প্রতিযোগিতার মানস এবং অনিশ্চয়তার বোধ

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১:৩০ পিএম, ২৪ আগস্ট ২০১৯

কাজী শাহনেওয়াজ
মানুষ সামাজিক জীব। আর সে কারণেই যূথবদ্ধভাবে বসবাসের ইতিহাসও সুপ্রাচীন। পৃথিবীর সর্বত্রই ধর্ম-আচার-আচরণ-কৃষ্টি-কালচার ভেদে নানাবিধ পার্থক্য পরিলক্ষিত হলেও মৌলিক কিছু বিষয়ে সাদৃশ্য রয়েছে। আর এ সাদৃশ্য মানুষ হিসেবে আমরা যে প্রায় একই চেতনা লালন করি তাকেই নির্দেশ করে।

পৃথিবীর সর্বত্রই মানুষের চাহিদার মধ্যেও এক ধরনের সাদৃশ্য রয়েছে। এই চাহিদাগুলো মৌলিক। বেঁচে থাকা বা জীবনধারণের জন্য যে সকল বিষয় অত্যাবশ্যকীয় তা সবার জন্যই স্থান-কাল-পাত্রভেদে কিঞ্চিৎ পার্থক্য থাকলেও মোটামুটি একই। স্বাভাবিক বা আয়েসি, নৈতিক বা অনৈতিক সব ধরনের জীবনযাপনই আমাদের চিন্তা-চেতনা-বিশ্বাস-শিক্ষা-মূল্যবোধ দ্বারা নির্ধারিত হয়।

এই জীবনধারণের জন্য পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই মানুষ তার প্রয়োজনীয়তা সাপেক্ষে জীবিকা অর্জন করে যাচ্ছে। কিন্তু এই স্বাভাবিক এবং সুস্থ জীবিকা অর্জনের বাইরে যে অসম এবং অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে তার জন্য আমাদের মনন-জীবনবোধ-দীর্ঘকালের আচরিত অভ্যাস বা সংস্কৃতি বড় ভূমিকা রাখে।

আমরা আমাদের ব্যক্তিগত-পারিবারিক-সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় জীবন বা অভিজ্ঞতা দিয়ে যদি বিচার করি তাহলে দেখবো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতার মানস এবং অনিশ্চয়তার বোধ থেকেই আমরা অসুস্থ এবং অবৈধ উপার্জনের দিকে এগিয়ে যাই। অধিকাংশ মানুষকে তার এই অবৈধ উপার্জনের কারণ জিজ্ঞেস করলে এই উত্তরই পাওয়া যায়। সবাই তার কর্মজীবন শেষে জীবন সায়াহ্নে এসে নির্ভরতা খুঁজে ফেরে। পাশাপাশি তার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বা সন্তানকে নিরাপদ ভবিষ্যত দানের দুর্বিনীত প্রচেষ্টা থাকে। কিন্তু আমরা দেখেছি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অবৈধ পথে অর্জিত সম্পদ ভবিষ্যৎ নির্ভরতা হিসেবে তেমন কাজ করে না।

প্রকৃতপক্ষে এই নির্ভরতার বোধ প্রকৃতির অমোঘ নিয়মেই এক সময় প্রাসঙ্গিকতা হারায়। তাছাড়া উত্তরসূরিদের ভবিষ্যত নিশ্চয়তার বিষয়ে যে চিন্তা করা হয় তা শুধু আর্থিক নিশ্চয়তার উপর নির্ভর করে না বরং উন্নত জীবনবোধ-মানবিক চেতনা- সুশিক্ষা এগুলোই ভবিষ্যৎ নিশ্চয়তা হিসেবে কাজ করে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আপনি যেভাবে চিন্তা করছেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো আপনার এই চিন্তাকে সময়োপযোগী বা যুগোপযোগী ভাববে না যা আপনার ভাবনার খোরাক হওয়ার জোর দাবি রাখে। উপরন্তু আপনার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আপনার নির্মিত আর্থিক নিশ্চয়তার কারণে ভবিষ্যৎ নির্মাণের উদ্যম অনেকখানি হারিয়ে ফেলে। আপনার নির্মিত আর্থিক নিশ্চয়তা তাদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে বড় হওয়ার চিন্তার ধার কমিয়ে দেয়।

সামনে বড় কোনো লক্ষ্য থাকে না। অভাববোধের অভাব তাকে আড়ষ্ট করে, কর্মবিমুখ করে। আপনার আর্থিক নিশ্চয়তা আপনার উত্তরসূরির জীবন বিনির্মাণের সোনালি সময়কে হেসে-খেলে উড়িয়ে দেওয়াকে দারুণভাবে উৎসাহিত করে। পাশাপাশি আপনার আর্থিক স্বচ্ছলতা আপনাকে অনেকখানিই নির্ভার রাখে বলে আপনিও উত্তরসূরির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের অন্যান্য নিয়ামকগুলোতে মনোনিবেশ করেন না বা গুরুত্ব দেন না।

আমরা অনেককে দেখেছি, যারা প্রাচুর্যে বড় হয়েছে তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সামান্য প্রতিবন্ধকতাতেই হাঁপিয়ে ওঠে। জীবনের কিঞ্চিৎ এবং সাময়িক পতন মেনে নিতে পারে না। সামান্যতেই হতাশ হয়ে পড়ে। তাহলে এই যে আমরা ভবিষ্যত নিশ্চয়তার জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতায় প্রতিনিয়ত নিজেদের শামিল করছি- দিনশেষে তা আমাদের জন্য কী বয়ে আনছে? আসলে কি আমরা সঠিক পথে আছি? আসলে কি আমরা ঠিকভাবে ভাবছি?

জীবনের পরতে পরতে যেখানে অনিশ্চয়তা সেখানে নিশ্চয়তার পেছনে অবিরাম ছুটে চলার আদৌ কি কোনো মানে আছে? এর চেয়ে কি এটা ভালো নয় যে- আমরা সুন্দর মানবিক জীবনযাপন করবো? আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জীবনযুদ্ধে শামিল হয়ে জয় ছিনিয়ে আনার শিক্ষা দেবো? তাদেরকে এটা বুঝিয়ে দেবো, জীবন একটাই যা ক্ষণস্থায়ী এবং মানুষের কল্যাণে নিবেদিত। একটা জীবন অসুস্থ প্রতিযোগিতায় শামিল হওয়ার জন্য নয়। কারো অকল্যাণ চিন্তার জন্য নয়। কাউকে ঠকানোর জন্য নয়। সুস্থ জীবনযাপন এবং অসুস্থ প্রতিযোগিতায় শামিল না হওয়ার ক্ষেত্রে সুশিক্ষা এবং উন্নত জীবনবোধ বড় ভূমিকা পালন করতে পারে।

আসুন অনিশ্চিত নিশ্চয়তার পেছনে না ছুটে যৌক্তিক মানবিক জীবনযাপন করি। অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নিজেকে শামিল না করি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে উন্নত মানবিক জীবনযাপন করার তাড়নায় রাখি। আয়েসি-কর্মবিমুখ প্রজন্ম হিসেবে গড়ে না তুলি। নিজের নিশ্চিত ভবিষ্যতের অলীক স্বপ্নে বিভোর হয়ে অন্যের অকল্যাণের কারণ না হই। কারণ অন্যের অকল্যাণ বা অসাধুভাবে অর্জিত সম্পদ কোনোভাবেই আপনার কল্যাণ বা ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করবে না। কেননা ভালো-মন্দ যাই করুন না কেন- অবশ্যই এর মূল্য চুকাতে হবেই।

লেখক : অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর দপ্তর), (পিপিএম-সেবা), পিরোজপুর।

এইচআর/জেআইএম

জীবন একটাই যা ক্ষণস্থায়ী এবং মানুষের কল্যাণে নিবেদিত। একটা জীবন অসুস্থ প্রতিযোগিতায় শামিল হওয়ার জন্য নয়। কারো অকল্যাণ চিন্তার জন্য নয়। কাউকে ঠকানোর জন্য নয়। সুস্থ জীবনযাপন এবং অসুস্থ প্রতিযোগিতায় শামিল না হওয়ার ক্ষেত্রে সুশিক্ষা এবং উন্নত জীবনবোধ বড় ভূমিকা পালন করতে পারে।