চিকিৎসক-শিক্ষক : মহান পেশার মর্যাদা রক্ষা করুন

মীর আব্দুল আলীম
মীর আব্দুল আলীম মীর আব্দুল আলীম , সাংবাদিক
প্রকাশিত: ০৯:২৪ এএম, ২৭ জুন ২০১৯

 

শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য বিষয়টি ন্যস্ত শিক্ষক এবং ডাক্তারে হাতে। শিক্ষকরা মানুষ গড়েন আর চিকিৎসকরা মানুষ মেরামত করেন। দু’টিই মহান পেশা। এ পেশার লোকদের নিয়ে কারণে অকারণে বিতর্ক হয় প্রায় সময়ই। শিক্ষকরা ছাত্রদের শাসন করেছেনতো দেশে হৈ চৈ পড়ে যায়। পিতার আসনে থাকা শিক্ষকরা নাজেহাল আর শারীরিক লাঞ্ছনার শিকারও হন প্রায়শই। দেশের সব শিক্ষক পিতার মত মহান বলব না। অনেক দুর্নীতিগ্রস্ত শিক্ষক আছেন; শিক্ষক নামে অমানুষও আছেন অনেক। যারা মহান এ পেশাকে কলুষিত করছেন। তাদের কারণেই গোটা শিক্ষক সমাজ আজ অপবাদের বোঝা কাঁধে নিচ্ছেন। বলতেই হয় এখনও অধিকাংশ শিক্ষকই শিক্ষার্থীদের সন্তানের মতই আগলে রাখেন। মনপ্রাণ উজাড় করে সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দান করেন। মানুষ গড়ার কাজ করেন। এখনও এ পেশাটা মহান পেশা হিসেবেই আছে। থাকবেও অনন্তকাল।

এতো গেলো মানুষ গড়ার কারিগরদের কথা। আর যারা মানুষ মেরামত করেন। সেই ডাক্তার! চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অপচিকিৎসা আর মানুষ মেরে ফেলার অভিযোগ ওঠে মাঝে মধ্যেই। হাসপাতালে রুগী মারা গেলে সোজা খুনের দায় চাপে ডাক্তারের উপর। কথায় কথায় বলা হয় ভুল চিকিৎসার কথা। পত্রিকার পাতায় শিরোনাম হয় ‘ওমক হাসপাতালেরর ওমক ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু’। ভুল চিকিৎসার নিশ্চিত কিভাবে হন একজন সাংবাদিক কিংবা রোগীর লোকজন। এটাতো প্রমাণ সাপেক্ষ বিষয়।

অসুস্থ্ মানুষই ডাক্তারের কাছে কিংবা হাসপাতালো আসেন। জীবন মৃত্যুও সন্ধিক্ষণে থাকা মুমূর্ষু রোগীদের আনা হয় হাসপাতালে। সৃষ্টিকর্তাই জীবনের মালিক। মানুষ কেবল চেষ্টা করে মাত্র। প্রায় ক্ষেত্রেই অসুস্থ মানুষটি মারা গেলে বলা হয় ভুল চিকিসৎসার কথা। ব্রেইন স্ট্রোক, হৃদরোগে আক্রান্ত মানুষতো সব সময়ই মৃত্যুর ঝুঁকিতে থাকেন। হাজারো সমস্যার বাংলাদেশে ভুল চিকিৎসা, অপচিকিৎসা নেই তা কিন্তু না। কোন কোন ডাক্তারও অবহেলা করেন, রোগীদের সাথে পশুর মতো আচরণ করেন। এমন অনেক হচ্ছে। তবে সব ডাক্তার কি এমন বাজে কাজ গুলোর সাথে জড়িত? ভালো গুণের এবং মানবিকতা সম্পন্ন ডাক্তারের সংখ্যাই এখনও অনেক বেশি।

রাতদিন একজন ডাক্তারকে পরিশ্রম করতে হয়। রোগীর ডাক পড়লেই তার ঘুম হারাম। আর তাকে যদি কথায় কথায় অপচিকিৎসা কিংবা খুনের অপবাদ কাঁধে নিয়ে চলতে হয় তাহলে বিষয়টা কি দাঁড়ায়? ভালো কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেতো মানুষ। প্লিজ অপবাদ দিবেন না। অভিযোগ করতে হলে ভেবে করবেন। সঠিকটা করবেন। একথা কিন্তু সত্য আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়া পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ছাড়া আমাদের ডাক্তারগণ যে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন তা কম নয়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেন। কিন্তু এখনও সেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চিকিৎসা নিয়ে ভালো হয়ে ঘরে ফিরছেন। সিট সংকুলান না হলে সেখানে ডাক্তারের দোষ কোথায়। যারা বারান্দায় থাকেন তারাও কিন্তু চিকিৎসা পান। এখনও আস্থার জায়গা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

এ লেখায় দু’টি বিষয় রয়েছে শিক্ষক এবং চিকিৎসক। শিক্ষক প্রসঙ্গে পরে আসছি। চিকিৎসা বিষয়ে কিছু ধারণা দিতে চাই পাঠক আপনাদের। হুজুগে বাঙালি আমরা, বুঝেও লড়ি, না বুঝেও লড়ি। কথা বলতেতো সীমা পরিসীমা হারিয়ে ফেলতে ওস্তাদ সবাই। পাঠক বলেনতো, কতজন মানুষের জন্য কতজন ডাক্তার নিয়োজিত আছেন এদেশে। কত রোগীর চিকিৎসার সঙ্গতি আছে এদেশের হাসপাতাল গুলোর। ঢাল-তলোয়ার (ডাক্তার ঔষধ) না দিয়ে চিকিৎসা করতে বলবেন তা কি করে হয়?

এক পরিসংখ্যানে এভাবেই উল্লেখ আছে- ঢাকা মেডিকেলে কলেজ হাসপাতালের সার্জারি ডিপার্টমেন্ট এ প্রায় সকল প্রকার সার্জারি হয়। মোট ডাক্তারের সংখ্যা ১০০ জন। গত এক বছরে অপারেশন হয়েছে ৬৮০০০ এর মত। ছুটিছাটা বাদ দিয়ে ২৭০ দিন কর্মদিবস থাকলে প্রতিদিন অপারেশন হয়েছে প্রায় ২৫০টা। তার মানে, প্রতিটা সার্জন দিনে অপারেশন করেছেন ২.৫টার মত। অন্যদিকে সার্জারির আউটডোরে মোট রোগী দেখা হয়েছে প্রায় ৬ লক্ষ। প্রতিদিন প্রায় ২২০০ এর মত। একজন ডাক্তার দেখেছেন প্রতিদিন ২২ টা রোগী। লাখ লাখ গরীব মানুষকে সুচিকিৎসা দিয়ে তারা তাদের আয়ের মাত্র ১০ শতাংশ পান বেতন হিসেবে। আর এতো ঝুঁকি নিয়ে ইনফেকশনের মধ্যেও কাজ করেন, তবুও তারা ঝুঁকি ভাতা পান না। অথচ লোকজন কিছু ঘটলেই ডাক্তারদের গায়ে হাত তোলে, হাসপাতাল ভাংচুর করে। অথচ পরিসংখ্যান বলে যে, ৯৯% সুচিকিৎসা হলেও বছরে প্রায় ১০০০ জন রোগী ভুল চিকিৎসায় মারা যাওয়ার কথা। কিন্তু ২-৪ জন মারা গেলেই শুরু হয়ে যায় আমাদের হিংস্রপনা। অথচ আমরা একবারও ভাবি না যে, একজন ডাক্তার ৭ দিন অসুস্থ থাকলে তিনি প্রায় ১৪০ জন রোগীর চিকিৎসা ও ১৫ জন রোগীর অপারেশন করতে পারবেন না।

স্কুল কলেজে যিনি মেধাবী ছাত্র ছিলেন তাঁরাই একদিন ডাক্তার হয়ে আসেন। সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রটিই আজ সমাজে সম্মান পাচ্ছেন কম। বিবিএস করা একজন চিকিৎসক যে মর্যাদা পান কম মেধাবী সম্পন্ন বিসিএস অন্য প্রশাসনের লোক অনেক বেশি মর্জাদা পান। ঝুঁকি নিয়ে মানুষের জীবন নিয়ে কাজ করেও অসম্মানীত হন একজন ডাক্তার। এভাবে চলতে থাকলে ডাক্তারগণ আর ঝুঁকি নিতে চাইবেন না। চিকিৎসা সেবায় ঝুঁকি নিতে হয়। ঝঁকি না নিলে মুমূর্ষু রোগীর জন্য ক্ষতির কারণ হয়। কথায় কথায় গায়ে হাত তুললে, মামলা হামলা করলে, ভুল চিকিৎসার অপবাদ দিলে ডাক্তারগণ আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। এটা রোগী কিংবা রোগীর পরিবারের জন্য দুঃসংবাদ বটে!

ডাক্তারদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তা কি সত্যি? কতটা সত্যি? ডাক্তারদের বিরুদ্ধে চিকিৎসাসেবা না দেওয়ার যে ঢালাও অভিযোগ, তা ষোলোআনা সত্যি নয়। একেবারেই সত্যতা নেই তা বলছি না। বলছি অভিযোগের অনেকটাই অসত্য। তবে রোগীর পেটে ব্যান্ডেজ রেখে সেলাই করে দেওয়াসহ নানা রকমের ভুল চিকিৎসার সংবাদ মাঝেমধ্যেই জানা যায়। সংবাদগুলো মিথ্যা নয়। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ডাক্তারদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। দেশে অনেক ডাক্তার আছেন দেবতুল্যের মতো। ডাক্তার ধর্ম পালনের মতো করে মনপ্রাণ দিয়ে রোগীর সেবা করেন। এমন সব ডাক্তারকেও যখন আশঙ্কায় থাকতে হয়, রোগী মারা গেলে তার ওপর আক্রমণ হতে পারে, হতে পারে হাসপাতাল ভাঙচুর।

আমাদের দেশের চিকিৎসা সেবার মান কিন্তু অনেক বেড়েছে। কথায় কথায় আমরা ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ছুটে যাই। মস্তিষ্ক, হৃদরোগসহ জটিল অপারেশনে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, আমেরিকা, ইউরোপ সব জায়গায় রোগী মারা যায়। আমাদের ডাক্তারদের সাফল্যের হার অন্য যেকোনও দেশের ডাক্তারের চেয়ে কম নয়। তাহলে আমাদের ডাক্তারের ক্ষেত্রে কেন শারীরিক আক্রমণের আশঙ্কা তৈরি হবে? ভুল চিকিৎসার দায়ে অভিযুক্ত হতে হবে কেন?

বাংলাদেশে অনেক ডাক্তার ভালো চিকিৎসা দিচ্ছেন। তাতে তাদের সুনাম শোনা যায় না কখনো। অনেক ভালো, মানবিক ডাক্তার আছেন সারাদেশে। কিছু খারাপ ডাক্তার যারা অনৈতিক বাণিজ্য করছেন তাদের তুলনায় ভালো ও নৈতিকতা সম্পন্ন ডাক্তারের সংখ্যা অনেক অনেক গুণ বেশি। মন্দের জন্য ঘৃণা করেন, সাজার ব্যবস্থা করেন এটা সমর্থন করি। ভালো যারা করছেন তাদের গুণকীর্তনও কিন্তু করা দরকার।

পরিশেষে এটাই বলবো শিক্ষক এবং চিকিৎসকের এ মহান পেশাটা যেন কোনভাবে কলুষিত না হয়। দেশে শিক্ষার মান উন্নয়নে, চিকিৎসা সেবার মান উন্নয়নে এ পেশাকে আগলে রাখতে হবে কারণ শিক্ষা এবং চিকিৎসা দু’টিই আমাদের জন্য জরুরি বিষয়।

এইচআর/পিআর

বাংলাদেশে অনেক ডাক্তার ভালো চিকিৎসা দিচ্ছেন। তাতে তাদের সুনাম শোনা যায় না কখনো। অনেক ভালো, মানবিক ডাক্তার আছেন সারাদেশে। কিছু খারাপ ডাক্তার যারা অনৈতিক বাণিজ্য করছেন তাদের তুলনায় ভালো ও নৈতিকতা সম্পন্ন ডাক্তারের সংখ্যা অনেক অনেক গুণ বেশি। মন্দের জন্য ঘৃণা করেন, সাজার ব্যবস্থা করেন এটা সমর্থন করি। ভালো যারা করছেন তাদের গুণকীর্তনও কিন্তু করা দরকার

আপনার মতামত লিখুন :