২৫৩ হত্যাও ঈদ আনন্দ?

মোস্তফা কামাল
মোস্তফা কামাল মোস্তফা কামাল , সাংবাদিক
প্রকাশিত: ০৯:৪১ এএম, ২১ আগস্ট ২০১৯

বাঙালির চামড়ার সহ্য ক্ষমতা অফুরান। তাদের দুর্ভোগ-ভোগান্তি নিয়ে রম্য-মশকরাও মেনে নেয়। মেনে নিতে যেন বাধ্য। ঈদের আগে টিকিট পাওয়ার যন্ত্রণা, ট্রেন-বাসে পথে পথে ভোগান্তি অস্বীকার করার চেষ্টা চলেছে। ঘুরমুখো মানুষের নাকানি-চুবানিকে বলা হয়েছে ‘স্বস্তির যাত্রা’। যানজটকে নাম দেয়া হয়েছে ‘ধীরগতি’। পরে বলে দেয়া হলো-এ ভোগান্তিকে মানুষ ঈদ আনন্দের অংশই মনে করে।

এ ধরনের তামাশামূলক কথাও হজম করতে হয়েছে মানুষকে। এখন যদি বলে দেয়া হয় এবারের ঈদ যাতায়াতে ১২ দিনে সড়ক, রেল ও নৌপথে ২৪৪টি দুর্ঘটনায় ২৫৩ জন নিহত ও ৯০৮ জন আহতের ঘটনাও আনন্দেরই অংশ, তাতে তেমন সমস্যা হবে না। টুকটাক সমালোচনা হতে পারে। কেউ ক্ষেপবে না, ক্ষুব্ধ হলেও বিক্ষুব্ধ হবে না- নিশ্চিৎ বলা দেয়া যায়। এক পর্যায়ে নসীবের লেখা বা হায়াত-মউতের মালিক আল্লাহ মেনে নিয়ে চুপসে যাবে। ততক্ষণে হয়তো মাতামাতি বা প্যাঁচালের মতো অন্য ইস্যুও এসে যাবে।

ঈদে স্বজনদের বাড়ির দিকে রওনা দিয়ে একই পরিবারের অনেকের বা পরিবারের অন্তিম যাত্রার কয়েকটি খবর এসেছে গণমাধ্যমে। এবার ঈদের ফিরতি যাত্রা শুরু হওয়ার পর গত বৃহস্পতিবার এক দিনেই সড়কে ঝরেছে ২৫ প্রাণ। গত রবিবার ১৮ আগস্ট কুমিল্লার লালমাইয়ের বাঘমারার জামতলি বাজারে বাসের ধাক্কায় নিভে গেছে অটোরিকসায় থাকা এক পরিবারের ছয়জনসহ আট প্রাণ। একইদিনে রাজধানী ঢাকা, ময়মনসিংহের ফুলপুর, হবিগঞ্জের বাহুবল, গোপালগঞ্জ, সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় মরেছে আরো ১০ জন। কিশোরগঞ্জে বাস খাদে পড়ে আহত হয়েছে ২০ যাত্রী। তাদের কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। জীব্ম্মৃত তারা।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য মতে, নিহত ২৫৩ জনের মধ্যে ২২৪ জনই মারা গেছে সড়ক-মহাসড়কে। বাকি ২৯ জন রেল ও নৌপথে। ঈদে দুর্ঘটনায় প্রাণহানি নিয়ে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি ৬ আগস্ট থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত ১২ দিনে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য সংগ্রহ করে এ দুর্ঘটনার হিসাব জানিয়েছে। এতে দেখা যায় এবার বিগত বছরের তুলনায় সড়ক দুর্ঘটনা ৬.৪০ শতাংশ, প্রাণহানি ৬.২৫ শতাংশ ও আহতের সংখ্যা ১.৫০ শতাংশ কমেছে। মোট সংঘটিত ২০৩টি সড়ক দুর্ঘটনার ৬৭টি ঘটেছে মোটরসাইকেলের সঙ্গে অন্যান্য যানবাহনের সংঘর্ষে, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৩ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে নিহত হয় সড়কে মোট নিহতের ৩৪.৩৭ শতাংশ। পথচারীকে গাড়িচাপা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে ৫২.২১ শতাংশ।

সড়কে নিহতদের মধ্যে নারী ৭০ জন। শিশু ২২, শিক্ষার্থী ৪২জন। এর বাইরে রয়েছেন ৩৭ জন ড্রাইভার, আটজন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, তিনজন শ্রমিক, তিনজন সাংবাদিক, দুজন চিকিৎসক এবং তিনজন রাজনৈতিক নেতা। এই সময়ে রেলপথে ট্রেনে কাটা পড়ার ১১টি, ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ার একটি, ট্রেনের সঙ্গে অন্যান্য যানবাহনের সংঘর্ষের একটি, ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার একটি ঘটনায় মোট ১৩ জন নিহত ও ১৫ জন আহত হয়। একই সময়ে নৌপথে ২৪টি দুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত, ৫৯ জন নিখোঁজ ও ২৭ জন আহত হয়।

ঈদে সড়কে ১২ দিনের মধ্যে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৬ আগস্ট ২২টি। সবচেয়ে কম ৮ ও ১১ আগস্ট সাতটি করে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৭.৪ শতাংশ বাস, ২৬.৩৩ শতাংশ মোটরসাইকেল, ১৬.৪ শতাংশ ট্রাক, পিকআপ, কাভার্ড ভ্যান ও লরি, ৭.৮২ শতাংশ কার-মাইক্রো, ১৩.৫২ শতাংশ অটোরিকশা, ৩.৫৫ শতাংশ নছিমন-করিমন এবং ৪.৯৮ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজি বাইক এসব দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল। সংঘটিত দুর্ঘটনার ২১ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ৫২.২১ শতাংশ পথচারীকে গাড়িচাপা দেওয়া, ১৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে এবং ৯.৮৫ শতাংশ অজ্ঞাত কারণে হয়।

গত ঈদুল ফিতরের আগে-পরে দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান ভয়াবহ। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট-এআরআই-এর তথ্যে দেখা যায়, ওই ঈদের পূর্বাপরে ১৫ দিনে ১৭২টি দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ১৫৪ জনের। ঈদের আগের সাত দিনে ৫০টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৭২ জন। আর ঈদের দিন থেকে পরের আট দিনে ১২২ দুর্ঘটনায় প্রাণহানি দ্বিগুণ, ১৪৪ জন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে গত ঈদুল ফিতর পর্যন্ত সাতটি ঈদযাত্রায় এক হাজার ৬১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে সড়কে। প্রতি ঈদে গড়ে ২৩০ জনের প্রাণ গেছে। তবে বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠনের হিসাবে সংখ্যাটি আরো বেশি।

বাস্তবতা বিচারে মরে যাওয়ার চেয়েও বেশি নাহালতে দুর্ঘটনায় আহত ও তাদের পরিবারের সদস্যরা। সড়ক দুর্ঘটনায় অবিরাম নিহতের কিছু ঘটনাকে মৃত্যু না বলে হত্যা বলে আসছেন কেউ কেউ। ঈদ ছাড়াও আমাদের সড়ক-মহাসড়কগুলো মৃত্যুপথ বা প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। একে ঈদের সাইড ইফেক্ট বা আনন্দের অংশ বলে চালিয়ে দিলেই বা কী? কে রুখবে মৃত্যু নিয়ে এ নিষ্ঠুর রসিকতার তত্ত্ব?

বেপরোয়া গতিতে ড্রাইভিং, ফিটনেসবিহীন ও পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী বহন, অদক্ষ ড্রাইভার-হেলপার দিয়ে যানবাহন চালানো, বিরামহীন ও বিশ্রামহীনভাবে যানবাহন চালানো, মহাসড়কে অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা, নছিমন-করিমন ও মোটরসাইকেলের অবাধে চলাচল হত্যা বা আত্মহত্যারই নামান্তর। দুর্ঘটনা নামের হত্যাকাণ্ড রুখবার কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয় না, এমনও নয়। প্রতি ঈদের মতো এবারও দুর্ঘটনা ঠেকাতে নানা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

বলা হয়েছিল, ঈদের সময় জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে কিছুতেই ধীরগতির ও নিষিদ্ধ যানবাহন চলাচল করতে দেওয়া হবে না। আনফিট ও বেপরোয়া গাড়ি চলাচল বন্ধে কঠোর হওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু, বাস্তবে সিদ্ধান্ত ফলেনি। সিদ্ধান্ত কার্যকরের চেয়ে বাস্তব চিত্র নিয়ে কথামালা ও সত্য আড়ালের চেষ্টা বেশি বৈ কম ছিল না। পরিণামে ঈদ যাতায়াত পথ হয়েছে রক্তস্নাত। যাতায়াতে কিছু ভোগান্তি-দুর্গতিকে মানুষ ঈদের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে নিতে অভ্যস্ত। তাই বলে সংখ্যায় যা-ই হোক একটি প্রাণহানিকেও ঈদ আনন্দের অংশ মনে করা যায় না। সেটা মনে করাতে বা মেনে নিতে বাধ্য করানো মরণকষ্টের চেয়ে কম যন্ত্রণার নয়।

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন।

এইচআর/জেআইএম

বেপরোয়া গতিতে ড্রাইভিং, ফিটনেসবিহীন ও পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী বহন, অদক্ষ ড্রাইভার-হেলপার দিয়ে যানবাহন চালানো, বিরামহীন ও বিশ্রামহীনভাবে যানবাহন চালানো, মহাসড়কে অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা, নছিমন-করিমন ও মোটরসাইকেলের অবাধে চলাচল হত্যা বা আত্মহত্যারই নামান্তর। দুর্ঘটনা নামের হত্যাকাণ্ড রুখবার কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয় না, এমনও নয়। প্রতি ঈদের মতো এবারও দুর্ঘটনা ঠেকাতে নানা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।