বঙ্গবন্ধু নেই আছে তাঁর স্বপ্ন

অঘোর মন্ডল
অঘোর মন্ডল অঘোর মন্ডল , স্পোর্টস এডিটর, দীপ্ত টিভি
প্রকাশিত: ১০:১২ এএম, ১৭ মার্চ ২০১৯

ধানমন্ডি বত্রিশ। শুধু একটা রাস্তার নম্বর নয়। ওটা আসলে বাংলাদেশের ঠিকানা। বাংলাদেশের জন্মকথায় ওটাই বাংলাদেশের আঁতুড় ঘর। ওখান থেকেই ঘোষণা হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। তারপর হাজার বছরের বাঙালি জাতি পেয়েছে একটা স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। আর আটচল্লিশ বছর বয়সী এই দেশটার জন্ম যার হাত ধরে, সেই খোকার জন্ম বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার সর্ব দক্ষিণের গ্রাম টুঙ্গিপাড়ায়। আজ থেকে ঠিক ৯৯ বছর আগে।

মধুমতি নদীর কোলঘেঁষে থাকা টুঙ্গিপাড়ার সেই খোকা, মা-বাবার দেয়া যাঁর পোশাকী নাম শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালির দেয়া তাঁর উপাধি- 'বঙ্গবন্ধু'। বাংলাদেশের স্থপতি হিসেবে এদেশের সংবিধানে যিনি ' জাতির পিতা'। হাজার বছরের সেই শ্রেষ্ঠ বাঙালির আজ নিরানব্বই তম জন্ম দিন। কিন্তু কলংকের বোঝা মাথায় নিয়ে বাঙালি জাতি আজ পালন করবে তাঁর জন্মদিন। কারণ, যিনি বাঙালিকে দিয়েছেন একটা স্বাধীন দেশ। দিয়েছেন একটা স্বাধীন জাতি সত্ত্বা। সেই লোকটার জীবনের দৈর্ঘ্য বাঙালি থামিয়ে দিয়েছিল মাত্র ৫৫তে! এবং সেটা তাঁর নিজের হাতে গড়া স্বাধীন বাংলাদেশে!

বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন। পালিত হয় 'জাতীয় শিশু দিবস ' হিসেবে। আজকের সেই শিশুরা বঙ্গবন্ধুকে কতটুকু চেনা-জানার সুযোগ পাচ্ছে? একটা প্রজন্ম ঘুরপাক খাচ্ছেন বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগ নেতার মধ্যে! আর আওয়ামী লীগ কখনো কখনো অতিউৎসাহী হয়ে বঙ্গবন্ধুকে বন্দী করে রাখছেন শুধু তাঁদের নেতা হিসেবে! বঙ্গবন্ধু সমগ্র জাতির। নেতা সারা বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষের। সেই সত্যটাকেই তাঁরা মাঝে মধ্যে ভুলে যান। আরেকটা প্রজন্ম বঙ্গবন্ধুকে আটকে রাখতে চান শুধু ৭ই মার্চের ভাষণের মধ্যে!

দীর্ঘদেহী বঙ্গবন্ধু, বিশাল হৃদয়ের বঙ্গবন্ধুর জন্ম হিজল-তমালের সবুজে ঘেরা ছোট্ট একটা গ্রামে। বইয়ের পাতায় লেখা সবুজ-শ্যামল বাংলার গ্রাম বলতে যা ছিল, ঠিক ছবির সেরকম এক গ্রামে। যার নাম টুঙ্গিপাড়া। বঙ্গবন্ধুর শৈশব কেটেছে সেই গ্রামের খোকা হিসেবে। খোকা থেকে হয়েছেন তিনি শেখ মুজিবুর রহমান। আর শেখ মুজিবুর রহমান থেকে আওয়ামী লীগের সভাপতি হয়ে ওঠা। পরবর্তীতে যিনি বঙ্গবন্ধু। সেই লোকটা স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপতি হলেন। প্রধানমন্ত্রী হলেন। আর তাঁকে সপরিবারে হত্যা করা হলো সেই বাংলাদেশের ঠিকানা ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বরে!

কিন্তু বঙ্গবন্ধু ঘুমিয়ে আছেন তাঁর সেই জন্মভিটাতে। এখন যেটা বঙ্গবন্ধুর সমাধি হিসেবে চিহ্নিত। আসলে সেই টুঙ্গিপাড়া এখন বাঙালি জাতির এক তীর্থস্থান। যদিও খানিকটা পর্যটন এলাকার আদলে গড়ে উঠেছে আজকের টুঙ্গিপাড়া। বঙ্গবন্ধুর সেই গ্রাম আজ পৌরসভা। সেখানেও লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। গ্রাম রুপান্তরিত হয়েছে শহরে। হয়তো আগামীতে রুপ নেবে আরো বড় নগরী থেকে মহানগরীতে। কিন্তু তাতে কী বঙ্গবন্ধু ঘুমিয়ে আছেন তাঁর স্বপ্ন নিয়ে নিজের সেই গ্রামে।

মধুমতি নদী থেকে নদী থেকে উঠে আসা ছোট এক নদী নাম- বাঘিয়া। সেই বাঘিয়া নদীর পাড়ে আছে একটা হিজল গাছ। গ্রামে গেলেই যে গাছের তলায় বসতেন বঙ্গবন্ধু। সেই হিজল গাছটা আজও অবশ্য তেমনই আছে। বাঘিয়া নদীটা অবশ্য ধীরে ধীরে আধুনিকতার সাথে তাল মেলাতে গিয়ে খানিকটা লেকের মত রুপ নিয়েছে!

গাছ-নদী-ফুল-পাখি আর সবুজ শ্যামলীমা হয়তো বঙ্গবন্ধুর খুব পছন্দের ছিল। তাই ধানমন্ডি ৩২ -এর লেকের পাড়ের বাড়িটাও ছিল সবুজ-গাছ-গাছছালিতে ঘেরা। কিন্তু ধানমন্ডি কী সত্যি-ই তাঁকে সেভাবে টানতো! হয়তো না। তাই মরণের পরে তিনিও ফিরে গেছেন তাঁর সেই গ্রামে। যে গ্রাম নিয়ে তিনি স্বপ্ন দেখতেন; নিজের অবসর জীবনের বাকি দিনগুলো ওখানে কাটানোর।

তাই দেশের রাষ্ট্রপতি থাকার সময় বাঘিয়া নদীর ওপারে ছোট্ট একটা দোতালা বাংলো বানিয়েছিলেন। সেটাও বঙ্গবন্ধুর সাদা-মাটা সাধারণ জীবনের মত। যেখানে ছিল না টাইলস-পাথরের কোন বাহুল্য। ছিল না মেকি আভিজাত্যের কোন ছোঁয়া। অথচ সেই বাংলা বানিয়েছিলেন বাংলাদেশ নামক দেশটার স্থপতি। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। কিন্তু তিনিতো চেয়েছিলেন অবসরপ্রাপ্ত জীবনের বাকি দিনগুলো নিজের মত করেই কাটাতে। কিন্তু পারলেন কোথায়?

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সেই সময়ের উর্দিপরা সামরিক শাসকরা বঙ্গবন্ধুকে বানিয়েছিলেন সোনালী ব্যাংকের শাখা। শুধু মাত্র বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি আর স্বপ্নকে হত্যা করতে। কিন্তু পারলেন কোথায়। সময় বড় নির্মম শিক্ষা দেয়। বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্নের পরিধি এখন টুঙ্গিপাড়ার মানুষের স্বপ্নকেও বড় করেছে। হয়তো প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নকেও বড় করেছে।

তবে হ্যাঁ,আজকের টুঙ্গিপাড়ায় আপনি হয়তো সবই পাবেন। অনেক বড় বাংলো। সরকারি ঝকঝকে তকতকে অফিস। অনেক বড় বড় আধুনিক নকশায় গড়া বাড়ি। কিন্তু তার পাশেই খুঁজে পাবেন সেই উনিশ দশকের মাঝামাঝি সময়ে জমিদারদের অনুমতি নিয়ে খানিকটা মোগল স্থাপত্যের আদলে গড়া বঙ্গবন্ধুর পৈত্রিক বাড়িটাও। শুধু পাবেন না বঙ্গবন্ধুকে। অথবা টুঙ্গিপাড়ার সেই খোকাকে। যিনি টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলেন একটা স্বাধীন দেশের।

সেই টুঙ্গিপাড়ায় অজানা কোন পথিকেরও এখন কষ্ট হবে না বঙ্গবন্ধুর মাজার দেখার রাস্তা খুঁজে পেতে। কিন্তু ক'জন জানার চেষ্টা করছেন বঙ্গবন্ধুকে। চেনার চেষ্টা করছেন তাঁকে। আগামী প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধুকে সঠিকভাবে চেনা-জানার পথ দেখানোর দায় থাকছে তাদের আগের প্রজন্মের।

আগামী বছর এই দিনে গোটা জাতি উদযাপন করবে বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকী। কিন্তু সেটা শুধু পালনের জন্য পালন না হয়। তাঁর জন্মদিনে সবচেয়ে বড় বিবেচনা এবং উপলব্ধির বিষয়, বঙ্গবন্ধুর চেতনা নিজেরা কতোটা ধারণ করতে পারলাম। আগামী প্রজন্মের কাছে সেই চেতনা বিকাশের পথ আর ঠিকানা দেখানোর কাজটা করতে হবে সবাইকে। তাহলেই খোকার স্বপ্ন থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন সবকিছুর পরিধি আরো বড় হয়ে উঠবে।

লেখক: সিনিয়র জার্নালিস্ট ও কলাম লেখক।

এইচআর/এমএস

‘সেই টুঙ্গিপাড়ায় অজানা কোন পথিকেরও এখন কষ্ট হবে না বঙ্গবন্ধুর মাজার দেখার রাস্তা খুঁজে পেতে। কিন্তু ক'জন জানার চেষ্টা করছেন বঙ্গবন্ধুকে। চেনার চেষ্টা করছেন তাঁকে। আগামী প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধুকে সঠিকভাবে চেনা-জানার পথ দেখানোর দায় থাকছে তাদের আগের প্রজন্মের।’

আপনার মতামত লিখুন :