ও প্রিয়া: কার সাপ্লাই?

মোস্তফা কামাল
মোস্তফা কামাল মোস্তফা কামাল , সাংবাদিক
প্রকাশিত: ১০:৩০ এএম, ২৪ জুলাই ২০১৯

শেষতক কিচ্ছু হবে না, প্রিয়া সাহা সব সামলে নেবেন-এমন ধারণা দিন কয়েকেই বাস্তব হয়ে গেল। বাতাস ঘুরে গেছে। গোটা পরিস্থিতি এখন তার অনুকুলে। সরকার পক্ষও তার সহায়। নানান হম্বিতম্বির পর কথা পাল্টে ফেলেছেন মন্ত্রীরা। প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়াও মন্ত্রণালয়ের তরফে আলাদা বিবৃতি দেয়া হয়েছিল। প্রিয়ার সব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন বলেছিলেন, এটা ডাহা মিথ্যা। বিশেষ মতলবে প্রিয়া এমন উদ্ভট কথা বলেছেন। সেগুনবাগিচার বিবৃতিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে- বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নের উদ্দেশ্যেই প্রিয়া এই ধরনের বানোয়াট ও কল্পিত অভিযোগ করেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর পুত্র ও উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের প্রতিক্রিয়া আরো কড়া। তার মতে, এটি বাংলাদেশে মার্কিন বাহিনী আনার ষড়যন্ত্রের অংশ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানিয়েছেন, দেশে ফিরলেই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, প্রিয়ার বক্তব্য রাষ্ট্রদ্রোহিতা। তাকে অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে। একদিনের মধ্যেই ইউটার্ন। ওবায়দুল কাদের প্রধানমন্ত্রীর বরাত দিয়ে বলেছেন, প্রিয়ার বিরুদ্ধে এখনই কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে না। আর আইনমন্ত্রী বলছেন, এটা একেবারে ছোট্ট ব্যাপার। মোটেই রাষ্ট্রদ্রোহের বিষয় নয়। প্রিয়ার বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের বিভিন্ন জায়গায় করা মামলাগুলোও খতম হয়ে যায় ম্যাজিকের মতো।

প্রিয়া সাহার পরবর্তী বক্তব্যের একটা অপেক্ষা ছিল। ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, প্রিয়ার ব্যাখ্যা না শুনে তার বিরুদ্ধে কোনো অ্যাকশনে না যেতে। ততক্ষণে ভিডিওতে নতুন বার্তা নিয়ে হাজির হন তিনি। নিজের আগের অবস্থান থেকে একটুও না সরে উল্টো বলেছেন, তিনি যা বলেছেন সেটা আসলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যেরই প্রতিধ্বনি। শেখ হাসিনা বিরোধীদলে থাকতে এ ধরনের অভিযোগ করতেন- এমন ইঙ্গিতও করেছেন প্রিয়া সাহা।

তাহলে অর্থ কী দাঁড়ালো? প্রিয়া সাহা না হয়ে তিনি যদি পিয়ারা বেগম হয়ে ট্রাম্পের কাছে যেতেন? যদি এই বলে নালিশ করতেন, বাংলাদেশে ঠিক মতো হিজাব পরতে দেয়া হয় না? হিজাব পরা মিতু, তনু, নুসরাতকে মেরে ফেলা হয়েছে? প্লিজ আমাদের সেইভ করুন মি: প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এই কিছিমের প্রশ্ন আরো আছে। প্রিয়া সাহা ‘মুসলিম ফান্ডামেন্টালিস্ট’ না বলে যদি ক্ষমতাসীন সরকার বলতেন? যদি বলতেন আওয়ামী লীগ শাসনে ৩৭ মিলিয়ন ডিসঅ্যাপেয়ার’ হয়ে গেছে? কী দশাটা হতো ? কার প্রতিক্রিয়াটাই বা তখন কেমন হতো?

আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকলে প্রিয় সাহাকে বিমানবন্দরে রাজসিক অভ্যর্থনা জানাতো। আর তিনি যদি কেবল বলতেন, দেশে গণতন্ত্রের অনুপস্থিতিতে নারকীয় ঘটনা বেড়ে গেছে বিএনপি তাকে বরণ করে নিত অন্তপ্রাণে। প্রয়োজনে ফরহাদ মজহারকে ছুঁড়ে ফেলে প্রিয়াকেই প্রিয় করে কাছে টেনে নিত। পারলে তাদের শত নাগরিক কমিটিকে ১০১ সদস্যে পরিণত করে ফেলতো।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে প্রিয়ার অভিযোগ বাংলাদেশে ৩ কোটি ৭০ লাখ হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান নিখোঁজ রয়েছে। এখন সেখানে ১ কোটি ৮০ লাখ সংখ্যালঘু রয়েছে। তারা বাড়িঘর খুইয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো বিচার হয়নি। ভিডিওতে দেখা গেছে, এক পর্যায়ে ট্রাম্প নিজেই সহানুভূতিশীলতা স্বরূপ প্রিয়ার সঙ্গে হাত মেলান। কারা এমন নিপীড়ন চালাচ্ছে? ট্রাম্পের এমন প্রশ্নের জবাবে প্রিয়া সাহা বলেন, ‘দেশটির মৌলবাদীরা এসব করছে। তারা সবসময় রাজনৈতিক আশ্রয় পাচ্ছে।’

এসব নালিশে তোলপাড় তৈরি করা প্রিয়া সাহা গোপনে সেখানে যাননি। হুট করে গিয়ে ওঠেননি হোয়াইটহাউসে। সেটি ছিল একটি ‘কমপ্লেইন’ প্রোগ্রাম। মার্কিন প্রেসিডেন্ট তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর প্রতিনিধিদের কাছ থেকে "মানবাধিকার বিষয়ে" এ ধরনের নালিশ শুনে থাকেন। তবে অভিযোগকারীকে আগে থেকেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হয়। তার জন্য বড় মাপের সুপারিশ লাগে। তা হলে সেই সুপারিশটি করেছিল- কে বা কারা?

এই প্রশ্নের উত্তর গোপন নয়। এরপরও কেউ কেউ বলতে চান, তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে এভাবে দেখা করে দেশটিতে রাজনৈতিক আশ্রয়ের বন্দোবস্ত করতে চেয়েছেন। বাস্তবে প্রিয়া এতো দুর্বল নন। তিনি যে কোনো সময়ই যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সক্ষমতা রাখেন। সেখানে যেতে হলে দেশটির প্রেসিডেন্টের শরণাপন্ন হতে হয় না। প্রিয়ার স্বামী দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারী পরিচালক মলয় সাহা। দুই মেয়ে ট্রাম্পের দেশেই থাকেন। আর প্রিয়া সাহা যে শান-মানে, দাপটে বাংলাদেশে আছেন যুক্তরাষ্ট্রে কি ততো পাবেন?

মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট আয়োজিত ধর্মীয় স্বাধীনতা সম্মেলনে প্রতিনিধিরা গেছেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে। এই প্রতিনিধি দলে ছিলেন বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধিরা। মুসলমানদের প্রতিনিধি হিসেবে গেছেন সরকারি ঘরানার খাস লোক মওলানা ফরিদউদ্দীন মাসউদের ছেলে মাওলানা জুনাইদউদ্দীন মাকতুম এবং নজিবুল বশর মাইজভান্ডারীর ছেলে তৈয়বুল বশর মাইজভান্ডারী। অন্য ধর্মের প্রতিনিধিদের মধ্যে আছেন এডভোকেট নির্মল চ্যাটার্জী, শ্রীমতি প্রিয়া সাহা, নির্মল রোজারিও এবং অশোক বড়ুয়া।

গোটা বিশ্ব তার অদ্ভুত আচরণ ও ভঙ্গির সঙ্গে পরিচিত। সেদিনও স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গির সাক্ষী থাকল গোটা বিশ্ব। নালিশ সেশনে তিনি প্রশ্ন করে বসেন, ‘আচ্ছা, বাংলাদেশটা যেন কোথায়?’ এমন প্রশ্নে পরিস্থিতি সামাল দেন তার এক উপদেষ্টা। তিনি ট্রাম্পকে বলেন, ‘মিয়ানমারের ঠিক পাশের দেশটাই হল বাংলাদেশ’।

রোহিঙ্গাদের এক প্রতিনিধি এবং নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী নাদিয়া মুরাদও সেদিন মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। রোহিঙ্গাদের হয়ে প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তি ট্রাম্পকে বলেন, তিনি বাংলাদেশের শরণার্থী ক্যাম্পের একজন রোহিঙ্গা। শরণার্থীরা যত দ্রুত সম্ভব বাড়িতে ফিরতে চায়। এ ব্যাপারে ট্রাম্পের সাহায্য চান তিনি। স্বভাব মতো ট্রাম্প বলে ওঠেন, বাংলাদেশটা যেন কোথায়?

তিনি মিয়ানমার চেনেন, অথচ বাংলাদেশ কোথায় জানেন না? তামাশা, তাচ্ছিল্য, মশকরার কোন পজিশনে আমরা? আবার রোহিঙ্গা ইস্যুও জানেন না ট্রাম্প। যেন সেদিনই প্রথম শুনেছেন। তিনি জানতে চেয়েছেন ‘হোয়ার ইজ দ্যাট অ্যাকচুয়ালি? বাংলাদেশ রিফিউজি ক্যাম্প!’ একজন নিজেকে ‘বাংলাদেশ রোহিঙ্গা রিফিউজি ক্যাম্প’ থেকে আসা রোহিঙ্গা হিসেবে পরিচয় দিয়ে নিজের বক্তব্য উপস্থাপনের পর প্রশ্নটি করেন ট্রাম্প। কোথায় আছি আমরা? বাংলাদেশ, রোহিঙ্গা রিফিউজি ক্যাম্প- এই জিনিসগুলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট এর জানার বাইরে? তা হলে রোহিঙ্গ নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এতোদিন কি চিত্র তুলে ধরেছি আমরা?

বরগুনার মিন্নি অ্যাপিসোডের মধ্যে পিরোজপুরের প্রিয়া প্রশ্নের সঙ্গে উড়াকথাও চলছে সমানে। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ নেতারা তাদের সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিয়া সাহার পক্ষ নিয়েছেন। অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত বলেছেন, একজন ভিক্টিম হিসেবে প্রিয়া অভিযোগ করতেই পারেন। আরেক অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরীর মতিগতিও এমনই। ১৮ জুলাইর অনুষ্ঠানটিতে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার ২৭ ব্যক্তির তালিকা দেওয়া হয় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে। বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে প্রিয়া সাহাকে সেই তালিকায় গোপনে বা সরকারের অগোচরে দেয়া হয়েছে এমনটি মনে করার কোনো কারণ নেই।

প্রিয়া সাহা ঠুনকা কেউ নন। এতো জনম সমাজতন্ত্রের গীত গেয়ে এখন মার্কিনি ভিক্ষায় সফল তিনি। সরকারের গুডবুকে তার নাম। মন্ত্রী, এমপিসহ সরকারি দলের সাথে তার নিয়মিত ওঠাবসা। মহিলা ঐক্য পরিষদ’র কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ইউনিয়ন করতেন। থাকতেন রোকেয়া হলে। এনজিও সেকটরের পরিচিত মুখ তিনি। বেশ মিশুক। দ্রুত সময়ের মধ্যে ক’দিন আগে একটি পত্রিকার ডিক্লারেশনও পেয়েছেন। পিরোজপুরে নির্যাতন ও বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার বিপরীতে প্রচুর বিদেশি ফান্ড পেয়েছেন। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের নানা বর্ণনা, জরিপবাজি করে আসছেন জ্ঞানী-গুণীজনরাও। এ নিয়ে তাদেরও নানা ফিকিরের কথা শোনা যায়। প্রিয়া সাহা করলেন আরেকটু ভিন্ন ভলিউমে।

প্রশ্ন হচ্ছে-প্রিয়া কি এখন মিস ফায়ার করলেন? নিজের পোস্টেই গোল দিলেন?-এসব প্রশ্নের কূলকিনারাহীন কচলানি চলছে। প্রিয়া সাহা সরল মনে বা আচমকাই নালিশ করলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে? নাকি অনেক দিন ধরে তিনি এমনটা ধারণ করছিলেন, সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন? এক সময় হয়তো আরেক ঘটনায় এসব প্রশ্ন ঢাকা পড়ে যাবে অন্যান্য ইস্যুর মতো। মানুষকে ব্যতিব্যস্ত করে দেয়া যাবে অন্য ইস্যুতে। তবে, এভাবে প্রিয়া সাপ্লাই ও হজম করার পরিণতি কি ভালো হবে দেশের জন্য?

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন।

এইচআর/জেআইএম

প্রশ্ন হচ্ছে-প্রিয়া কি এখন মিস ফায়ার করলেন? নিজের পোস্টেই গোল দিলেন?-এসব প্রশ্নের কূলকিনারাহীন কচলানি চলছে। প্রিয়া সাহা সরল মনে বা আচমকাই নালিশ করলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে? নাকি অনেক দিন ধরে তিনি এমনটা ধারণ করছিলেন, সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন? এক সময় হয়তো আরেক ঘটনায় এসব প্রশ্ন ঢাকা পড়ে যাবে অন্যান্য ইস্যুর মতো। মানুষকে ব্যতিব্যস্ত করে দেয়া যাবে অন্য ইস্যুতে। তবে, এভাবে প্রিয়া সাপ্লাই ও হজম করার পরিণতি কি ভালো হবে দেশের জন্য?

আপনার মতামত লিখুন :


আরও পড়ুন