মৃত্যুর বিনিময়ে ফুটওভার ব্রিজ!

আমীন আল রশীদ
আমীন আল রশীদ আমীন আল রশীদ , সাংবাদিক, কলামিস্ট
প্রকাশিত: ১০:১০ এএম, ২২ মার্চ ২০১৯

গত বছরের আগস্টে নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাজধানীসহ সারা দেশে শিক্ষার্থীদের, বিশেষ করে কিশোর-তরুণদের অভূতপূর্ব আন্দোলনের পরে একটি জায়গায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে—তা হলো মোটর সাইকেল চালক ও আরোহীর মাথায় হেলমেট।

সেইসাথে লোকজন ব্যাপক হারে নিজেদের যানবাহনের ফিটনেস সার্টিফিকেট এবং ড্রাইভিং লাইসেন্সও নবায়ন করেন। যাদের লাইসেন্স ছিল না, তারা অনেকেই লাইসেন্স করেন। এই কয়েকটি বিষয় ছাড়া সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আর কোনো যে অগ্রগতি হয়নি, তার প্রমাণ ওই আন্দোলনের সময় থেকে সম্প্রতি আবারও রাজধানীতে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর বাসচাপায় নিহত হওয়ার পর পুনরায় ছাত্র-ছাত্রীদের রাস্তায় নেমে এসে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগানে রাজপথ মুখরিত হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও সড়কে রক্ত ঝরেছে।

শিক্ষার্থীরা যখন দ্বিতীয় দফায় রাজপথে নামলেন ঠিক সেই সময়ে ২০ মার্চ বুধবারও দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় ১০ জনের বেশি মানুষের প্রাণ গেছে। এর মধ্যে একজন নিহত হয়েছেন খোদ রাজধানীর পল্টন এলাকায় একটি কুরিয়ার সার্ভিসের গাড়ির চাপায়। তার মানে যে গণপরিবহন চালকদের বিরুদ্ধে এন্তার অভিযোগ, যে গণপরিবহনের ফিটনেস নিয়ে হাজারো প্রশ্ন, যে পরিবহন পদ্ধতি বিশেষ করে শ্রমিকদের দিয়ে চুক্তিতে বাস চালানোর সমালোচনা— সেসব জায়গায় যে ন্যূনতম কোনো পরিবর্তন হয়নি; পরিবহন শ্রমিকদের বেপরোয়া আচরণ যে সামান্যতম উন্নতি হয়নি, তা দেশবাসীকে আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেলো রাজধানীর প্রগতি সরণিতে বাসপাচায় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস-বিইউপির শিক্ষার্থী আবরারের করুণ মৃত্যু।

সড়কে প্রাণহানি প্রতিদিনের সংবাদ শিরোনাম। একসাথে একই পরিবারের চারজনের মৃত্যু সংবাদও এখন আর আমাদের মনে হয়তো সেভাবে দাগ কাটে না। কিন্তু তারপরও যখন একজন স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রাণ হারান এবং সেই ঘটনাটি যখন ঘটে খোদ রাজধানীতে, তখন তার প্রতিক্রিয়াটি হয় ভিন্ন।

গত আগস্টের আন্দোলনের পরে এই সাত মাসে সারা দেশে অসংখ্য মানুষ নিহত হয়েছেন, কিন্তু তার কোনো ঘটনার পরে আমরা শুনিনি দুর্ঘটনাস্থলে ফুটওভার ব্রিজ করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। অথচ রাজধানীতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আবরারের মৃত্যুর পরপরই উত্তর সিটির মেয়র ঘোষণা দিলেন দুর্ঘটনাস্থলে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করা হবে এবং ঘটনার পরদিনই সেই ফুটওভার ব্রিজের কাজের উদ্বোধন করানো হয়েছে খোদ আবরারের বাবাকে দিয়ে। সন্তানের মৃত্যুর পরদিনই তার নামে ফুটওভার ব্রিজের ভিত্তি স্থাপন করতে গিয়ে আবরারের বাবার কী অনুভূতি হয়েছে, তা আমরা কোনোদিনই জানব না।

বলাই বাহুল্য, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন গত আগস্টের মতো যাতে সারা দেশে ছড়িয়ে না পড়ে এবং ব্যাপক আকার ধারণ না করে, সেজন্যই এই পদক্ষেপ। এই ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের পেছনে কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতা যতটা না, তার চেয়ে অনেক বেশি কাজ করেছে ভয়—সে বিষয়ে সন্দেহ কম।

এই ঘটনার পর আবরারের পরিবারকে সাত দিনের মধ্যে ১০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একটি রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে আদালত এই আদেশ দেন। চলচ্চিত্রনির্মাতা তারেক মাসুদ এবং সাংবাদিক মিশুক মুনীরেরা বিখ্যাত মানুষ ছিলেন। তাদের মৃত্যুর জন্য দায়ী চালকের বিচার হয়েছে। ক্ষতিপূরণ দিতে উচ্চআদালতের নির্দেশনা এসেছে। রাজধানীর একটি কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর বিষয়েও হাইকোর্ট রুল ও ক্ষতিপূরণের আদেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিদিন যে সারা দেশে আরও অসংখ্য সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে, তাতে তো রিট হয় না। ক্ষতিপূরণের আদেশ আসে না।

প্রতিদিন কত সম্ভাবনাময় প্রাণ ঝরে যাচ্ছে রাস্তায় কালোপিচে, কত মানুষের মৃত্যু হচ্ছে যারা ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি—তাদের কয়জনের খবর এই রাষ্ট্র রাখে? কত মানুষ চিরতরে পঙ্গু হয়ে পরিবারের বোঝা হয়ে জীবন্মৃত হয়ে বসে আছেন দেশের আনাচে-কানাচে, তাদের কতজন মানুষকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য আদালতে রিট আবেদন হচ্ছে? অর্থাৎ ঘটনাটি ঘটতে হবে রাজধানীতে এবং ব্যক্তিকে হবে গুরুত্বপূর্ণ—এই তাহলে শর্ত?

একটি মৃত্যুর পরে একটি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হলো, তাহলে প্রতিদিন সারা দেশে যে সড়ক দুর্ঘটনায় অগণিত মানুষের প্রাণ যায়, সেক্ষেত্রে কত শত, কত হাজার ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করা হবে? আবরারকে বেপরোয়া বাস চাপা দিয়েছে জেব্রা ক্রসিংয়ে। যেটি আসলে মানুষ পারাপারেরই জায়গা। এই দেশে ফুটপাতেও গাড়ি উঠে যায় এবং মানুষের প্রাণ যায়। সুতরাং ফুটওভার ব্রিজ করেই বা লাভ কী? সমস্যা তো ফুটওভার ব্রিজ বা জেব্রা ক্রসিংয়ের নয়। গাড়ির ফিটনেস বা চালকের লাইসেন্স আছে কি নেই, সেটিও হয়তো প্রধান সমস্যা নয়; প্রধান সমস্যা চালকের মানবিকতায়।

আমরা কাদের হাতে স্টিয়ারিং তুলে দিচ্ছি। যে লোক তার বাসের ভেতরে ৫০ জন যাত্রী নিয়ে রাজপথে ছুটলেন, সেই চালকের পরিচয় কী? তার শিক্ষা-দিক্ষা, তার মানবিক মূল্যবোধ, মানুষ সম্পর্কে তার শ্রদ্ধাবোধ কতটুকু? সকালে-সন্ধ্যায় কিংবা গভীর রাতে যে মানুষটির উপর ভরসা করে বাসে ওঠেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক থেকে শুরু করে পোশাক শ্রমিকরা, সেই মানুষটির পড়ালেখা যাই থাক, তিনি যে কাজের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত, সেই কাজটি সঠিকভাবে শিখেছেন কি না, তাকে যে লাইসেন্স দেয়া হয়েছে, সেটি সঠিক নিয়ম মেনে দেয়া হয়েছে কি না অথবা তার লাইসেন্স আদৌ আছে কি না—সেই প্রশ্ন তোলাই তো এক বিস্ময়!

তিনি যদি দক্ষ না হন, তার মধ্যে যদি মানবিক মূল্যবোধের ঘাটতি থাক, তিনি যদি অন্যের আগে পৌঁছানোর জন্য মহাসড়কে পাল্লা দেন, তিনি যদি বাড়তি ট্রিপের লোভে ট্রাফিক আইন ভেঙে বেপরোয়া গতিতে ছুটতে থাকেন, তখন বিপন্ন হয় তার পেছনে বসা সব মানুষ। সেই বাসে কিংবা এরকম আরেকটি বাসের ভেতরে তো ওই চালকের স্ত্রী-সন্তান কিংবা বাবা-মাও থাকতে পারেন।

সুতরাং আইনের কঠোর প্রয়োগের চেয়েও বেশি প্রয়োজন গণপরিবহন চালকের মানবিক বোধ। যাদের হাতে আমাদের জীবন, গণপরিবহনের যে চালকেরা আমাদের নিয়ে যান মাইলের পর মাইল; গভীর রাতে ফাঁকা মহাসড়কের যে চালক চল্লিশজন মানুষকে বহন করে নিয়ে যান, তার দায়িত্ববোধ, মানবিকতাবোধ কতুটুকু আছে, মানুষের প্রতি মমত্ববোধ কতুটুক আছে, সেই হিসাব আমরা কখনও করিনি।

এতগুলো মানুষের জীবন যার হাতে, সেই মানুষটিকে জীবন ও জীবনের মূল্য সম্পর্কে কখনও জ্ঞান দেওয়া হয়েছে? সরকারি-বেসরকারি কোনও প্রতিষ্ঠান কখনও কি এই চালকদের সঙ্গে এ বিষয় নিয়ে আন্তরিকভাবে কথা বলেছে? দুর্ঘটনার পরে আমরা চালককে খুব দোষারোপ করি। তার ফাঁসির দাবি জানাই। কিন্তু যে মানুষটির হাতে আমরা স্টিয়ারিং তুলে দিচ্ছি, তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, পারিবারিক মূল্যবোধ ইত্যাদি যে কত গুরুত্বপূর্ণ তা কখনও ভেবেছে আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র?

চুক্তিভিত্তিক গাড়ি চালানো এবং রাজধানীর ভয়াবহ ট্রাফিক জ্যামও গণপরিবহন চালকদের বেপরোয়া হতে বাধ্য করে। কারণ মালিকের সঙ্গে চুক্তি থাকায় তাকে যেভাবেই হোক একটি নির্দিষ্ট অংকের টাকা রোজগার করতেই হয়; না হলে তারও ঘরে হাঁড়ি চড়বে না। আবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে বসে থাকলে তার ট্রিপের সংখ্যা কমে যায়। ফলে সে প্রতিদ্বন্দ্বী বাসের সাথে পাল্লা দেবেই।

সুতরাং সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে শুধু গাড়ির ফিটনেস আর চালকের দক্ষতাই নয়, নজর দিতে হবে পুরো সড়ক ব্যবস্থাপনায়। রাজধানীতে চুক্তিভিত্তিক প্রথা বাতিল করে চালক ও কন্ডাকটরদের নিয়মিত বেতনের আওতায় আনা না গেলে রাজপথে অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলতেই থাকবে এবং শিক্ষার্থীরা ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ বলে যত চিৎকার চেচামেচি করুক না কেন, সড়কে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘই হবে। সেইসাথে রাস্তায় চলতে গিয়ে সাধারণ মানুষও যে বেপরোয়া আচরণ করে, এক মিনিটের দূরত্বে ফুটওভার ব্রিজ বা আন্ডার পাস থাকা সত্ত্বেও ব্যস্ত রাস্তা পার হতে গিয়ে নিজেই নিজের বিপদে ডেকে আনে, দ্রুতগামী গাড়িকে হাতের ইশারায় থামিয়ে দিতে চায়—এই ভয়াবহ প্রবণতাও বন্ধ করা জরুরি।

লেখক : সাংবাদিক।

এইচআর/এমএস

‘কত মানুষ চিরতরে পঙ্গু হয়ে পরিবারের বোঝা হয়ে জীবন্মৃত হয়ে বসে আছেন দেশের আনাচে-কানাচে, তাদের কতজন মানুষকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য আদালতে রিট আবেদন হচ্ছে? অর্থাৎ ঘটনাটি ঘটতে হবে রাজধানীতে এবং ব্যক্তিকে হবে গুরুত্বপূর্ণ—এই তাহলে শর্ত?’