দুর্নীতির ঋতু বদলাক

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা , প্রধান সম্পাদক, জিটিভি
প্রকাশিত: ১০:১২ এএম, ১৬ মার্চ ২০১৯

 

প্রায় তিন দশক পর ডাকসু নির্বাচন হয়েছে আদালতের নির্দেশে। আদালত জানতে চায় ঢাকা শহরে এত ধুলো কেন? আদালত প্রশ্ন করে, বিমানবন্দরে মশা কমানোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছেনা কেন? এভাবে সব প্রতিষ্ঠানের কাজ করবার দায়িত্ব আদালতকেই বলে দিতে হয় এখন।

আমাদের প্রায় সব সেবা প্রতিষ্ঠানের কাজ করবার অনীহা আছে, তাদের দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে আদালতের এই ব্যবস্থা। উদ্দেশ্য অবশ্যই যথাযথ। কিন্তু এসব আদেশ ঠিক হলো কী? মহামান্য আদালতের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই এই প্রশ্ন তোলা সম্ভবত অযৌক্তিক নয়। তবে বলতেই হবে এর মাধ্যমে সরকারি সেবা সংস্থাগুলোর মানসিকতা ও কর্ম-সংস্কৃতির চিত্রটি জাতির সামনে খোলাসা হয়ে গেল।

পরিবেশ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জমি যে কোন খাতের কথাই আসুকনা কেন, বাংলাদেশে এসবের জন্য যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত তারা কাজটি করেনা। না করে বসে থাকে কখন আদালতের নির্দেশ আসবে, বা প্রধানমন্ত্রী বলবেন। সম্প্রতি আমরা দেখছি নদী দখলদার উচ্ছেদ শুরু হয়েছে। একটি টেলিভিশন টকশোতে বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যানকে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনারা কেন নেমেছেন এখন, এতদিন কেন কাজটি করেননি। তার উত্তর ছিল প্রধানমন্ত্রী বলছেন তাই তারা করছেন। যেন, প্রধানমন্ত্রী না বললে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা তাদের কাজ নয়।

দুর্নীতি আর অদক্ষতায় ডুবে থাকা সরকারি প্রতিষ্ঠান সমূহ আজ এই অবস্থায় পৌঁছেছে যে তাদের ঠেলা ধাক্কা দিয়ে কাজ করাতে হয়। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন চেয়ারম্যান সম্পাদকদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় প্রসঙ্গটি তুলে ধরে তাদের কাছ থেকে পরামর্শ চেয়েছেন। সত্যি বলতে কি দুর্নীতিতে আচ্ছন্ন থেকে কাজ করার অনীহায় থাকা আমাদের সরকারি প্রশাসন যন্ত্রের কারণে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ যেন আজ ব্যর্থ হতে চলেছে। আমাদের উন্নয়ন স্পৃহা জেগেছে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক নেতৃত্বে, অথচ জনপ্রতিষ্ঠানগুলো সেই স্তরে নিজেদের নিতে পারছে না।

এই কাজ না করার মানসিকতা সৃষ্টি হয়েছে অবাধ দুর্নীতি, থেকে। অনেকেই বলেন, বাংলাদেশ এখন একটি পর্যায় অতিক্রম করছে, উন্নয়নের মহাসড়ক ধরে হাঁটছে তাই এমন অবস্থায় দুর্নীতি কিছু হতেই পারে। কিছু দুর্নীতি আর দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার এক বিষয় নয়। নয় বলেই, প্রধানমন্ত্রী এবং তার দল দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা বলেন, সুশাসনের প্রধান অন্তরায় হিসেবে দুর্নীতিকে চিহ্নিত করেন।

হ্যাঁ, একথা সত্য যে বাংলাদেশের আয়বৃদ্ধির হার সাম্প্রতিক কালে বেশ বাড়তির দিকে। কিন্তু দুর্নীতি মাপার প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল- এর হিসাব মতে বিশ্বের চরম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থানও বেশ পাকাপোক্ত। ব্যাংক ও আর্থিক খাতের দুর্নীতি আমাদের দেশের অর্থনীতিকে কোন এক অজানা গহ্বরে নিয়ে যায় সে নিয়ে সবাই শংকিত। কিন্তু ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগের পরিবর্তে এই খাতের লুটেরাদের নানা সুবিধা দেয়ার আয়োজনই বেশি করছে রাষ্ট্র।

যারা বলেন উন্নয়ন হলে দুর্নীতি হবেই, তারা কি তবে বলতে চান যে, উন্নয়ন আর দুর্নীতি হাতে হাত ধরে চলবে? যে দেশ এক নাগাড়ে দশ বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন করে চলছে, সেই আমলে দুর্নীতি কেন বাড়বে? যারা এসব বলছেন তারা আসলে দুর্নীতি সম্পর্কে সমাজের নৈতিক অবস্থান বা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানোর কোন দীর্ঘস্থায়ী খারাপ ফল নিয়ে ভাবছেন না।

সম্পাদকরা বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছেন। একটি পরামর্শ ছিল চুনোপুঁটিদের না ধরে রাঘববোয়ালদের যেন শাস্তি দিতে সক্রিয় হয় দুদক। দুদকের হয়তো সেই চেষ্টাও আছে। কিন্তু অত্যন্ত বেদনার সাথে লক্ষ্য করতে হচ্ছে যে, দুর্নীতি সম্পর্কে সমাজের নৈতিক অবস্থানকে ভঙ্গুর করে দেয়ার চক্রান্তে অনেকেই কম-বেশি শামিল হচ্ছেন প্রতিনিয়ত।

একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের আসলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে মূল্যবোধ তৈরির ব্যাপারে আমাদের সামাজিক অনীহা চোখে পড়ার মতো। যারা দুর্নীতিকে বড় সমস্যা হিসেবে দেখতে চান না, তারা প্রতিনিয়ত মাত্রাতিরিক্ত বৈভবের প্রদর্শনী করে করে সমাজের ভেতর অন্যায়ের সংস্কৃতিকে একটা বৈধতা দেয়ার প্রচেষ্টায় লিপ্ত। দুঃখের বিষয়, চুরি করা, ঘুষ খাওয়া, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট করা, দখল করার সংস্কৃতিকে বৈধতা দেয়ার সক্রিয়তা আছে রাজনীতি ও বুদ্ধিজীবী সমাজে বিচরণকারীদের অনেকের ভেতরেই।

কিছু পরিস্থিতি থাকে যখন, উন্নয়ন এবং দুর্নীতি হাতে হাত ধরে এগোয়, অর্থাৎ, উন্নয়নও হয়, দুর্নীতিও চলতে থাকে। কিন্তু পরিস্থিতি এখন এমন এক দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা আছে যেন, উন্নয়নের নামে শুধুই দুর্নীতি হয়। দুদক চেয়ারম্যান স্বীকার করেছেন, দেশ থেকে দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অংকের টাকা বাইরে পাচার হয়ে যাচ্ছে এবং সেটা হচ্ছে ক্ষমতা প্রয়োগ করেই।

সন্দেহ নেই দুর্নীতি সরাসরি দরিদ্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করে। আবার দেখা যাচ্ছে দারিদ্র্য নিয়েই দুর্নীতি হয়। দশ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রির একটি দরিদ্র বান্ধব কর্মসূচি ভেস্তে গেছে দারিদ্র্য নিয়ে দুর্নীতির কারণেই। রাস্তাঘাট, অবকাঠামোর উন্নয়ন চোখে পড়ছে। তেমনই চোখে পড়ার মতো বিষয় ব্যাংক কেলেংকারীসহ নানা বড় দুর্নীতি। বেসিক ব্যাংক, হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, কয়লা কেলেঙ্কারীর মতো অনেক রূপকথাসম দুর্নীতির কোন বিচার হয়নি আজও। বিচারিক প্রক্রিয়ার নামে শুধু দীর্ঘসূত্রিতাই দেখছে মানুষ।

দুর্নীতি বিরোধী প্রায় সব আয়োজনই লক্ষ্যহীন আর দায়সারা গোছের। বড় আয়োজনে উন্নয়ন করেও সরকারের ভাবমূর্তি এই একটি ক্ষেত্রে নিতান্ত মলিন। মানুষের কাছে দুর্বল প্রশাসনের পরাকাষ্ঠা হিসেবেই সরকার প্রতিভাত হচ্ছে। একটি দক্ষ ও দায়বদ্ধ প্রশাসন ছাড়া শাসনপ্রণালীতে কোন নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য বা দিশা প্রদান সম্ভব হবে না। সুশাসনই সরকারের একমাত্র চ্যালেঞ্জ, আবার একইসাথে তার জন্য সুযোগ। তাই আমলা বা রাজনীতিক, ব্যবসায়ী যে-ই অপদার্থ বা দুর্নীতিগ্রস্ত হন, তিনি যে মত বা দলের হন, তবে তাকে বাদ দেয়াই শাসনপ্রণালীকে পরিশুদ্ধ করার শ্রেষ্ঠ পন্থা।

রাজধানীর বাতাসে বসন্তের ছোঁয়া শেষ হওয়ার পথে। নতুন ঋতু আসছে। কিন্তু সবসময়ই দুর্নীতির ঋতু অপরিবর্তিত থাকছে। মানুষ দেখতে চায় এবার সেই ঋতুর পরিবর্তন হচ্ছে।

লেখক : প্রধান সম্পাদক, জিটিভি।

এইচআর/এমএস

‘একটি দক্ষ ও দায়বদ্ধ প্রশাসন ছাড়া শাসনপ্রণালীতে কোন নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য বা দিশা প্রদান সম্ভব হবে না। সুশাসনই সরকারের একমাত্র চ্যালেঞ্জ, আবার একইসাথে তার জন্য সুযোগ। তাই আমলা বা রাজনীতিক, ব্যবসায়ী যে-ই অপদার্থ বা দুর্নীতিগ্রস্ত হন, তিনি যে মত বা দলের হন, তবে তাকে বাদ দেয়াই শাসনপ্রণালীকে পরিশুদ্ধ করার শ্রেষ্ঠ পন্থা। ’