রাজ্জাক জামায়াত ছেড়েছেন, জামায়াতের দর্শন ছেড়েছেন কী?

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা , প্রধান সম্পাদক, জিটিভি
প্রকাশিত: ১১:৪০ এএম, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

 

যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতাদের প্রধান আইনজীবী, দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক জামায়াত ছেড়েছেন। দল প্রধানের কাছে পদত্যাগের পেছনে আবদুর রাজ্জাক দুটি কারণ উল্লেখ করেছেন। তার চিঠিতে বলা হয়, জামায়াত ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা চায়নি। একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতার আলোকে ও অন্যান্য মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে বিবেচনায় এনে দলটি নিজেদের সংস্কার করতে পারেনি।

এ নিয়ে সরব আলোচনা এখন। ৩০ বছর জামায়াতের রাজনীতি হঠাৎ করে ছেড়ে দিলেই কি তিনি বাংলাদেশে গ্রহণযোগ্যতা পাবেন? কিংবা ১৯৭১-এর হত্যা, খুন, ধর্ষণ, লুটের জন্য ক্ষমা চাইলেই কি জামায়াত ক্ষমা পেতে পারে? এসব প্রশ্ন মৌলিক প্রশ্ন।

আবদুর রাজ্জাক সেইসব জামায়াত নেতাদের একজন যারা ১৯৭১-এর পর জামায়াতকে এদেশে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে বড় অবদান রেখেছেন। তিনি ১৯৭১-এর ভূমিকার জন্য জামায়াতকে ক্ষমা চাইতে বলেন, কিন্তু তিনিই বড় সব যুদ্ধাপরাধীর আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছেন। দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় তিনি জামায়াত নেতাদের পক্ষে আইনী লড়াই করেছেন।

যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরুদ্ধে তিনি বিদেশে জনমত তৈরি করার চেষ্টা করেছেন, লবি করেছেন। ২০০২ সালে যেসব ধর্মান্ধ প্রতিক্রিয়াশীল বুদ্ধিজীবী একুশে টেলিভিশন বন্ধে অবদান রেখেছেন, তাদের পক্ষে ছিলেন এই রাজ্জাক। জামায়াতকে যখন ক্ষমা চাইতে বলেন, তখন প্রশ্ন হলো, তিনি নিজে কি তার এসব ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাইবেন? বা চেয়েছেন? তা ছাড়া ব্যারিস্টার রাজ্জাক যতদিন রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন ততদিন জামায়াতের বিলুপ্তি চাননি। পদত্যাগ করে এখন এই চাওয়া বা না চাওয়ার অর্থ কী?

বাংলাদেশের রাজনীতির দুটি ধারা স্পষ্ট - মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে শক্তি বনাম মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী শক্তি। জামায়াত মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী যুদ্ধাপরাধী দল। ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক জামায়াত ছাড়লেও জামায়াতের দর্শন ছাড়বেন, সেটা কিন্তু বলেননি।

অনেকে আবার এও বলছেন, জামায়াতের এটি এক নতুন কৌশল। তারা বুঝে গেছে জামায়াত নামে এদেশের মাটিতে আর রাজনীতি করা যাবে না। ভিন্ন নামে মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করার নব্য প্রচেষ্টা হিসেবে জামায়াত নিজেই রাজ্জাককে ব্যবহার করছে। গণতান্ত্রিক দেশে কোনভাবেই ধর্মভিত্তিক রাজনীতি হতে পারে না। এর মধ্যে একটি দলের চরিত্র যদি সহিংস হয়, একটি দল দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী হয়, তাহলে সেই দলের নামে রাজনীতি হতে পারেনা। এই সত্য আজ উচ্চারিত। জামায়াত আজ অস্তিত্বের পরীক্ষায় পড়েছে।

জামায়াত শুধু মুক্তিযুদ্ধের সহিংস বিরোধিতা করেনি, বিভিন্ন সময়, বিশেষ করে নির্বাচন এলেই সংখ্যালঘুদের ওপর যে হামলা-নির্যাতন হয় এদেশে এগুলোতে জামায়াতের নেতা-কর্মীরাই নেতৃত্ব দিয়েছে। ২০০১ ভোটের পর সংখ্যালঘুদের ওপর যে সহিংসতা হয়েছিল, তাতে নেতৃত্ব দিয়েছিল বিএনপি, পেছনে ছিল জামায়াত। জামায়াতের জন্য অস্বস্তির কারণ হলো যুদ্ধাপরাধের বিচার এবং সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের এগিয়ে আসা। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, জাতীয় মর্যাদা সমুন্নত রাখা, সন্ত্রাস দমন ও জনকল্যাণমূলক রাজনীতির যে ধারা চলছে, জামায়াত সেই রাজনীতিতে তার প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে।

জামায়াত নিরন্তরভাবে সাম্প্রদায়িক প্ররোচনা ও উস্কানির মধ্যে রাখতে চেয়েছে এদেশের মানুষকে। ইসলাম বিপন্ন বলে প্রচার করে করে এ পর্যন্ত এসেছে। এই ধর্মব্যবসার রাজনীতি কোনও সামাজিক কল্যাণের কাজে উৎসাহ দেয় না। বরাবর যে রাজনীতি তারা করেছে সেই রাজনীতি হলো ভয় দেখিয়ে লোক খ্যাপানো, জুম্মা বারের নামাজি সমাবেশ থেকে রণহুঙ্কার তোলা, ধর্মীয় সহিংসতাকে তাতিয়ে দেওয়া। যা নিয়ে সমাজের কোনও মাথাব্যথা নেই, এমনসব অবান্তর, অকিঞ্চিৎকর, প্রান্তিক বিষয়কে সাম্প্রদায়িক রূপ দিয়ে আজীবন রাজনীতি করেছে জামায়াত।

ব্যারিস্টার রাজ্জাক হয়তো বলবেন তিনি একাত্তরে জামায়াত করেননি। গণহত্যার রক্তের দাগ তার হাতে আছে কি নেই, সে বিচার না করেই বলতে হবে সেই গণহত্যাকারীদের পক্ষেই তার জীবনের বড় সময় কেটেছে। জামায়াত ছাড়লেই বাংলাদেশ তাকে বরণ করে নিবে গণতন্ত্রের শীর্ষাসনে, এই ভাবনা অতি ভাবনা।

ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির বাইরে ধর্মব্যবসার রাজনীতিকে জেতানোর লড়াই করেছেন তিনি। উগ্র সহিংস রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করার যুদ্ধ যিনি লড়েছেন তিনি শেষ পর্যন্ত কোথায় যান দেখার অপেক্ষায় আমরা। আরও অনেক পথ চলা বাকি আছে তার।

যে মানুষ সাম্প্রদায়িকতার যৌক্তিকতা সন্ধান করেছেন জীবনভর সেই তিনি দল ছেড়ে দলের ‘ইতিহাসের ভুল’ সংশোধনের মোড়কে নতুন রাজনীতি করছেন আসলে। তিনি দলের একাত্তরের ভূমিকার কথা বলছেন। কিন্তু তার কাছে সারাজীবনই সাম্প্রদায়িকতা, সহিংসতা যথেষ্ট যুক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

১৯৭৫-এর পর বাংলাদেশ থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মুছে ফেলার যে প্রকল্পটি জামায়াত-বিএনপির মনের মণিকোঠায় সযত্নে রক্ষিত আছে দীর্ঘ কাল, রাজ্জাক কখনও সময় নষ্ট না করে তার বাস্তবায়নের পথে হেঁটেছেন, আরও হাঁটবেন, অনুমান করা চলে।

লেখক : প্রধান সম্পাদক, জিটিভি।

এইচআর/এমএস

‘২০০২ সালে যেসব ধর্মান্ধ প্রতিক্রিয়াশীল বুদ্ধিজীবী একুশে টেলিভিশন বন্ধে অবদান রেখেছেন, তাদের পক্ষে ছিলেন এই রাজ্জাক। জামায়াতকে যখন ক্ষমা চাইতে বলেন, তখন প্রশ্ন হলো, তিনি নিজে কি তার এসব ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাইবেন? বা চেয়েছেন? তাছাড়া ব্যারিস্টার রাজ্জাক যতদিন রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন ততদিন জামায়াতের বিলুপ্তি চাননি। পদত্যাগ করে এখন এই চাওয়া বা না চাওয়ার অর্থ কী? ’

আপনার মতামত লিখুন :