সরকার যে ঘুমাচ্ছে না তার প্রমাণ কি?

মাসুদা ভাট্টি
মাসুদা ভাট্টি মাসুদা ভাট্টি , সাংবাদিক, কলামিস্ট
প্রকাশিত: ১২:২৭ পিএম, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় এসেছি জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের ৪০-তম আয়োজনে একটি প্যানেলে যোগ দিতে। বিষয় বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকদের নিরাপত্তা। মূল অনুষ্ঠান সোমবার কিন্তু রবিবার আয়োজকদের পক্ষ থেকে যে নৈশভোজের আয়োজন করা হয়েছিল তাতে সকলের মুখেই আলোচনার মূল বিষয়বস্তু ছিল বাংলাদেশ।

বিশেষ করে, বাংলাদেশের বিমান ছিনতাই- এর ঘটনাটি এতোটাই আলোড়িত করেছে সকলকে যে, প্রত্যেকেরই প্রশ্ন, শেষ পর্যন্ত কী হলো? কী করে সম্ভব হলো? এতোগুলো প্রাণ বাঁচানো গেলো, তাও মাত্র দু’ঘন্টার মাথায়? বাংলাদেশের মতো একটি ছোট্ট ও সুন্দর দেশের ওপর এরকম ঘন ঘন বিপদ নেমে আসছে কেন?

মাত্রই প্রায় শ’খানেক মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটলো রাজধানী ঢাকাতেই, এরপর আবার এই বিমান ছিনতাই- এর ঘটনা। প্রত্যেক্যেই বাংলাদেশ নিয়ে চিন্তিত এবং এই ঘনবসতিপূর্ণ দেশটায় যেনো আর কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে সে জন্য সকলেই শুভ কামনা জানালো। কিন্তু কেউই এ প্রশ্ন তুললো না যে, কেন ওই ছিনতাইকারীকে হত্যা করা হলো? কী করে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা-চাদর ভেদ করে অস্ত্র ও বোমা নিয়ে ছিনতাইকারী বিমানে উঠতে পারলো? বরং বাংলাদেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী কমান্ডো বাহিনীর প্রশংসাই করা হলো একটিও হতাহতের ঘটনা ঘটতে না দেওয়ার জন্য।

এমন নয় যে, উপস্থিত সকলেই বাংলাদেশকে ও বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন সরকারকে খুউব ভালোবাসে বা সমর্থন করে, বরং তাদের প্রত্যেকেই বাংলাদেশ সরকারের কট্টর সমালোচক, বিশেষ করে বাংলাদেশে ‘বাক্ স্বাধীনতায় সরকারি হস্তক্ষেপ’-এর নিন্দা জানিয়ে আসা সংস্থাগুলোর সঙ্গে এদের অনেকেই সংশ্লিষ্ট। তাহলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক বাঙালি যে সব প্রশ্ন তুলছেন বিশেষ করে বিমান ছিনতাই- কে নাটক বলে অভিহিত করে (যার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক থেকে সাংবাদিক, কে নেই?) ছিনতাইকারীকে হত্যা করার মাধ্যমে দেশবাসীর দৃষ্টি চকবাজার থেকে সরানোর যে ‘গল্প’ সাজাচ্ছেন, তাদের সঙ্গে এই বিদেশিদের পার্থক্য আসলে কোথায়?

এই বিদেশিরা প্রথমতঃ জানেন যে, যে কোনো দেশের নিরাপত্তা-ব্যবস্থা যতোই সূক্ষ আর শক্তিশালী হোক না কেন, নিরাপত্তা-ব্যবস্থা ফাঁকি দেওয়ার জন্যই তাদেরকে ‘দুস্কৃতিকারী’ বা ‘সন্ত্রাসী’ বলা হয়ে থাকে। লন্ডনে, প্যারিসে বা ইউরোপ কিংবা আমেরিকার যে কোনো শহরে যখন কোনো আক্রমণের ঘটনা ঘটে কিংবা কোনো জনসমাগমে সন্ত্রাসী হামলা ঘটে তখন প্রথমেই নিরাপত্তা-ব্যবস্থার শৈথিল্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলেও সেসব প্রশ্ন খুউব একটা ধোপে টেকে না।

বরং, নিরাপত্তারক্ষীরাও যে মানুষ এবং মানুষ মাত্রেরই ভুল হয়ে থাকে সেটি সাধারণ মানুষও কখনও ভোলে না। ফলে বাংলাদেশের বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ত্রুটি নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন তোলেননি। বরং বিশ্বখ্যাত লোনলি প্ল্যানেট ওয়েবসাইটে ঢাকা বিমানবন্দর বিষয়ক এক প্রশ্নের উত্তরে বেশিরভাগ উত্তরদাতাই বলেছেন যে, নিঃসন্দেহে ঢাকা পৃথিবীর নিরাপদতম বিমানবন্দর না হলেও একেবারে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বিমানবন্দরও নয়।

এমনিতে ঢাকা শহর পৃথিবীর ঝুঁকিপূর্ণ শহরগুলোর অন্যতম হলেও বিমানবন্দর হিসেবে শাহ্জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে ঝুঁকিপূর্ণ বিমানবন্দরের তালিকায় দেখা যায়নি এখনও। আর দ্বিতীয়তঃ কেন ছিনতাইকারীকে কমান্ডোবাহিনী হত্যা করলো সে প্রশ্নে যে কোনো পশ্চিমা নাগরিকই বলবে যে, এটাই কমান্ডোবাহিনীর কাজ। শ’খানেকেরও বেশি নাগরিককে জিম্মি করে কোনো ব্যক্তি যে কোনো যৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়ার জন্য চাপ দিক না কেন, তাকে আসলে ‘ছিনতাইকারী, সন্ত্রাসী বা সাধারণ নাগরিককে জিম্মি করা দুষ্কৃতিকারীই বলা হবে এবং তার থেকে নাগরিকের মুক্তির জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তথা সেনা বাহিনী তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবে সেটাই স্বাভাবিক।

এ নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ পশ্চিমা গণতন্ত্রেও কম। যদি তাকে জীবিত ধরার সুযোগ থাকতো তাহলে তাকে আইনের মুখোমুখি না করে হত্যা করা হলে তা নিয়ে বিশ্বময় নিন্দার ঝড় উঠতো, যেমনটি উঠছে বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে। কিন্তু এই বিমান ছিনতাইকারীকে হত্যার বিরুদ্ধে পশ্চিমা গণতন্ত্রের পক্ষ থেকে কোনো প্রশ্ন করা হবে না বলেই বিশ্বাস করা যায়।

ফলে জেনেভা শহরের এই নৈশভোজে যখন বাংলাদেশকে নিয়ে তীব্র উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছিল বিদেশিদের মাঝে তখন বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম উপচে পড়ছিলো উপহাসে, ছিনতাই-এর ঘটনাকে নাটক অভিহিত করে বহুবিধ উপদেশবাণীতে। অপরদিকে এই বিদেশিদের কেউ কেউই এই প্রশ্ন তুলছিলেন যে, বাংলাদেশ একটি দ্রুতগতির অর্থনৈতিক উন্নয়নের দেশ হিসেবে এই ঘটনা দেশটির জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

হোলি আর্টিজানের ঘটনা যেমন বাংলাদেশকে একটানে পাঁচ বছর পিছিয়ে দিয়েছে তেমনই এই ঘটনাও বাংলাদেশকে পিছিয়ে দেবে কারণ এখন থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীসহ অন্য যে কোনো কাজে বাংলাদেশে ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিদেশিরা চিন্তিত হবে এবং তার ফলে বাংলাদেশের এগুনোর পথ খানিকটা হলেও শ্লথ হবে।

এমনিতেই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণার শেষ নেই। দেশের ভেতরকার রাজনীতিতে বিরোধিতা বা সমালোচনা এক জিনিস আর বিপুল অঙ্কের অর্থ খরচ করে লবিস্ট কোম্পানি ভাড়া করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর নজিরও রয়েছে আমাদের চোখের সামনে। অতএব, এই ছিনতাইয়ের ঘটনা তাতে নতুন করে প্রশ্ন যোগ করবে তাতে কোনোই সন্দেহ নেই।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, ছিনতাই-এর ঘটনা ঘটার পর থেকে সরকারের ভূমিকাও যেনো বেশ দায়িত্বহীন এবং জনগণের মনে নিরাপত্তা-জনিত আস্থা ফিরিয়ে আনার বদলে বিমান প্রতিমন্ত্রীর বালখিল্যসুলভ বক্তব্য প্রতিদিন আমাদের গিলতে হচ্ছে। একেক সময় একেক সত্য আমাদের সামনে নিয়ে আসছেন তিনি, ফলে কোনটি রেখে কোনটি আমরা বিশ্বাস করবো তাও যদি প্রতিমন্ত্রী আমাদের বলে দিতেন তাহলে সবচেয়ে ভালো হতো।

সবকিছুতেই প্রধানমন্ত্রীর দোহাই পেড়ে প্রধানমন্ত্রীকে হাল্কা করার মিশন নিয়ে নেমেছেন যেনো সরকারের মন্ত্রীরা। চকবাজারের ঘটনায়ও যেমনটি দেখা গেছে, ঠিক একই হাস্যকর অবস্থায় নিয়ে আসা হয়েছে বিমান ছিনতাইয়ের বিষয়টিও। অবিলম্বে এ বিষয়ে প্রকৃত সত্য জনগণের সামনে হাজির করা না হলে সরকারের ‘ক্রেডিবিলিটি’ ইতোমধ্যে যতোটুকু নষ্ট হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি হবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার।

কারণ, বার বার তার দোহাই দিয়েই সরকারের মন্ত্রীরা বক্তব্য রাখছেন। বিমান ছিনতাইকারী যাই-ই হোক না কেন, মানসিক ভারসাম্যহীন কিংবা জঙ্গী গ্রুপের সদস্য অথবা একজন প্রেমিক, সে যে ঘটনা ঘটিয়েছে তা ক্ষমার অযোগ্য কিন্তু তার সম্পর্কে প্রকৃত তথ্যের অনুপস্থিতি আরও ক্ষমাহীন অপরাধ। সরকার বার বার এরকম অপরাধ করে পার পেতে পারে না, পারা উচিত নয়।

দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, সরকার বুঝতে পারছে না তার বিপদ আসলে কতোদিকে অপেক্ষা করছে। এই কিছুদিন আগেই একটি লেখায় লিখেছিলাম যে, বিশ্বব্যাপী বহু ব্যক্তি, সংস্থা এবং সরকার শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারকে মেনে নিতে পারেনি এবং পারবেও না। ২০০৯ সালের কথা স্মরণ করি, মাত্র এক মাস বয়েসী সরকারকে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি দেওয়া হয়েছি বিডিআর-হত্যাকাণ্ডের মতো ভয়াবহ ঘটনা ঘটিয়ে। তারপর ২০১৪ সালের নির্বাচনের মাত্র এক বছরের মাথায় বাংলাদেশে আগুন সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছিল।

সর্বশেষ কোটা ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় সরকারকে টেনে ফেলে দেওয়ার আনন্দে অনেককেই উল্লসিত হতে দেখা গেছে। সেই উল্লাস এতো দ্রুত থেমে যাবে সেটি ভাববার কোনো কারণ আছে কি? এর মধ্যে আরো অনেক ঘটনা-দুর্ঘটনার খতিয়ান এই মুহূর্তে তুলে ধরে পাঠকের বিরক্তি উৎপাদন করার কোনো কারণ দেখছি না, কিন্তু একথাতো সত্য যে, গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর নতুন সরকারের জন্য চারদিকে বিপদ, সমালোচনা এবং সামান্য ঘটনা থেকে সরকার পতনের ডাক দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটানোর সম্ভাবনা আরও বেড়েছে এবং এরকমটি ঘটা কোনো ভাবেই অস্বাভাবিক নয়।

এমতাবস্থায়, সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে শুরুতেই যে চমক সৃষ্ট করতে চেয়েছিল তা মূলতঃ আলোচনার সারিতে বহু নিচের দিকে চলে গেছে ইতোমধ্যেই। বিশেষ করে চকবাজার ও বিমান ছিনতাই-এর ঘটনার পর। অদূর ভবিষ্যতে আরও ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটতেই পারে এবং বার বার যে সরকার নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হবে সেটা ভাববারও কোনো কারণ নেই।

সবচেয়ে বড় কথা এসব ঘটনা ঘটার আগে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা জানতে পারছে না, ঘটনা ঘটার সময় সাধারণ মানুষ তার শিকার হলে তাদেরকে উদ্ধার প্রক্রিয়ায় সরকারের সমন্বয়হীনতা মানুষকে আরও বিপন্ন করে তুলছে। এভাবে চলতে থাকলে ক্রমশঃ জনগণ সরকারের ওপর আস্থা হারাবে এবং দেশ আরও অস্থিরতার দিকে যাবে- এটাই তারা চাইছে যারা এতোকাল টাকা খরচ করে লবিস্ট নিয়োগ করেছে কিংবা শত্রু-রাষ্ট্রের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে চাইছে।

চারদিকে ক্ষমতালোভী রাজনৈতিক শত্রু এবং পরাজিত অক্ষশক্তির আন্তর্জাতিক বলয় নিরন্তর এই ছিদ্রই খুঁজতে থাকবে যার মধ্যে দিয়ে ঢুকে সরকারকে দুর্বল করা যায় এবং অন্তে সরকারের পতন ঘটিয়ে ক্ষমতাচ্যুতদের হাতে পুনরায় ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া যায়। চকবাজারে কর্তৃপক্ষের গাফিলতি, বিমানবন্দরে কর্তৃপক্ষের গাফিলতি এরকম বহুবিধ অ-কাজ বা অদক্ষতার প্রমাণ জনগণের সামনে হাজির করে শেষ পর্যন্ত সরকারকে অকার্যকর করা গেলে তার ফসল কার গোলায় গিয়ে উঠবে সে বিষয়ে সরকার যদি এখনও না বুঝে থাকে তাহলে নতুন করে বোঝানোর সক্ষমতা আর কারো আছে বলে আমি মনে করি না।

জনগণ দশ বছর ধরে পাশে আছে এর মানে এই নয় যে, আরও দশ বছর জনগণ একইভাবে সরকারকে সমর্থন দিয়ে যাবে। কার্যকর সরকার-ব্যবস্থা, সুশাসন, দুর্নীতি-দমন এবং জনগণের নিরাপত্তা শতভাগ নিশ্চিত না করতে পারলে তার পরিণতি এই মুহূর্তে ভেনেজুয়েলা কিংবা আরও অনেক দেশেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এসব দেয়াললিখন সরকার কি পড়তে পারছে? আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের দাবি করেছেন ‘সরকার নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে না’, কিন্তু বাস্তবতো ভিন্ন কথা বলছে, কি বলছে না?
জেনেভা, সুইজারল্যান্ড ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।
[email protected]

এইচআর/পিআর

বিমান ছিনতাইকারী যাই-ই হোক না কেন, মানসিক ভারসাম্যহীন কিংবা জঙ্গী গ্রুপের সদস্য অথবা একজন প্রেমিক, সে যে ঘটনা ঘটিয়েছে তা ক্ষমার অযোগ্য কিন্তু তার সম্পর্কে প্রকৃত তথ্যের অনুপস্থিতি আরও ক্ষমাহীন অপরাধ। সরকার বার বার এরকম অপরাধ করে পার পেতে পারে না, পারা উচিত নয়

আপনার মতামত লিখুন :