‘অদৃশ্য প্রযুক্তি’ : তথ্য প্রযুক্তির অমিত সম্ভাবনার কথা

মৌলি আজাদ
মৌলি আজাদ মৌলি আজাদ
প্রকাশিত: ০৯:৩০ এএম, ২১ আগস্ট ২০১৯

অধ্যাপক ও বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সম্মানিত সদস্য ড. সাজ্জাদ হোসেন দীর্ঘদিন যাবৎ কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক হিসেবে দেশের তথ্য প্রযুক্তি শিক্ষায় অবদান রাখছেন। তথ্য প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে এবং বাংলাদেশের তরুণদের তথ্য প্রযুক্তি খাতে আগ্রহী ও সম্পৃক্ত করার জন্যই তাঁর তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ে সহজবোধ্য ও প্রাঞ্জল ভাষায় লিখিত বই “অদৃশ্য প্রযুক্তি”।

৯৫ পৃষ্ঠার এ বইটিতে বর্তমান সময়ে তথ্য প্রযুক্তির ব্যাপক আলোচিত বিষয়গুলো সহজ ভাষায় লেখা হয়েছে। সূচিপত্রের দিকে এক নজরে তাকালে দেখি বইটিতে রয়েছে : অদৃশ্য প্রযুক্তি, প্রকৃতি: দৈনন্দিন জীবন এবং ইন্টারনেট অব থিংস, ইন্টারনেট অব থিংস এবং স্মার্ট ক্লাসরুম, কৃষিখাতে ইন্টারনেট অব থিংস, ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি এবং অর্গামেন্টেড রিয়্যালিটি, প্রযুক্তির নতুন দুনিয়া, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং: স্বপ্নচারী মানুষের নবদিগন্ত, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং: সম্ভাবনা ও বাস্তবতা, মোবাইল টেকনোলজি: 3G, 4G এবং LTE, লিবারেল আর্টস এবং ভবিষ্যতের ইঞ্জিনিয়ারিং।

লেখক তাঁর বইটিতে “Internet of Things” ওপর বেশ জোড় দিয়েছেন। যারা বিজ্ঞানের ছাত্র তাদের কাছে Internet of Things (IOT) বিষয়টি হয়তো জানা। কিন্তু আমরা যারা আমজনতা তাদের কাছে IOT ততোটা পরিচিত নয় বৈকি। তাই লেখক সহজ ভাষায় বলেছেন - IOT বলতে বোঝায় বিভিন্ন বস্তু বা Things এর মধ্যে যোগাযোগ ঘটা অর্থাৎ Internet working হওয়া। IOT কে বলা হয় Information Society পরিকাঠামো। আমাদের দেশে ডিজিটালাইজেশনে পরবর্তী ধাপ নিঃসন্দেহে IOT এবং এর ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে Smart City । সত্যি বলতে কি ইন্টারনেট বর্তমান সময়ে আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নাটকীয়ভাবে পাল্টে দিয়েছে এবং এ পরিবর্তন এত কমসময়ে ও এত ব্যাপকহারে হয়েছে যে তা সায়েন্স ফিকশন গল্পের মতই লাগে।

শহরের মানুষেরা IOT কে তাদের জীবনযাপনের সাথে সম্পৃক্ত করে তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনকে কতটা সহজ করেছেন তা লেখক উদাহরণের সাহায্যে বুঝিয়েছেন। এক্ষেত্রে লেখক ক্লাসরুমকে উদাহরণ হিসেবে নিয়েছেন। ইন্টারনেট অব থিংসের মাধ্যমে আমরা শিক্ষকদের কাছে তথ্য পৌঁছে দিতে পারি যখন তার শিক্ষার্থীরা মনোযোগ হারাচ্ছে। এটা করা সম্ভব শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর, নড়াচড়া, কথাবার্তা, ভাবভঙ্গি ইত্যাদি বিশ্লেষণের মাধ্যমে। শিক্ষককে পড়া বোঝানোয় ব্যস্ত থাকতে হয়, তাই এই বিশ্লেষণের কাজ করবে বিভিন্ন যন্ত্র। তারা বিশ্লেষণ করে ফলাফল শিক্ষককে পাঠাবে, যার ফলে একজন শিক্ষক বুঝতে পারবেন যে তার লেকচারের কোন সময়ে শিক্ষার্থীরা মনোযোগ হারিয়ে ফেলে।

একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় লেখক বলেছেন তা হল- শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপমুক্ত রাখা। স্কুল এমন একটি জায়গা যেখানে শিক্ষার্থীরা একে অপরের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলে। সারাক্ষণ নজরদারির মধ্যে রয়েছে-এই ব্যাপারটি কারো মাথায় ঢুকে গেলে তার পক্ষে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক আচরণ করা সম্ভব নয়। তাই শিক্ষার্থীদের এই বিশ্লেষণের ব্যাপারে না জানানোই ভালো। অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় নষ্ট হওয়া থেকে শিক্ষককে মুক্তি দিতে পারে ইন্টারনেট অব থিংস। রোল ডাকার কথাই চিন্তা করা যাক। প্রতিদিন কয়েক মিনিট ব্যয় হয় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বুঝে নিতে। এই সময় সহজে বাঁচানো সম্ভব যদি তাদের উপস্থিতি ‘অটোম্যাটিক’ভাবে হয়ে যায়। ছাত্রছাত্রীরা ক্লাসের সিটে বসার সাথে সাথেই তাদের উপস্থিতি চলে যাবে কম্পিউটারে! এটি করা যেতে পারে ঘুসর- এর মতো হাতে পড়ার উপযোগী ‘স্মার্টব্যান্ড’-এর মাধ্যমে। এই স্মার্টব্যান্ড ECG pattern -এর মাধ্যমে কোন ব্যক্তি এটি পরে আছে তা জানান দিতে সক্ষম। শিক্ষার্থীরা সিটে বসলেই এটি সিগন্যাল পাঠিয়ে দেবে যার ফলে সেই শিক্ষার্থীর উপস্থিতি আপনা থেকেই যাবে। ইন্টারনেট অব থিংসের আরেকটি মজার ব্যবহার হল সেন্সর গ্লাভস । হাত মোজার মত এই সেন্সর গ্লাভসগুলো ‘Interactive Learning’ এর ক্ষেত্রে বেশ কাজ দেয়।

আমাদের হয়তো অনেকেরই জানা নেই বাংলাদেশে ইতোমধ্যে IOT এর রুপকল্প শুরু হয়েছে। ঢাকার মিরপুরে গড়ে উঠেছে ইন্টারনেট অব থিংসের ল্যাব। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির এই ল্যাবের সার্বিক তত্ত্বাবধায়নে রয়েছে যৌথভাবে ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব) এবং ডাটাসফট। ট্রেনিং প্রোগ্রামটি দেখাশোনা করছে আইএটি, বুয়েট এবং আর্থিক সহায়তায় রয়েছে বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ সরকারের আইসিটি মন্ত্রণালয়।

BOOK

বই থেকে আমরা জানতে পারি IOT আমাদের দেশে বিভিন্ন সেন্টারে যেন কাজ করতে পারে সে লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রজেক্ট চলছে। IOT এর মাধ্যমে জলযান সুরক্ষা ব্যবস্থা, মেডিসিন সিস্টেম, গাড়িতে অ্যান্টি সোয়াট সিস্টেম, স্মার্ট সিটি ট্রান্সপোর্টের সিস্টেম, নদীদূষণ নির্ণয়, গার্মেন্টসে আগুন লাগানো রোধ করা, স্মার্ট গ্যাস ডিটেকশন সিস্টেম, স্মার্ট ল্যাম্পপোস্ট সিস্টেম, স্মার্ট গারবেজ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম করা সম্ভব এবং বাংলাদেশে IOT র সাহায্য নিয়ে কাজ করার কর্মপরিকল্পনা চলমান।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ যে কয়টি ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করেছে তার মধ্যে কৃষিতে অর্জিত সাফল্য গর্ব করার মতো। সরকারের সদিচ্ছা, কৃষকদের মেধা এবং পরিশ্রমের ফসল হিসেবে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পেরেছে। কৃষিজমি কমতে থাকা, বন্যা, খরা, লবণাক্ততার মতো প্রতিকূলতাকে পিছনে ফেলে চাল ও মাছ উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ এবং সবজি উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। আম উৎপাদনে রয়েছে সপ্তম স্থানে। আলু উৎপাদনে শীর্ষ দশটি দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের নাম।

এত অর্জন সত্ত্বেও প্রতিকূলতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে কৃষি জমির ওপর প্রতিনিয়ত চাপ বাড়ছে। এজন্যই কৃষিক্ষেত্রে সাফল্য বজায় রাখতে হলে প্রয়োজন IOT। IOT ব্যবহার করে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবল থেকে কৃষকদের জমি ও খামার নিরাপদ রাখার জন্য আধুনিক ও দীর্ঘ মেয়াদী সমাধান বের করা সম্ভব।

যারা বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী তাদের অন্যতম প্রিয় বিষয় কোয়ান্টাম কম্পিউটারিং। মানুষ স্বপ্নচারী। মানব সভ্যতা সবসময়ই প্রযুক্তিনির্ভর এবং সামনের দিকে যেতে চায়। মানুষ কখনোই তার অবস্থান নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। তাই কম্পিউটিং নিয়েও মানুষ উত্তরোত্তর উন্নতি লাভ করেছে। কোয়ান্টাম কম্পিউটার স্বপ্নচারী মানুষকে নিয়ে যাবে নবদিগন্তে। যার ফলে ভবিষ্যতে মানুষ বিমান ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক এবং নিরাপদ করে তুলতে পারবে।

জেট বিমানের সফটওয়্যার বর্তমানে আরও নিরাপদ করা খুব জটিল হলেও ভবিষ্যতে তা সম্ভব হবে। আরও বহুদূরে অসংখ্য গ্রহ-নক্ষত্র আবিষ্কার করা সম্ভব হবে। মানুষের ক্যানসার আগে থেকেই নির্ণয় করা সম্ভব হবে, যার ফলে বেঁচে যাবে অসংখ্য জীবন। আবহাওয়ার পূর্বাভাস আরও নিখুঁতভাবে জানা যাবে, যার ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষের মৃত্যুর হার কমে যাবে। অ্যামিনো অ্যাসিড এবং DNA sequence বিশ্লেষণের মাধ্যমে অত্যাধুনিক ওষুধ তৈরি করা সম্ভব হবে। এসব কিছু সম্ভব হবে কোয়ান্টাম কম্পিউটারের মাধ্যমে।

মোবাইল টেকনোলজি নিয়ে লেখক বইয়ের একটি অধ্যায়ে লিখেছেন মোবাইল টেকনোলজি: 3G, 4G এবং LTE । আমরা সাধারণ মানুষ প্রায়ই বলি-আমাদের মোবাইলে 3G, 4G সুবিধা পাচ্ছি-বস্তুত এগুলো সম্পর্কে জানি কি? লেখক সহজ ভাষায় তা বর্ণনা করেছেন এইভাবে-“প্রথমেই এ দ্বারা কি বোঝায় তা উল্লেখ করে নেই। 3G বা 4G -এর এ দ্বারা Generation বা প্রজন্ম বোঝানো হয়। অর্থাৎ 4G দ্বারা চতুর্থ প্রজন্মের প্রযুক্তি বোঝায়। প্রথম জেনারেশন বা 3G দ্বারা অ্যানালগ সেলুলার ফোন এবং দ্বিতীয় জেনারেশন বা 3G দ্বারা ডিজিটাল সেলুলার ফোন সিস্টেম বোঝানো হয়। কিন্তু পরের প্রজন্মগুলো অ্যানালগ বা ডিজিটাল দ্বারা নয়, বরং ডাটা ট্রান্সফার করার দক্ষতা দ্বারা ভাগ করা হয়। অর্থাৎ পরবর্তী প্রজন্মের ফোনের ডাটা ট্রান্সফার রেট সাধারণত বেশি হয়।

লেখকের “অদৃশ্য প্রযুক্তি” বইটি পড়ে মনে হয়েছে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীসহ যারা তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ে আগ্রহী-তাদের চাহিদা পূরণ হবার মতই একটি বই এটি। তথ্য প্রযুক্তির মত জটিল বিষয়কে লেখক সহজবোধ্যভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছেন যা পাঠককে আকর্ষণ করতে বাধ্য। বইটির সার্বিক গেট আপও চমৎকার। লেখক ড. সাজ্জাদ হোসেনের এ জন্য ধন্যবাদ প্রাপ্য। আমি নিশ্চিত বিজ্ঞানে/তথ্য প্রযুক্তিতে আগ্রহীরা ইতোমধ্যেই বইটি পড়তে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। আগ্রহীরা বইটি পড়তে চাইলে সংগ্রহ করতে পারেন “প্রথম পালক” প্রকাশনী থেকে। বইটি মূল্য মাত্র ২৬০ টাকা।

বইয়ের নাম: অদৃশ্য প্রযুক্তি
লেখকের নাম: ড. সাজ্জাদ হোসেন
প্রকাশনা: প্রথম পালক
বইটি মূল্য: ২৬০ টাকা

এইচআর/জেআইএম

‘“অদৃশ্য প্রযুক্তি” বইটি পড়ে মনে হয়েছে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীসহ যারা তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ে আগ্রহী-তাদের চাহিদা পূরণ হবার মতই একটি বই এটি। তথ্য প্রযুক্তির মত জটিল বিষয়কে লেখক সহজবোধ্যভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছেন যা পাঠককে আকর্ষণ করতে বাধ্য। বইটির সার্বিক গেট আপও চমৎকার। লেখক ড. সাজ্জাদ হোসেনের এ জন্য ধন্যবাদ প্রাপ্য। আমি নিশ্চিত বিজ্ঞানে/তথ্য প্রযুক্তিতে আগ্রহীরা ইতোমধ্যেই বইটি পড়তে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।