ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টারের ফ্লাইং স্টার্ট

প্রভাষ আমিন
প্রভাষ আমিন প্রভাষ আমিন , হেড অব নিউজ, এটিএননিউজ
প্রকাশিত: ১০:৩৪ এএম, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

বাংলাদেশ টেলিভিশন আগে পাকিস্তান টেলিভিশন ছিল। পিটিভি থেকে বিটিভি- প্রায় ৬ দশকের ইতিহাস। বিটিভিতে খবরও প্রচারিত হয়। তবুও বাংলাদেশের সস্প্রচার সাংবাদিকতায় বিটিভির কোনো অবদানের কথা কেউ বলে না। বাংলাদেশে সম্প্রচার সাংবাদিকতার ইতিহাস ধরা হয় একুশে টেলিভিশন থেকে। সে হিসেবে বাংলাদেশে সম্প্রচার সাংবাদিকতার ইতিহাসও প্রায় দুই দশকের। কিন্তু সংগঠনপ্রিয় বাংলাদেশে সম্প্রচার সাংবাদিকদের কোনো সংগঠন ছিল না। সাংবাদিকদের যেখানে বিটে বিটে সংগঠন, সেখানে সম্প্রচার সাংবাদিকদের একদমই কোনো সংগঠন না থাকাটা বিস্ময়করই বটে।

সেই অভাবটা ঘোচাতেই মাস ছয়েক ধরে চলছিল সম্প্রচার সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ। সেই উদ্যোগের প্রথম প্রকাশ্য আয়োজন- সম্প্রচার সম্মেলন। ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার বা সম্প্রচার সাংবাদিক কেন্দ্র ভবিষ্যতে কোথায় যাবে, কত দূর যাবে; সেটা ভবিষ্যতই বলে দেবে। তবে ৮ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে আনন্দ আর উচ্ছ্বাসের যে বাঁধভাঙা প্রকাশ দেখেছি, প্রাপ্তি হিসেবে সেটাও কম নয়। টিএসসি দিনভর মুখরিত ছিল হাজারখানেক সম্প্রচার সাংবাদিকের পদচারণায়। টিএসসি মিলনায়তনে তিন পর্বের আয়োজন তো ছিলই, ছিল টিএসসির মাঠ আর ক্যান্টিনে দিনভর প্রাণবন্ত আড্ডা এবং ফটোসেশন। আমার ধারণা, সবমিলিয়ে লাখখানেক ছবি তোলা হয়েছে।

শুক্রবার দিনভর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছিল সম্প্রচার সাংবাদিকদের উপস্থিতি। সবার মধ্যে সংগঠনক ঘিরে যে উচ্ছ্বাস আর উদ্দীপনা দেখা গেছে, সেটাকে ঠিকভাবে সংগঠিত করা গেলে ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার-বিজেসি অনেকদূর যাবে সন্দেহ নেই। আশাবাদী হওয়ার রহস্য লুকিয়ে আছে সম্প্রচার সম্মেলনেই। দিনভর গোছানো ও স্মার্ট আয়োজনে কোনো খুঁত খুজে পাওয়া যায়নি।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্পিকার ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল দ্বিতীয় পর্বের আলোচনা। ‘সস্প্রচার শিল্প : একটি সম্ভাবনার সঙ্কট’ শীর্ষক আলোচনায় উঠে সম্প্রচার শিল্পের নানা দিক। শিরোনামেই বোঝা গেছে, এই শিল্পের সম্ভাবনা যেমন আছে, আছে সঙ্কটও। শেষ বেলায় সাংগঠনিক আলোচনায় উঠে আসে সম্প্রচার কর্মীদের নানা সমস্যা, দাবি-দাওয়া। বিজেসি কোথায় যেতে চায়, তার একটি চিত্র পাওয়া যেতে পারে এ সম্মেলনে।

প্রথম কথা হলো, বিজেসি সাংবাদিকদের প্রথাগত সংগঠনের মতো বার্গেনিং এজেন্ট হবে না। বিজেসি ঐক্যবদ্ধভাবে বিপদে-আপদে সম্প্রচার সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়াবে। বিজেসির মূল লক্ষ্য সম্প্রচার সাংবাদিকদের কল্যাণ। চাকরির ক্ষেত্রে নিরাপত্তা তো বটেই, কর্মীদের আরও দক্ষ করে তুলতে প্রশিক্ষণের বিষয়টিও আছে তাদের মাথায়। শুরু থেকেই চেষ্টা হচ্ছে স্বাস্থ্য বীমার। তারপর ধীরে ধীরে নানান কল্যাণমূলক উদ্যোগের পরিকল্পনা আছে।

সম্প্রচার সাংবাদিকতার দুই দশক পেরোলেও এখনও দেশে কোনো সম্প্রচার নীতিমালা নেই, ওয়েজ বোর্ডেও নেই টিভি সাংবাদিকদের উল্লেখ। আলোচনায় উঠে আসে বিদেশি চ্যানেলের দৌরাত্ম্য, বিজ্ঞাপনের বাজারের অরাজকতা, কনটেন্টের বৈচিত্রহীনতাসহ নানা প্রসঙ্গ। হকাররা পত্রিকা বিক্রি করে কমিশন পায়। কমিশনের পরও পত্রিকার মালিক কিছু টাকা পান। কিন্তু স্যাটেলাইট চ্যানেল দেখিয়ে কেবল অপারেটররা গ্রাহকদের কাছ থেকে যে টাকা পান, তার ছিটেফোঁটাও পান না চ্যানেল কর্তৃপক্ষ। আলোচনায় উঠে আসে পে-চ্যানেলের বিষয়টিও। টিআরপির মনোপলির বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে সম্প্রচার সম্মেলনে।

এটা ঠিক বাংলাদেশে টিভির সবচেয়ে বড় সমস্যা কনটেন্ট। সমস্যা মোকাবেলায় নিজেদেরকেই আরও দক্ষ করে তুলতে হবে, পর্দায় আনতে হবে বৈচিত্র। এর কোনো বিকল্প নেই। কোনো কোনো দর্শকের অভিযোগ বাংলাদেশে এখন ৩১টি ‘বিটিভি’ আছে। সব টিভি একই রকম লাগে। সস্প্রচার সম্মেলনে ঢোকার মুখেই টিএসসির গেটে একটি বোর্ডে লেখা ছিল সমস্যার আসল চিত্রটি, ‘স্বাধীনতা পেলে গণমাধ্যম ভালোও করতে পারে, খারাপও করতে পারে। কিন্তু স্বাধীনতা না থাকলে গণমাধ্যম অবশ্যই খারাপ হবে।’ আলবার্ট কাম্যুর এই উক্তিতেই লুকিয়ে আছে সমস্যার আসল চিত্র। স্বাধীনতা পেলেই বিকশিত হবে সম্প্রচার মাধ্যম, সুরক্ষিত থাকবে সম্প্রচার সাংবাদিকতা। নইলে তা বারবার হোঁচট খাবে।

ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার কোথায় যাবে, সেটা এক্ষুণি বলা কঠিন। তাদের সম্ভাবনা আকাশ ছোঁয়া। তবে ২০ বছরের সমস্যা ব্রডকাস্ট সেন্টার রাতারাতি সমাধান করে ফেলবে, এমনটা আশা করা বোকামি। এক্ষুণি সংগঠকদের প্রত্যাশার ভারে পিষ্ট করা ঠিক হবে না। বরং তাদের সময় দেয়া হোক; তারাই ঠিক করুক, তাদের গন্তব্য। স্কাই ইজ দ্যা লিমিট। সেই আকাশপানে বিজেসির ফ্লাইং স্টার্ট হয়েছে। এখন শুধু ওড়ার পালা।

এইচআর/এমবিআর/এমকেএইচ

ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার কোথায় যাবে, সেটা এক্ষুণি বলা কঠিন। তাদের সম্ভাবনা আকাশ ছোঁয়া। তবে ২০ বছরের সমস্যা ব্রডকাস্ট সেন্টার রাতারাতি সমাধান করে ফেলবে, এমনটা আশা করা বোকামি। এক্ষুণি সংগঠকদের প্রত্যাশার ভারে পিষ্ট করা ঠিক হবে না। বরং তাদের সময় দেয়া হোক; তারাই ঠিক করুক, তাদের গন্তব্য। স্কাই ইজ দ্যা লিমিট। সেই আকাশপানে বিজেসির ফ্লাইং স্টার্ট হয়েছে। এখন শুধু ওড়ার পালা।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]