এইসব কী হচ্ছে দেশে!

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:২৪ এএম, ২৪ জুলাই ২০১৯

রিহাব মাহমুদ

রেডি ওয়ান, টু, থ্রি...। এরপর ছুটছি। ছুটছি তো ছুটছি। এ যেন ঘোড় দৌড় কিংবা ম্যারাথন প্রতিযোগিতা। সব প্রতিযোগিতারই একটা লক্ষ্য উদ্দেশ্য থাকে। এই প্রতিযোগিতারও হয়তো আছে। আমরা তা জানি না। কিন্তু আমরা ছুটছি। কান নিয়ে গেছে চিলে..। আমরা চিলের পিছনে ছুটছি। কোনও কিছু ভেবে আবার কোনও কিছু না ভেবে। এই ছুটে চলার মধ্যেও বিরতি আছে। আমরা জায়গায় জায়গায় ব্রেক করছি। আবার ছুটছি। আমাদের চলা থেমে নেই।

বর্তমানে দেশে যা মহামারী আকার ধারণ করেছে তাই নিয়েই কথা বলছি। এই ছুটে চলা ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছিলো তা আমার জানা নেই। আমি শুরু করছি ৬ এপ্রিল ২০১৯ থেকে। এদিন ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিলো। ঘটনাক্রমে সেদিন তার মৃত্যু না হলেও তার কয়েকদিন পর ১০ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করে নুসরাত। এই ঘটনায় সারাদেশ ফুঁসে উঠেছিলো। জড়িতদের বিচার দাবিতে সোচ্চার ছিলো সোশ্যাল মিডিয়া।

সর্বসাধারণের স্বাধীন মত প্রকাশের একটাই জায়গা এখন- তা হলো ফেসবুক। ফেসবুকে ঝড় উঠেছিলো নুসরাতের হত্যাকারীদের দৃষ্ঠান্তমূলক শাস্তির দাবিতে। আমরা ফেসবুকের মাধ্যমে দারুণভাবে এই দাবি নিয়ে ছুটলাম। দোষীরা গ্রেফতারও হলো। বর্তমানে তাদের বিচার চলছে। আশ্চর্যজনক বিষয় হচ্ছে- আগের তুলনায় সারাদেশে এপ্রান্ত-সেপ্রান্ত থেকে খবর আসতে থাকলো ধর্ষণের। এবং এই ধর্ষণ কাণ্ডে জড়িত বেশিরভাগ স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষকরা। মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনও ধর্ষক হিসেবে ধরা পড়তে লাগলো। এই ইস্যু নিয়েও ফেসবুক তোলপাড় হলো। ধর্ষকদের মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে সোচ্চার সবাই। এই দাবি ফেসবুকে এখনো হয়তো আছে। কিন্তু তা ততোটা জোড়ালো নয়। কারণ, নুসরাতের ঘটনার পর নতুন ঘটনার জন্ম নিলো।

২৬ জুন বরগুনায় আরও মারাত্মক একটি ঘটনা আমাদের নতুনভাবে নাড়া দিলো। আমরা নুসরাত বিষয়ে ছুটে চলা থেকে ব্রেক করলাম। নতুন ইস্যু রিফাত হত্যাকাণ্ডের রমরমা ভিডিও নিয়ে নতুন উদ্যমে ছুটা শুরু করলাম। এই একটি হত্যাকাণ্ড নিয়ে নতুন নতুন ঘটনার জন্ম নিতে লাগলো। ফেসবুকে এ ওকে ধুয়ে ফেলা হচ্ছে। আমাদের গতিও বেড়ে গেছে। ছুটছি তো ছুটছি।

আসামিরা গ্রেফতার হতে থাকলো। প্রধান আসামি নয়ন বন্ড বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলো। এরপর আসলো নতুন ভিডিও। ঘটনা মোড় নিলো অন্যদিকে। এবার ঘটনার প্রধান সাক্ষীকে টার্গেট করা হলো। গুজব ছড়িয়ে গেছে রিফাতের স্ত্রী মিন্নিকে গ্রেফতার করা হবে। এবং রিফাতের মৃত্যুর জন্য স্ত্রী মিন্নিই দায়ী। বেশিদিন অপেক্ষা করতে হলো না। পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের নামে মিন্নিকে হেফাজতে নিয়ে গেলো। এবং সেদিন রাতেই গ্রেফতার দেখালো মিন্নিকে।

আমরা তখনো ছুটছি ফুল স্পিডে। কুপিয়ে হত্যার ঘটনা শুরু হতে না হতেই দেশের আনাচে কানাচে শুরু হয়ে গেলো কুপিয়ে হত্যার ঘটনা। এরমধ্যে আবারও ব্রেক করতে হলো। কারণ নতুন গুজব শুরু হয়ে গেছে। নির্মাণাধীন পদ্মা সেতুতে কাটা মাথা না দিলে পদ্মা সেতু হবে না। গুজবের ডাল-পালা ডানা মেলতে লাগলো। আমরা পেয়ে গেলাম নতুন আরও একটি ইস্যু। আমরা এই ইস্যু নিয়ে আবারও ছুটছি। গুজবের ডালপালা মেলতে মেলতে ছেলেধরা আতঙ্কে পৌঁছে গেছে। চারদিকে আতঙ্ক এই বুঝি ছেলেধরা আমাদের কারও না কারও সন্তানকে ধরে নিয়ে যাবে।

এই যখন পরিস্থিতি তখন নেত্রকোনায় শিশুর কাটা মাথাসহ এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করলো উত্তেজিত জনতা। আর যায় কোথায়। এই ঘটনার পর অনেকের বদ্ধমূল ধারণা হলো- সত্যি সত্যি পদ্মা সেতুর জন্য কাটা মাথা লাগবে। হুজুগে বাঙালি এবারও ছুটা শুরু করলো। এরপর ঘটতে থাকলো একের পর ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনি।

এরইমধ্যে গণপিটুনিতে অনেকে নিহত ও আহত হলো। তার নির্মম বলি রাজধানী বাড্ডার রেনু। স্কুলে সন্তানের ভর্তির বিষয়ে খবর নিতে গিয়ে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে নির্মমভাবে প্রাণ দিতে হলো। উৎসুক জনতা এই দৃশ্য ভিডিও করতে ব্যস্ত ছিলো। এখনো সেই ভিডিও ফেসবুকে ঘুরছে। শুধু তাই না, একের পর এক খবর আসতে থাকলো বিভিন্ন জায়গা থেকে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনি। একপর্যায়ে পুলিশ প্রশাসন ঘোষণা দিতে বাধ্য হলো- গণপিটুনিতে হত্যা ফৌজদারি অপরাধ। তারপরও যেন থেমে নেই।

আমাদের ছুটে চলাও থেমে নেই। একের পর এক ইস্যু তৈরি হচ্ছে আর আমরা তার চুলছেরা বিশ্লেষণ করে জড়িতদের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করে চলেছি। আবার ব্রেক করতে হলো। এবার নতুন ইস্যু। কী সেটা? আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কাছে বাংলাদেশের এক এনজিও কর্মকর্তা প্রিয়া সাহার দেশবিরোধী বক্তব্য। সেই ভিডিওতে আবারও তোলপাড় ফেসবুক। এবার আমরা প্রিয়া সাহার চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধারে মেতে উঠলাম।

মজার বিষয় হচ্ছে- উপরে উল্লেখিত সবগুলো ঘটনা পর্যায়ক্রমে চলমান। কিন্তু আমরা জায়গায় জায়গায় ব্রেক করে এক একটা ঘটনার পিণ্ডিসাধন করে যাচ্ছি। নুসরাত হত্যার দোষীদের বিচারও চলছে আইনের নিজস্ব নিয়মে। রিফাত হত্যার ঘটনার নতুন নতুন নাটকের জন্ম নিচ্ছে। ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিও চলছে। প্রিয়া সাহারও নতুন নতুন বক্তব্য ভাইরাল হচ্ছে।

এখন কথা হচ্ছে- এইসব কী হচ্ছে দেশে!

লেখক : সাংবাদিক

এইচআর/জেআইএম

আমাদের ছুটে চলাও থেমে নেই। একের পর এক ইস্যু তৈরি হচ্ছে আর আমরা তার চুলছেরা বিশ্লেষণ করে জড়িতদের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করে চলেছি। আবার ব্রেক করতে হলো। এবার নতুন ইস্যু। কী সেটা? আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কাছে বাংলাদেশের এক এনজিও কর্মকর্তা প্রিয়া সাহার দেশবিরোধী বক্তব্য। সেই ভিডিওতে আবারও তোলপাড় ফেসবুক। এবার আমরা প্রিয়া সাহার চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধারে মেতে উঠলাম।


আরও পড়ুন