগ জিতবে। বিএনপি হয়তো নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না তাই ভাবতে পারছে তারাতো হারলো না! কিন্তু তাহলে হারছে কে?’

আপনার মতামত লিখুন :