আবরার খুন: ট্রাফিক সপ্তাহে সড়ক ব্যঙ্গ

মোস্তফা কামাল
মোস্তফা কামাল মোস্তফা কামাল , সাংবাদিক
প্রকাশিত: ১০:১৮ এএম, ২০ মার্চ ২০১৯

নিরাপদ সড়ক চাওয়া শিক্ষার্থীও সড়ক হত্যার শিকার। তা-ও নিরাপদ সড়কের লক্ষ্যে চলমান ট্রাফিক সপ্তাহের মধ্যে। তামাশারও যেন অবশিষ্ট থাকতে নেই।

রেষারেষি-ঘেঁষাঘেঁষিতে জীবন নাশ। বাবা-মায়ের পরম যত্ন-আত্তিতে বড় করে তোলা আবরার বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস-বিইউপির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের মেধাবি ছাত্র। সু-প্রভাত পরিবহনের যন্ত্রদানব বাসটি মঙ্গলবার সকাল সাড়ে আটটায় পিষে মারে তাকে। এটিকে খুন না বলে দুর্ঘটনা বললে সত্যখেলাপ করা হয়। আবরার পড়াশোনা, খেলাধুলা, বিতর্ক, আচার-আচরণে মনে রাখার মতো ছেলে বলে মন্তব্য করেছেন তার শিক্ষকরা।

ক্লাশে যাওয়ার উদ্দেশে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে নর্দ্দায় যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বিইউপির বাসে ওঠার সময় বাসটি তাকে চাপা দেয়। দুর্ঘটনার পর যমুনা ফিউচার পার্কের সামনের রাস্তা অবরোধ করে আবরারের সহপাঠী, বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী। দোষী বাস চালকের শাস্তি ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্লোগান দেয় তারা।

'উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগানে ওই এলাকা প্রকম্পিত করেছে তারা। যেমন নানা নিত্য-নতুন স্লোগানে মুখর হয়েছিল গত বছর নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনে। আবরার আহমেদ চৌধুরী অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আরিফের বড় ছেলে।

রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে পুলিশের দৃশ্যমান তৎপরতা বা উদ্যম-উদ্যোগ ব্যাপক। কিন্তু শৃঙ্খলার দশা বড় করুণ। ট্রাফিক শৃঙ্খলা সপ্তাহ চলার মধ্যেই যত্রতত্র রাস্তা পারাপার, যাত্রী ওঠানো, বাসের দরজা বন্ধ না করা, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে চালকের কথা বলাসহ আইন না মানার চিরচেনা সব বিশৃঙ্খলাই চলছে।

গত ছয় মাসের মধ্যে দুই মাসেই ট্রাফিক সপ্তাহ, ট্রাফিক শৃঙ্খলা পক্ষ, ট্রাফিক সচেতনতা মাস নামে চলেছে বিশেষ কার্যক্রম। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে রাজধানীতে গত ১৭ মার্চ থেকে শুরু হওয়া পঞ্চমবারের মতো এই ট্রাফিক শৃঙ্খলা সপ্তাহ চলবে ২৩ মার্চ পর্যন্ত। এর মাঝেই সড়কে ঝড়লো নিরাপদ সড়কের জন্য আর্তি করা আবরারের প্রাণ।

শুধু সচেতনতামূলক কার্যক্রমে সড়কের নৈরাজ্য বন্ধ হবে না- এ বার্তা দেয়া বা বোঝার বাকি কিছু থাকে। গত বছরের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় দুই কলেজ শিক্ষার্থী নিহতের জেরে সেদিন থেকে নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নামে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। দেশে তৈরি হয় এক ভিন্নতর পরিস্থিতি। কোমলমতি শিক্ষার্থীরা আকর্ষণীয় নানা স্লোগান ও পদক্ষেপে শিক্ষামূলক নতুন এক তাড়না তৈরি করেই ঘরে ফেরে। তাদেরই একজন ছিলেন আবরার। আবরারের ফেসবুক প্রোফাইলে রয়ে গেছে সেই আন্দোলনের সাক্ষর।

তার প্রোফাইলে দেখা যায়, নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন চলাকালে তিনি তার ফেসবুক প্রোফাইল পিকচার পাল্টান। ২ আগস্ট পোস্ট দেয়া ছবির নিচে লেখা ‘নিরাপদ সড়ক চাই’। ২০১৮-র নিরাপদ সড়ক আন্দোলন বাংলাদেশে কার্যকর সড়ক নিরাপত্তার দাবিতে ২৯ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট ২০১৮ পর্যন্ত সংঘটিত একটি আন্দোলন বা গণবিক্ষোভ।

ঢাকায় ২৯ জুলাই সংঘটিত এক সড়ক দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নিহত দুই কলেজ শিক্ষার্থীর সহপাঠীদের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ পরবর্তীতে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং নৌমন্ত্রীর পদত্যাগসহ ৯ দফা দাবিতে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসে। তাদের ওই আন্দোলন ছিল একের পর এক দুর্ঘটনার জের। তারা খোলাসা করে জানিয়েছিল সড়ক নিরাপদ নেই। তা শিক্ষার্থীরা সবার সামনে নিয়ে এসেছে। যাত্রী বা পথচারীদের জীবনের কোনো মূল্য নেই পরিবহন সংশ্লিষ্টদের কাছে।

দুর্ঘটনার খবরে মন্ত্রীরা যখন দাঁতকেলিয়ে হেসে তাচ্ছিল্য ভরে কথা বলেন, তখন এটা পরিষ্কার হয় যে রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থায় কোনো জবাবদিহি নেই। জবাবদিহি নেই পুলিশেরও। কোনো কোনো দুর্ঘটনায় পুলিশের কামাই বাড়ে বলেও শোনা যায়।

abrar-ma-baba

রাষ্ট্র ও পুলিশের জবাবদিহি না থাকার প্রভাব পড়ে চালকের ওপর। একসময় শ্রমিকনেতা মালিক হয়। এখন মালিকেরাই রাষ্ট্রক্ষমতায়। অদক্ষতা ও নৈরাজ্য জায়গা করে নিয়েছে সবখানে।

শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাস্তবতা উন্মোচিত হয়েছে। ছেলেমেয়েরা নিঃস্বার্থভাবে পথে নেমেছে। তাদের মুনাফার কোনো বিষয় ছিল না। তারা দেখিয়েছে, মানুষের মধ্যে অনেক শক্তি আছে, তারা অনেক কিছু করতে পারে। দেশের মানুষের এই শক্তিকে সব সময় চাপা দিয়ে বা দমিয়ে রাখা যায় না। সড়কে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সম্ভব, সেটাও তারা দেখিয়েছে। ওই আন্দোলন দমাতে সরকার-সমর্থকরা নির্যাতন চালিয়েছে শিক্ষার্থীদের ওপর। হাতুড়িপেটা করেছে সংবাদ-সংগ্রহে-যাওয়া সাংবাদিকদের ওপর।

পুলিশ অধিকাংশ ক্ষেত্রে আক্রমণকারীদের প্রতি নির্বিকার থাকলেও বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের দমাতে লাঠিচার্জ, কাঁদানেগ্যাস ও রাবার বুলেট ব্যবহার করে। আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে ও নৌমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে ৫ আগস্ট ধানমন্ডিতে বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও প্রধানত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী মিছিল করে।

ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিমানবন্দর এলাকায় সড়কে অবস্থান নেয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহস্রাধিক শিক্ষার্থী সকালে বিক্ষোভ মিছিল করে এবং রাতে মশাল মিছিল করে সরকারের কাছে ৮ দফা দাবি দেয়। ৬ আগস্ট ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং ডিএসও সংগঠনের কর্মীরা আন্দোলনের সমর্থনে বিক্ষোভ মিছিল করে। এছাড়া বহির্বিশ্বে বিভিন্ন দেশে প্রবাসীরাও বিক্ষোভসমাবেশ করেন। সর্বশেষ ৮ আগস্ট ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা গ্রেপ্তারকৃত আন্দোলনকারীদের মুক্তি চেয়ে ক্লাশ বর্জন করে।

২০১৮-র নিরাপদ সড়ক আন্দোলন বাংলাদেশে কার্যকর সড়ক নিরাপত্তার দাবিতে ২৯ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট ২০১৮ পর্যন্ত সংঘটিত একটি সফল আন্দোলন বা গণবিক্ষোভ। সরকার এতে এক পর্যায়ে সাড়াও দেয়। আবার পরিস্থিতির উন্নতি করার মূল দায়িত্ব সরকারেরই। কিন্তু বড় গোলমাল সেখানে। একজন চালক ঠিকমতো গাড়ি চালাতে পারে কি না, তা পরীক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা নেই।

পরীক্ষা না দিয়েই তারা রাস্তায় গাড়ি চালাচ্ছে। কিন্তু রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা পরিস্থিতিকে অবনতির দিকে নিতে সহায়তা করেছেন। তাঁদের কেউ কেউ বলেছেন, গাড়িচালকদের লেখাপড়া জানার দরকার নেই। চালকেরা সড়কের পাশের ছবি, সংকেত বুঝতে পারলেই চলবে। ড্রাইভারদের গরু-ছাগল চিনলেই চলবে-এমন মন্তব্যও ছোঁড়া হয়েছে। সরকারের সঙ্গে পরিবহন শ্রমিক ও মালিকপক্ষের বোঝাপড়া চমৎকারের চেয়েও বেশি কিছু। আর মালিকের আশকারা আর উসকানিতে চালকেরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। সরকারের সদিচ্ছা আর জবাবদিহিই পারে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে।

৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তৃতীয় মন্ত্রিসভা একটি খসড়া ট্রাফিক আইন অনুমোদন করে, যে আইনে ইচ্ছাকৃতভাবে গাড়ি চালিয়ে মানুষ হত্যায় মৃত্যদণ্ড এবং বেপরোয়াভাবে চালিয়ে কারো মৃত্যু ঘটালে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়; যদিও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বেপরোয়া চালনায় মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছিল। ৮ আগস্টের মধ্যে শহরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। কিন্তু সড়ক শৃঙ্খলা স্বাভাবিক হয়নি আজও।

গত বছর শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একটি কমিটি করা হয়। কমিটি গত বছরের ৩০ আগস্ট ৩০টি নির্দেশনা জারি করে। এর মধ্যে সাতটি নির্দেশনা ছিল দ্রুত কার্যকর করার মতো। পুলিশের ঘোষিত শৃঙ্খলা পক্ষের কার্যক্রমের সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি নির্দেশনাগুলোর মিল রয়েছে। চলমান শৃঙ্খলা পক্ষেও নির্দেশনাগুলোর বাস্তবায়নে তেমন অগ্রগতি হয়নি। তারপরও নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দেওয়া স্বল্পমেয়াদি নির্দেশনাগুলো পড়ে রয়েছে অন্যসব নির্দেশনার মতোই।

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন।

এইচআর/জেআইএম

সরকারের সঙ্গে পরিবহন শ্রমিক ও মালিকপক্ষের বোঝাপড়া চমৎকারের চেয়েও বেশি কিছু। আর মালিকের আশকারা আর উসকানিতে চালকেরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। সরকারের সদিচ্ছা আর জবাবদিহিই পারে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে।

টাইমলাইন  

আপনার মতামত লিখুন :