বর্ষা হোক দুর্ভোগমুক্ত

সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয় সম্পাদকীয়
প্রকাশিত: ১০:২৩ এএম, ১৬ জুন ২০১৯

আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে/ আসে বৃষ্টির সুবাস বাতাস বেয়ে। আজ আষাঢ়ের দ্বিতীয় দিন। গাছে গাছে কদম কেয়া ফোটার দিন। বর্ষাকে বলা হয় কবিতার ঋতু আবেগের ঋতু। বর্ষায় বৃষ্টির রিমঝিম শব্দের মধ্যে আমাদের সমস্ত আগে যেন উথলিয়ে ওঠে। তাই তো কবি আনন্দে গেয়ে ওঠেন- পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে, পাগল আমার মন নেচে ওঠে।

গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপদাহের পর বর্ষা আসে শ্যামল সুন্দর রূপে। তাপ শুষ্ক পৃথিবীকে সুধারসে ভরিয়ে দেওয়ার জন্য। যেখানে বিরহী হৃদয় চাতক পাখির ধেয়ান নিয়ে চেয়ে আছে আকাশে। বিছিয়ে দিয়েছে তার ব্যথিত হৃদয়। তমাল কুঞ্জপথে সজল ছায়াতে। নয়নে করুণ রাগ-রাগিণী জাগিয়ে। বকুল ফুলের মালা গেঁথে নিয়ে আগন্তক বসে আছে। কখন মিলনের বাঁশি বাজবে তার জন্য।

বর্ষাকে নিষ্প্রয়োজনের ঋতুও বলা হয়। কারণ এই বর্ষায় মানুষের অনেকটা অবসর মিলে। একটা অকারণ আলস্য এসে ভর করে। আমাদের প্রাত্যহিত জীবনের নানা কাজের ব্যস্ততার মধ্যে যেন একটু ফুরসৎ। কবির ভাষায়- ‘সকল বয়সেরই একটা কাল আছে। যৌবনের যেমন বসন্ত, বার্ধ্যকের যেমন শরৎ, বাল্যকালের তেমনি বর্ষা। ছেলেবেলায় আমরা যেমন গৃহ ভালোবাসি এমন আর কোনো কালেই নয়। বর্ষাকাল ঘরে থাকবার কাল, কল্পনা করবার কাল, গল্প শোনবার কাল, ভাইবোনে মিলে খেলা করবার কাল।’

বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বর্ষার চরিত্রেও পরিবর্তন এসেছে। এখনকার বর্ষায় বৃষ্টি-বাদলের তেমন জোর নেই। আর নিয়ম মেনেও বর্ষা আসে না। আষাঢ় এল। কিন্তু বৃষ্টি আসবে এমন কথা হলপ করে বলা যায় না। ছেলেবেলায় দেখা তেমন ঘনিয়ে বর্ষাও এখন হয় না। বর্ষার তেমন সমারোহ নেই যেন, বর্ষা এখন কখনও সামান্য জল ছিটিয়ে চলে যায়।

কেবল খানিকটা কাদা, খানিকচা ছাঁট, খানিকটা অসুবিধে মাত্র। কিন্তু আগেককার মতো সে বজ্র বিদ্যুৎ বৃষ্টি বাতাসের মাতামাতি নেই। আগেকার বর্ষায় একটা নৃত্য ও গান ছিল, একটা ছন্দ ও তাল ছিল- এখন যেন প্রকৃতির বর্ষার মধ্যেও বয়স প্রবেশ করেছে, হিসাব কিতাব ও ভাবনা ঢুকেছে, শ্লেষ্মা শঙ্কা ও সাবধানের প্রাদুর্ভাব হয়েছে।

এরপরও যে বর্ষা আসে তাও মানুষজনকে আরেক বিড়ম্বনায় ফেলে। বর্ষা নিয়ে বাঙালির ভাল অভিজ্ঞতার চেয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতাই বেশি। বাঁধভাঙ্গা বর্ষা কখনও বিস্তর জনপদের মানুষকে করেছে ঘরছাড়া। গ্রামের কথা বাদ দিলেও এই ঢাকা নগরেও বর্ষার মোহন রূপের চেয়ে দুঃখদুর্দশা আর দুর্ভোগের চিত্রই চোখে পড়ে বেশি।

একটু বৃষ্টি হলেই মাঠ-ঘাট বৃষ্টির পানিতে সয়লাব। কোথাও বেরুনোর এতটুকু অবসর মিলে না। রাস্তায় জমে যাওয়া পানিতে পথ হাঁটা তো দূরের কথা গাড়ি ঘোড়াও অচল। কিন্তু তবু বর্ষায় অভ্যস্ত পরিচিত সংসার হতে বিক্ষিপ্ত হয়ে মন বাইরের দিকে যেতে চায়। ‘মন মোর মেঘের সঙ্গী। উড়ে চলে দিগদিগন্তের পানে। নিঃসীম শূন্যে শ্রাবণ বর্ষণ সঙ্গীতে। রিমঝিম রিমঝিম রিমঝিম।’

এ কারণে বর্ষাকে স্বাগত জানাতে হয়। হে নব ঘনশ্যাম হে শ্যামল সুন্দর। আমরা তোমাকে অভিবাদন করি। এসো এসো জগতের যত অকর্মণ্য, এসো এসো ভাবের ভাবুক, রসের রসিক আষাঢ়ের মৃদঙ্গ ঐ বেজে উঠল, এসো সমস্ত খেপার দল, তোমাদের নাচের ডাক পড়েছে। বিশ্বের চিরবিরহ বেদনার অশ্রু-উৎস আজ খুলে গেল, আজ তা আর বাঁধ মানলো না। এসো গো অভিসারিকা, কাজের সংসারে কপাট পড়েছে, হাটের পথে লোক নাই। চকিত বিদ্যুতের আলোকে আজ যাত্রায় বের হবে। জাতীয় পুষ্প সুগন্ধি বনান্ত হতে সজল বাতাসে আহ্বান আসলো কোন ছায়া বিতানে বসে আছে বহু যুগের চির জাগ্রত প্রতীক্ষা।

এইচআর/এমএস

‘বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বর্ষার চরিত্রেও পরিবর্তন এসেছে। এখনকার বর্ষায় বৃষ্টি-বাদলের তেমন জোর নেই। আর নিয়ম মেনেও বর্ষা আসে না। আষাঢ় এল। কিন্তু বৃষ্টি আসবে এমন কথা হলপ করে বলা যায় না। ছেলেবেলায় দেখা তেমন ঘনিয়ে বর্ষাও এখন হয় না। বর্ষার তেমন সমারোহ নেই যেন, বর্ষা এখন কখনও সামান্য জল ছিটিয়ে চলে যায়।’