চারদিকে মৃত্যুর নিপুণ আয়োজন

প্রভাষ আমিন
প্রভাষ আমিন প্রভাষ আমিন , হেড অব নিউজ, এটিএননিউজ
প্রকাশিত: ০৯:২৫ এএম, ১৯ আগস্ট ২০১৯

ঈদ মানেই আনন্দ। কিন্তু আমাদের দেশে ঈদ আসে বেদনা নিয়ে, আতঙ্ক নিয়ে। ঈদের দিন এই কলামে লিখেছিলাম ‘বিষাদ আর আতঙ্কের চাদরে ঢাকা ঈদ’। সে আতঙ্ক ছিল মূলত ডেঙ্গু নিয়ে। কিন্তু এই ঈদের সময় আরো নানামাত্রিক বিষাদ আর বিষণ্ণতা আমাদের গ্রাস করে নিয়েছে।

জাতীয় শোক দিবসসহ এবারের ঈদের ছুটিটা একটু প্রলম্বিত ছিল। মাঝের একদিন মিলিয়ে অধিকাংশই নয় দিনের লম্বা ছুটি কাটিয়েছেন। কিন্তু লম্বা ছুটি যে লাশের সারি এবং মন খারাপের তালিকাও লম্বাই করেছে শুধু। তালিকাটা সত্যি বেশ লম্বাই। আমাদের অবস্থাটা হয়েছে ফুটন্ত কড়াই থেকে বাঁচতে জ্বলন্ত উনুনে ঝাঁপ দেয়ার মত।

আমাদের হাতে যখন অনেকগুলো খবর থাকে, তখন আমরা বলি, কোনটা আগে বলবো, ভালোটা না খারাপটা? সবাই আগে ভালো খবরটাই শুনতে চান। কিন্তু আমাদের হাতে আসলে কোনো ভালো খবর নেই। যেটা করতে পারি, কম খারাপ খবরগুলো আগে জানাতে পারি। ঈদের দিন থেকেই দেশের চামড়া বাজারে হাহাকার। চামড়া শিল্প দেশের অন্যতম বড় রপ্তানি খাত। আর এই চামড়া শিল্পে কাঁচামালের সবচেয়ে বড় জোগানটা আসে ঈদুল আজহায়। কিন্তু এবার এই খাতে বড় ধাক্কা লেগেছে। অন্তত ২০ ভাগ চামড়া নষ্ট হয়েছে।

মৌসুমী ব্যবসায়ীরা রাগে-দুঃখে এই চামড়া রাস্তার পাশে ফেলে দিয়েছে, সিটি করপোরেশনের ময়লার ট্রাকে দিয়ে দিয়েছে; যারা একটু পরিবেশ সচেতন, তারা চামড়া পুঁতে ফেলেছেন। তবুও পানির দরে আড়তদারদের হাতে চামড়া তুলে দেননি। চামড়ার দাম আসলে এবার ইতিহাসের সবচেয়ে কম ছিল। কোরবানির ঈদের চামড়ার টাকা পায় গরীব এতিমরা। তারা ইতিমধ্যে বঞ্চিত হয়েছে।
বলা হচ্ছে, অন্তত ৫০০ কোটি টাকা কম পাবে মাদ্রাসা-এতিমখানাগুলো। আড়তদাররা বলেন, তাদের কাছে টাকা নেই। ট্যানারি মালিকরা তাদের চামড়া কেনার টাকা দেয়নি। তাই তারা চামড়া কিনতে পারেননি। আর ট্যানারি মালিকরা বলছেন, ব্যাংক তাদের টাকা দেয়নি। তাই তাদের কাছেও টাকা নেই। আরে ভাই ট্যানারি মালিক এবং আড়তদার আপনাদের কাছে যদি টাকা না থাকে, তবে ব্যবসা করতে আসছেন কেন? গরীবের হক মেরে নিজেদের পকেট ভরার জন্য?

ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে, মৌসুমী ব্যবসায়ী আর এতিমদের। চামড়ার দরপতন নিয়ে এখন সবাই উদ্বিগ্ন। এখন সবাই সক্রিয়। সরকারও মাঠে নেমেছে। এখন দাম বাড়বে। কম দামে চামড়া কেনা আড়তদাররা লালে লাল হয়ে যাবেন। লাভ করবেন ট্যানারি মালিকরাও। মাঝখান থেকে বঞ্চিত হলো এতিমরা। তবে দেখেশুনে মনে হচ্ছে, শুধু এবারের চামড়ার বাজার নয়, বাংলাদেশের চামড়া শিল্পই একটা ভয়াবহ সঙ্কটকাল পার করছে।

রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তরের পর থেকেই চামড়া শিল্প ধুঁকছে। এই শিল্পকে বাঁচাতে সরকারের নীতি সহায়তা প্রয়োজন, প্রয়োজনে তাদের ঋণও দিতে হবে। তবে ক্রিসেন্ট গ্রুপের মত কোনো একটা গ্রুপকে যেন সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়ে পুরো চামড়া শিল্প এবং ব্যাংক ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলা না হয়।

ঈদের ছুটিতে দুটি আগুন আমাদের আতঙ্কিত করেছে। পুরান ঢাকায় প্লাস্টিক কারখানায় আগুনের খবর শুনে ভয়ের একটা শীতল স্রোত আমাকে গ্রাস করে নিয়েছিল। আগে দেখেছি, পুরান ঢাকায এ ধরনের আগুন কত ভয়াবহ হতে পারে। এবার ভাগ্য ভালো আগুন তেমন ক্ষতি বয়ে আনতে পারেনি। তবে মিরপুর ঝিলপাড় বস্তির অগ্নিকাণ্ডে কারো প্রাণ না গেলেও পুড়ে গেছে হাজারো মানুষের স্বপ্ন, বস্তি থেকে রাস্তায় নেমে গেছেন তারা।

ডেঙ্গু আতঙ্কের কথা আগেই লিখেছি। ঈদের আনন্দ সেই আতঙ্ককে দূর করতে পারেনি। ঈদের সময়টা একটু চাপা পড়ে থাকলেও, ডেঙ্গু আবার ভয়াবহতা নিয়ে বিস্তৃত হচ্ছে। এ বছর আক্রান্তের সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। মৃতের সংখ্যা প্রায় দেড়শ। বলা হচ্ছে, এবারের ডেঙ্গু মৌসুম আরো এক মাস থাকবে। এর মধ্যে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে বোঝা যাবে, আগামী এক মাস কেমন কাটবে। তবে অবস্থা যা বুঝছি, বৃষ্টি কবে শেষ হবে, সেই অপেক্ষায় থাকা ছাড়া আপাতত ডেঙ্গু মোকাবেলায় আমাদের কিছু করণীয় নাই। আতঙ্কেই কাটবে আমাদের দিন।

তবে ঈদ এলে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিটা তৈরি হয় রাজপথে। ঈদের আনন্দযাত্রা অনেকের জন্য হয়ে যায় শেষ যাত্রা। মহাসড়ক নয় যেন মৃত্যুর মহা আয়েোজন।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসেবে এবার ঈদযাত্রার ১২ দিনে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ২২৪ জন, আহত হয়েছেন ৮৬৬। রেল ও নৌপথে দুর্ঘটনায় মারা গেছেন আরো ২৯ জন। তার মানে ২৫৮টি পরিবারে এবার ঈদ হয়নি। মৃত্যু যেখানে, ঈদ সেখানে আসবে কিভাবে? যানবাহনের বেপরোয়া গতি, অদক্ষ চালক-হেলপার, অবৈধ যানবাহন মহাসড়কে চলাচল, সড়কে প্রয়োজনীয় মনিটরিংয়ের অভাবসহ নানা কারণে এসব দুর্ঘটনা ঘটেছে। এই কারণগুলো নতুন নয়। প্রতিবছর ঈদ এলেই এগুলো নিয়ে আলোচনা হয়, কিন্তু সমাধান হয় না।

ঈদে প্রতিটি টিভি চ্যানেলে নানান অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়, বিশেষ করে নাটক। কিন্তু রাজপথে প্রতিবছর যে ট্র্যাজেডি মঞ্চস্থ হয়, তার তুল্য কিছু নেই। প্রতিটি দুর্ঘটনা, প্রতিটি মৃত্যু একেকটি বিয়োগান্তক গল্প। কদিন আগে ফেসবুকে একজন তার স্ট্যাটাসে লিখেছিলেন, ‘আপনি ডেঙ্গু জ্বরে না মরলে, বন্যায় মরবেন। বন্যায় বেঁচে গেলেও সড়ক দুর্ঘটনায় মরবেন। দুর্ঘটনায় না মরলেও ভেজাল খাদ্য খেয়ে মরবেন। সবকিছুতে বেঁচে গেলেও একদিন আপনাকে বিনা কারণে গণপিটুনি খেয়ে মরতে হবে। আগুনে পুড়ে মরতে পারেন, প্রকাশ্যে দিবালোকে কোপ খেয়েও মরতে পারেন। মায়ের গর্ভে থেকেও গুলি খেয়ে মরতে পারেন। তা না হলে নৃশংস ধর্ষণের শিকার হয়ে মরতে পারেন। তারপরেও না মরলে ক্রসফায়ারে গুলি খেয়ে মরবেন। মোটকথা, এদেশে মৃত্যুর সব পন্থা খোলা আছে। অভিনন্দন; আপনি এখনো বেঁচে আছেন!’

আসলে চারপাশে মৃত্যুর এমন নিপুণ আয়োজন। বেঁচে থাকাটাই এখন সবচেয়ে বড় উৎসব।

provas

এইচআর/পিআর

জাতীয় শোক দিবসসহ এবারের ঈদের ছুটিটা একটু প্রলম্বিত ছিল। মাঝের একদিন মিলিয়ে অধিকাংশই নয় দিনের লম্বা ছুটি কাটিয়েছেন। কিন্তু লম্বা ছুটি যে লাশের সারি এবং মন খারাপের তালিকাও লম্বাই করেছে শুধু। তালিকাটা সত্যি বেশ লম্বাই। আমাদের অবস্থাটা হয়েছে ফুটন্ত কড়াই থেকে বাঁচতে জ্বলন্ত উনুনে ঝাঁপ দেয়ার মত