অর্থবছর হোক ‘বৈশাখ-চৈত্র’

শাজনুশ টিটন
শাজনুশ টিটন শাজনুশ টিটন
প্রকাশিত: ০৮:০৮ এএম, ১৪ এপ্রিল ২০১৯

একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল হলো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। আর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে থাকে অর্থবছরের ওপর। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন অর্থবছরের প্রচলন রয়েছে। যেমন, কোথাও জানুয়ারি-ডিসেম্বর, কোথাও এপ্রিল-মার্চ, কোথাও জুলাই-জুন। অনেক দেশের অর্থবছরে বিচিত্রতা রয়েছে। যেমন, নেপালে ১৭ জুলাই, ইথিওপিয়ায় ১১ সেপ্টেম্বর এবং ইরানে ২১ মার্চ থেকে অর্থবছর শুরু হয়। এ ধরনের ভিন্নতার মূল কারণ তাদের নিজস্ব বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করা।

আমাদের বাংলাদেশে অর্থবছর শুরু হয় ১ জুলাই থেকে। দক্ষিণ এশিয়ায় আমাদের ছাড়া একমাত্র পাকিস্তানে ১ জুলাই থেকে অর্থবছর শুরু হয়। আমাদের এই প্রচলিত অর্থবছর চালু হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে। এরপরে পাকিস্তান আমলে তা অব্যাহত থাকে। খোদ ব্রিটিশরা তাদের অর্থবছর পরিবর্তন করলেও আমরা এখনো বয়ে যাচ্ছি।

বাঙালি প্রধান আমাদের এই দেশের কিছু নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আমাদের নিজস্ব বর্ষপঞ্জিও রয়েছে। যা বাংলা বর্ষ হিসেবে পরিচিত। বাঙালি সমাজের কৃষি, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড বাংলা বর্ষ অনুযায়ীই পরিচালিত হয়।

পহেলা বৈশাখেই হালখাতা উদযাপন করেন দেশের ব্যবসায়ীরা। হালখাতা বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং হাজার বছরের ঐতিহ্য। হালখাতা অর্থবছরেরই অন্যরুপ। কিন্তু সরকারি ভাবে অর্থবছর শুরু করা হয় ১ জুলাই থেকে। তবে বাঙালি সংস্কৃতির নিজস্বতায় যদি পহেলা বৈশাখ থেকে অর্থবছর চালু করা হয় তাহলে সেটা উন্নয়ন কাজে বাধা দূর করবে, জনজীবনে দুর্ভোগ কমাবে এবং বিভিন্ন অসুবিধার সমাধান হবে।

আমাদের দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির ওপর। আর কৃষি নির্ভর করে আবহাওয়ার ওপরে। কিন্তু আমাদের দেশের অর্থবছর আমাদের আবহাওয়ার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কৃষিপ্রধান অর্থনীতির দেশ হিসেবে আমাদের অর্থবছর কৃষিবান্ধব হওয়া প্রয়োজন।

বাঙালি সংস্কৃতির উপাদান হিসেবে আমরা প্রতি বছর পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ পালন করে থাকি। বাংলা বর্ষ চালু করেছিলেন মোঘল সম্রাট আকবর ১৫৮৫ সালে। সম্রাটের ফরমান অনুযায়ী আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজী উদ্ভাবিত ‘বাংলা ফসলী সন’কে সরকারি বর্ষপঞ্জিকা হিসেবে প্রবর্তন করা হয়।

‘বাংলা ফসলী সন’ই বর্তমানে বাংলা বর্ষ হিসেবে প্রচলিত। বাংলার কৃষিব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এই পঞ্জিকা অনুযায়ীই সম্রাট অত্র অঞ্চলের খাজনা আদায় করতেন। অর্থাৎ, সম্রাট আকবরের আমলে পহেলা বৈশাখ থেকেই শুরু হতো অর্থবছর।

বাংলাদেশে বাঙালি ছাড়াও বেশ কয়েকটি ভিন্ন জাতিসত্তার মানুষ বসবাস করে। পাহাড় ও সমতলে বসবাস করা এই সকল মানুষ আমাদের নিকট আদিবাসী নামে পরিচিত। এই সকল জাতিগোষ্ঠীর বর্ষপঞ্জিকাও ১৪ এপ্রিল থেকে শুরু হয়। যেমন, চাকমা ও তঞ্চঙ্গাদের বিঝু, মারমাদের সাংগ্রাই, ত্রিপুরাদের বৈসুব। পার্বত্য অঞ্চলে যা বৈসাবি নামে পরিচিত। এই সকল বর্ষপঞ্জিকাও কৃষিব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল।

সুতরাং এটা প্রতীয়মান যে, বাংলাদেশের সকল জনগোষ্ঠীই একটি অভিন্ন বর্ষপঞ্জিকা অনুসরণ করে, যা কৃষিভিত্তিক। তাই, যদি আমাদের অর্থবছর পহেলা বৈশাখ অর্থাৎ ১৪ এপ্রিল থেকে শুরু হয় তাহলে সেটা দেশের সকল জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয়ই বহন করবে।

আমাদের দেশের প্রচলিত বর্ষপঞ্জিকা খ্রিস্টীয় বর্ষপঞ্জিকা হলেও সাধারণ কৃষকগণ তাদের চাষাবাদের জন্য বাংলা বর্ষপঞ্জিকাই অনুসরণ করেন। এমনকি গ্রাম অঞ্চলের সাধারণ মানুষ ইংরেজি তারিখ থেকে বাংলা তারিখ হিসেব করতেই সাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। নিজস্ব ব্যবস্থা বাংলা বর্ষ্পঞ্জিকা অনুযায়ী অর্থবছরের প্রচলন করা হলে তা আমাদের সাধারণ মানুষের প্রতীক বাঙালি জাতীয়তাবাদেরই বহিঃপ্রকাশ হবে।

জুলাই থেকে অর্থবছর হওয়ার কারণে অর্থবছরের শেষ মাস জুন মাসে বিল পাওয়ার জন্য দেশজুড়ে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়ে যায়। জুন মাস বর্ষাকাল হওয়ায় প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। এমনিতেই ঢাকা শহরের বেশির ভাগ রাস্তার অবস্থা খারাপ এবং পানি বের হওয়ার পথ বন্ধ থাকায় নগরী জুড়ে জলজটের সৃষ্টি হয়।

এর সঙ্গে জুনের আগে কাজ শেষ বা বিল নিতে একসঙ্গে নানা কাজের ধাক্কায় অবস্থা হয়ে যায় আরও বেগতিক। কিন্তু যদি আমাদের দেশের আবহাওয়া অনুযায়ী এপ্রিল- মার্চ (বৈশাখ- চৈত্র) থেকে অর্থবছর চালু করা হয় তাহলে বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগেই আগের বছরের সব কাজ শেষ করা সম্ভব। এরফলে, জনদুর্ভোগ কমার পাশাপাশি অর্থের অপচয়ও বন্ধ হবে।

অর্থবছর পরিবর্তনের প্রসঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে সামঞ্জস্যতার কথা বলা হয়। কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন অর্থবছর চালু থাকায় যদি পহেলা বৈশাখ থেকে অর্থবছর চালু করা হয় তাহলে কোন ধরনের অসামঞ্জস্যতার সৃষ্টি হবে না।

ব্রিটিশ ও পাকিস্তানের ঔরসজাত অর্থবছর পরিবর্তন করে পহেলা বৈশাখ (১৪ এপ্রিল) থেকে অর্থবছর চালু করা হলে সেটা হবে মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের বহিঃপ্রকাশ।

লেখক : প্রাক্তন শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
Shajnush.titon@gmail.com

এইচআর/এমএস

‘ব্রিটিশ ও পাকিস্তানের ঔরসজাত অর্থবছর পরিবর্তন করে পহেলা বৈশাখ (১৪ এপ্রিল) থেকে অর্থবছর চালু করা হলে সেটা হবে মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের বহিঃপ্রকাশ।’

আপনার মতামত লিখুন :