শোকাবহ আগস্ট ও বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ

এবিএম আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার
এবিএম আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার এবিএম আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার , ব্যারিস্টার, বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট
প্রকাশিত: ০১:৫৪ পিএম, ১৯ আগস্ট ২০১৯

'শহিদ মিনার থেকে খসে পড়া একটি রক্তাক্ত ইট গতকাল আমাকে বলেছে,/ আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।/ আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।'

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভালোবাসার কথা বলতে গিয়ে কারাভোগ করেছিলেন কবি নির্মলেন্দু গুণ! ৭৫ এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের কোন প্রতিবাদ হয়নি বা প্রতিবাদের কোন মানুষ ছিলেন না, এমন কথা সর্বৈব মিথ্যা। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করেছেন অনেক মানুষ যাদেরকে জেল-জুলুম সহ্য করতে হয়েছে, করতে হয়েছে মৃত্যুকে আলিঙ্গন। হত্যাকাণ্ডের সেই তিমির অন্ধকারেই প্রতিরোধের চেষ্টা করেছিলেন কর্নেল জামিল কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।

বঙ্গবন্ধু হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়তেই প্রথম প্রতিবাদ মিছিল বের হয় বরগুনার মহকুমায়। মুক্তিযোদ্ধা মোতালেব মৃধা রেডিওতে বঙ্গবন্ধুর নিহত হওয়ার খবর শুনে তৎকালীন বরগুনা মহকুমা প্রশাসক সিরাজ উদ্দিন আহমেদের কাছে যান। সকাল সাড়ে ৮টায় মহকুমা প্রশাসক তার তৎকালীন ছাত্রলীগ সভাপতি জাহাঙ্গীর কবিরের নেতৃত্বে ১০ থেকে ১৫ জন ছাত্রলীগ কর্মী একটি ঝটিকা মিছিল বের করে এবং সিরাজ উদ্দীন আহমেদের সহযোগিতায় পুলিশের সমর্থনে বরগুনার আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা রাস্তায় বেরিয়ে আসেন এবং বিক্ষোভ মিছিল করেন। সিরাজ উদ্দিন তার বাসভবনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত করেন। এছাড়াও বরগুনার সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। ওইদিন সকালেই প্রতিবাদ হয় কিশোরগঞ্জ, ভৈরব, খুলনা, যশোর, চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ, নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ, ময়মনসিংহের গফরগাঁওসহ বিভিন্ন স্থানে।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড পরবর্তী সময়ে প্রতিবাদের নাম বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম। ১৭ হাজার মুজিব ভক্তকে সঙ্গে নিয়ে রংপুর চিলমারী পর্যন্ত সাতটি ফ্রন্টে বিভক্ত হয়ে কাদের সিদ্দিকী দীর্ঘ ২২ মাস যাবৎ প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে যান। এই প্রতিরোধ যুদ্ধে নিহত হন ১০৪ জন মুজিব প্রেমী যোদ্ধা এবং আহত হন কয়েকশ যোদ্ধা। প্রতিশোধ ও প্রতিরোধের ডাক দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শতাধিক তরুণ ‘শেরপুরের ৫০০ প্রতিবাদী’র বিদ্রোহ ও লড়াই সবচেয়ে আলোচিত।

প্রান্তিক সাধারণ মানুষগুলো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে নেমে সামরিক সরকারের রোষানলে পড়ে এবং নানাভাবে অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩৭৬ জন যুবক, যাঁরা বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধ নিতে জাতীয় মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। আর শেরপুর সদর, শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নকলা উপজেলা মিলে এ সংখ্যাটা দাঁড়াবে পাঁচ শতাধিক।

১৫ই আগস্ট ছাত্রনেতারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রতিবাদের চেষ্টা করলেও সেনা সদস্যদের কড়া টহলের কারণে ব্যর্থ হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেয়া হয় দেড় মাসের জন্য। খোলার পর এমন পরিস্থিতিতেও ’৭৫ এর ১৮ই অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন, মধুর ক্যান্টিনসহ পুরো বিশ্ববিদ্যালয় পোস্টার ও দেয়াল লিখনে ভরিয়ে দিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ জানায় ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা এবং ২০শে অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনের সামনে একটি প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। এরপর ১৯৭৬ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার শোকাবহ দিনে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাসায় শ্রদ্ধা নিবেদনের উদ্যোগ নেন ছাত্রনেতারা।

বঙ্গবন্ধুর খুনি খন্দকার মোশতাক সামরিক শাসন জারি করলেও সংসদ বহাল রাখেন। ১৬ অক্টোবর এমপিদের বৈঠক ডাকা হয়। এমপিদের দুই-একজন ছাড়া সবাই ছিলেন আওয়ামী লীগের নির্বাচিত। ১০ জনের মতো এমপি মোশতাকের বৈঠক বর্জন করেন, আর যোগ দেন ২৭০ জন এমপি। তেজগাঁও এমপি হোস্টেলে আয়োজিত সে বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর খুনিচক্র ফারুক, রশীদ, হুদা, ডালিম, শাহরিয়ার, নূর প্রমুখ উপস্থিত হয়।

বৈঠকের শুরুতেই কয়েকজন এমপি সভাস্থলে খুনিদের উপস্থিতির প্রতিবাদের একপর্যায়ে খুনিচক্রের সদস্যরা চলে যেতে বাধ্য হয়। এমপিদের কয়েকজন তাঁদের বক্তব্যে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যার নিন্দা জানান। প্রয়াত অ্যাডভোকেট সিরাজুল হক সাহেব মোশতাকের ক্ষমতা দখলকে অবৈধ বলে অভিহিত করে তীব্র প্রতিবাদ জানান।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সময়কালে জাতীয় ফুটবল দল ছিল মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরের মারদেকা টুর্নামেন্টে। সেখানে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পুত্র বিশিষ্ট ক্রীড়ানুরাগী, আবাহনীর প্রতিষ্ঠাতা শেখ কামালের হত্যাকাণ্ডের সংবাদে সালাহউদ্দিন ও চুন্নুদের উদ্যোগে বাংলাদেশের খেলার দিন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। খেলার শুরুতে খেলোয়াড়রা এক মিনিট নীরবতা পালন করেন।

একইভাবে শুধু রাজনৈতিক নেতারাই নয়, বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসে দীর্ঘ ১০ বছর কারাভোগ করেন শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার কান্দা গ্রামের আজগর আলী। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের এক বড় অংশ ছিলেন আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষেরা। ফলস্রুতিতে বীরযোদ্ধাদের ভিটামাটি ও সহায়-সম্পদ পরবর্তীতে জবরদখল করা হয়।

বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করায় ১৯৭৬ সালের ১৮ আগস্ট সেনা অভিযান চালিয়ে মুক্তাগাছার প্রতিবাদী ৫ মুক্তিযোদ্ধা জাবেদ আলী, নিখিল দত্ত, সুবোধ ধর, দিপাল দাস, মফিজ উদ্দিনকে হত্যা করা হয়। সৌভাগ্যক্রমে গুরুতর আহত হয়ে প্রাণে বেঁচে যান বিশ্বজিৎ নন্দী নামের এক কিশোর যোদ্ধা। কিন্তু তাঁকে আটক করে ১৯৭৭ সালের ১৮ মে সামরিক আদালতে ফাঁসির দণ্ড দেওয়া হয়।

ফাঁসির দণ্ড মাথায় নিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে ৭ বছর কাটাতে হয় বিশ্বজিৎকে। তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীসহ প্রভাবশালী বিশ্বনেতারা বিশ্বজিৎকে সমর্থন করেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন সেনা সরকার বিশ্বজিতের ফাঁসি মওকুফ করে তাঁকে যাবজ্জীবন দেয়। পরে ১৯৮৯ সালে তিনি মুক্তি লাভ করেন। তিনি আজও জীবিত কিন্তু এই দুঃসাহসিক বীরত্বগাথার মূল্যায়ন হয়নি!

অন্যদিকে ১৯৭৬ সালের ২৩ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুর বাসভবনস্থ অফিসের কর্মকর্তা মুহিতুল ইসলাম লালবাগ থানায় বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা রুজু করতেও গিয়েছিলেন। কিন্তু মামলাতো নেয়নি বরং ডিউটি অফিসারের হাতে চড় খেয়ে বিদায় নিতে হয় তাকে। এভাবেই অপমান, নির্যাতন, হত্যা ও জেল-জুলুমের মধ্যে চলতে থাকে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ।

আওয়ামী লীগ নেতা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত জাতীয় চার নেতা তাজউদ্দীন আহমেদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামরুজ্জামানকে নিয়েও ভয় ছিল সামরিক সরকারের। এই কারণেই তাঁদের কারাবন্দী করা হয় এবং পরবর্তীতে ৩রা নভেম্বর অন্ধকার কারা প্রকোষ্ঠে হত্যা করা হয়।এছাড়াও বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করায় আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও প্রবীণনেতৃবৃন্দসহ হাজার হাজার নেতাকর্মীদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাভোগ করতে হয়।

তবে সম্মিলিত ও সংগঠিত ভাবে আওয়ামী লীগ ঘটনা পরবর্তী প্রতিবাদের বিস্ফোরণ ঘটাতে পারলে হয়তো ইতিহাস আজ অন্যভাবে লেখা হতো। বরং সুবিধাভোগী নেতারা নিজেদের জীবন ও সম্পত্তি রক্ষা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে এবং গা ঢাকা দেয়। অপরদিকে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে অবৈধ ক্যুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কোনো চেষ্টাই লক্ষ করা যায়নি, উল্টো বিভিন্ন বাহিনীর প্রধানরা খুনি মোশতাকের অবৈধ সরকারের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেছিল।

এই মর্মস্পর্শী ঘটনার প্রতিবাদে শুরুতেই কেন কোনো গণপ্রতিরোধ গড়ে উঠল না! এই প্রশ্নের জবাবে অনেকে বলেন, ঘটনার আকস্মিকতা এবং বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুতে হতবিহ্বল হয়ে পড়া। কিন্তু এই বিষয়ে সমালোচনা করার আগে মোশতাক, জিয়ার শাসনামলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামরিক পরিস্থিতির কথাও আমাদের বিবেচনা করতে হবে। সেই দিনগুলোতে বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের নাম উচ্চারণ করা নিষিদ্ধ ছিল। বাংলাদেশ পরিণত হয়েছিল বাক স্বাধীনতাহীন এক বৃহৎ কারাগারে।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ঢাকায় কার্ফু জারি করা হয়েছে অসংখ্যবার, রাজপথ দাপিয়ে বেড়িয়েছে সেনাবাহিনী। পিতা মুজিবকে ভালোবেসে সামরিক সরকারের নির্মম নির্যাতন ও জেল-জুলুমের স্বীকার হন অগণিত যোদ্ধা। তৎকালীন ত্রাসের রাজত্বে এসব প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ সম্ভব হয়েছিল জাতির পিতার প্রতি সাধারণ মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কারণেই। বাঙালি অকৃতজ্ঞ নয়, বাঙালি বেঈমান নয়। কবির ভাষায়-
'সেই গোলাপের কথা রাখলাম,
আমি আজ সেই পলাশের কথা রাখলাম,
আমি আজ সে স্বপ্নের কথা রাখলাম।'

লেখক : ব্যারিস্টার। ডেপুটি এটর্নি জেনারেল ও আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

এইচআর/এমকেএইচ

বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করায় ১৯৭৬ সালের ১৮ আগস্ট সেনা অভিযান চালিয়ে মুক্তাগাছার প্রতিবাদী ৫ মুক্তিযোদ্ধা জাবেদ আলী, নিখিল দত্ত, সুবোধ ধর, দিপাল দাস, মফিজ উদ্দিনকে হত্যা করা হয়। সৌভাগ্যক্রমে গুরুতর আহত হয়ে প্রাণে বেঁচে যান বিশ্বজিৎ নন্দী নামের এক কিশোর যোদ্ধা। কিন্তু তাঁকে আটক করে ১৯৭৭ সালের ১৮ মে সামরিক আদালতে ফাঁসির দণ্ড দেওয়া হয়।