বঙ্গবন্ধুই নদী ও সুন্দরবন রক্ষার পথদ্রষ্টা

আশীষ কুমার দে
আশীষ কুমার দে আশীষ কুমার দে , সিনিয়র সাংবাদিক ও অধিকারকর্মী
প্রকাশিত: ১০:৪৩ এএম, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯

নদ-নদী আমাদের অমূল্য সম্পদ ও বাংলাদেশের অস্তিত্বের অংশ এবং অদূর ভবিষ্যতে অনাদর-অবহেলায় এ সম্পদ ধ্বংস হতে পারে, এর ওপর পড়তে পারে ভূমিখেকোদের লোলুপ দৃষ্টি- দূরদর্শী বঙ্গবন্ধু তা হয়তো উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। এজন্য যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের মতো কঠিন কাজের শত ব্যস্ততার মধ্যেও নদ-নদী খননের বিষয়টিকে প্রাধান্য দিতে ভোলেননি তিনি। কারণ তিনি নিজেও নদীবেষ্টিত জেলা গোপালগঞ্জের সন্তান।

প্রিয় মাতৃভূমির শাসনভার হাতে নিয়েই নদীমাতৃক বাংলাদেশের নৌ চলাচল ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করেন বঙ্গবন্ধু। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত পাকিস্তানের রেখে যাওয়া ‘খনক’ নামের একটি মাত্র ড্রেজার (খননযন্ত্র) দিয়ে বিশাল আয়তনের অভ্যন্তরীণ নৌপথের নিয়মিত পলি অপসারণ ও নদী খনন সম্ভব নয়। শতভাগ যৌক্তিক এ উপলব্ধি থেকেই বঙ্গবন্ধু তাঁর সংক্ষিপ্ত শাসনামলে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) জন্য দু’দফায় বিদেশ থেকে সাতটি ড্রেজার সংগ্রহ করেছিলেন; যেগুলো এখনও বিআইডব্লিউটিএর বহরে যুক্ত ও সচল রয়েছে। সেসব জলযান বা ড্রেজার হলো : ডেল্টা-১, ডেল্টা-২, ড্রেজার-১৩৫, ড্রেজার-১৩৬, ড্রেজার-১৩৭, ড্রেজার-১৩৮ ও ড্রেজার-১৩৯।

শুধু কি তাই? নদীমাতৃক বাংলাদেশে নৌ পরিবহন ব্যবস্থা যাতে ব্যাহত না হয়, নৌপথের পলি অপসারণ ও নদী খনন কাজ যাতে সঠিকভাবে হয়, এজন্য বিশ্বখ্যাত একজন রাষ্ট্রনায়ক হয়েও নৌ মন্ত্রণালয়কে বেশ কিছুদিনের জন্য নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু নদীপ্রেমীই ছিলেন না, প্রকৃতিপ্রেমীও ছিলেন তিনি। কালের এ মহানায়ক বাংলাদেশের অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদ সুন্দরবনকে নিয়েও ভাবতেন। দূরদর্শী এ নেতা সুন্দরবনের ভবিষ্যত নিয়ে উদগ্রীব ছিলেন। প্রাকৃতিক এ বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত শেলা নদীর বুক চিরে বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল অব্যাহত থাকলে নিকট-ভবিষ্যতে সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে- এমন আশঙ্কাও জেগেছিল তাঁর মনে। যেহেতু আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দর মংলার সঙ্গে শিল্প ও বন্দরনগরী খুলনাসহ দেশের অন্যান্য স্থানের নৌ যোগাযোগ অপরিহার্য ছিল, সেহেতু মংলা বন্দরের যাত্রা শুরু থেকেই শেলা নদী দিয়ে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করতো। তাই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি বন্ধ করাও সম্ভব ছিল না।

দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন, সময়ের প্রয়োজনেই শেলা নদীকে ভারি নৌযান চলাচলমুক্ত করতে হবে। তা না হলে সুন্দরবনকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে যাবে। এ উপলব্ধি থেকে তিনি মংলা বন্দর ও খুলনার মধ্যে বিকল্প নৌপথ সৃষ্টির উপায় খুঁজতে থাকেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সেখানকার পরিস্থিতি সরজমিন পরিদর্শনের ছুটে যান তৎকালীন নৌ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী জেনারেল আতাউল গণি (এম এ জি) ওসমানী; যিনি ছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি। ঢাকায় রাষ্ট্রীয় দপ্তরে বসে ওসমানীকে পাঠিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি তিনি, বিকল্প নৌপথ খুঁজতে পরবর্তী সময়ে নিজেও ছুটে গিয়েছিলেন মংলায়।

রাষ্ট্রনায়ক ও সেনানায়কের পরিদর্শন শেষে লুপ কার্টিং ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বাগেরহাট জেলার মোড়েলগঞ্জ উপজেলার ঘষিয়াখালী থেকে রামপাল উপজেলার বেতিবুনিয়া পর্যন্ত ৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার (কিমি) সংযোগ খাল খনন করা হয়। এরপর ১৯৭৪ সালে চালু হয় মংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেল বা নৌপথ; যার মূল লক্ষ্য ছিল- সুন্দরবনকে অক্ষত রেখে মংলা সমুদ্রবন্দরের পণ্য আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে স্বল্পদূরত্বের বিকল্প পথ আবিষ্কার করা।

মংলা থেকে ঘষিয়াখালী পর্যন্ত আলোচিত এই নৌপথের দূরত্ব ৩১ কিমি। সদ্যভূমিষ্ঠ সুস্থ একটি শিশু যেমন সকলের দৃষ্টি কাঁড়ে, তেমনি চালুর অল্পদিনের মধ্যেই নতুন নৌপথটি সার্বিক বিবেচনায় হয়ে ওঠে জনপ্রিয়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য স্থানের নৌ যোগাযোগের ক্ষেত্রেও নতুন এ নৌপথ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে মংলা-ঘষিয়াখালী নৌপথ ‘বাংলাদেশ-ভারত নৌবাণিজ্য প্রটোকল রুট’ এর অন্তর্ভুক্ত হয়। ফলে এর গুরুত্ব অনেকগুণ বেড়ে যায়। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মংলা বন্দর, খুলনা ও নোয়াপাড়া নদীবন্দর, চালনা, রায়মঙ্গল ও ভারতের সঙ্গে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে মংলা-ঘষিয়াখালী নৌপথটি এখন অপরিহার্য।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এই পদক্ষেপের মধ্যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক দিক পরিলক্ষিত হয়। প্রথমত: বিকল্প নৌপথ তথা মংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেলটি সমুদ্রবন্দর মংলার সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে দেয়ায় জাহাজ চলাচলে সময়, অর্থ ও জ্বালানি তেলের ব্যয় কমে গেছে। দ্বিতীয়ত: বাংলাদেশ-ভারত নৌবাণিজ্য প্রটোকল রুটের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় চ্যানেলটি আন্তর্জাতিক নৌপথের স্বীকৃতি পেয়েছে। এবং তৃতীয়ত: শেলা নদীর ওপর দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ হওয়ায় পরিত্যক্ত বিষাক্ত জ্বালানি তেল ও ভয়াবহ শব্দদূষণ থেকে সুন্দরবন রক্ষা পেয়েছে। ফলে এই প্রাকৃতিক বনের অগণিত প্রজাতির জলজ প্রাণি ও উদ্ভিদের ধ্বংসঝুঁকিও কমেছে। সুতরাং মংলা-ঘষিয়াখালী বিকল্প চ্যানেল সৃষ্টির বঙ্গবন্ধুর ওই পদক্ষেপ ছিল যুগান্তকারী; যা ইতিহাসের মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত।

একইভাবে নৌপথের পলি অপসারণ ও নদী খননের জন্য স্বাধীন দেশে ড্রেজার আমদানির মতো সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নদীর প্রতি তাঁর প্রগাঢ় ভালোবাসারই বহি:প্রকাশ ঘটিয়েছে। এছাড়া তাঁর শাসনামলেই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয় অভ্যন্তরীণ নৌপথের জরিপ প্রতিবেদন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ১৯৭৪ সালে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃক প্রকাশিত তথ্যে প্রথম জানা যায়, বাংলাদেশে নৌপথের দৈর্ঘ্য ২৫,১৪০ (পঁচিশ হাজার এক শ’ চল্লিশ) কিলোমিটার; যা বঙ্গবন্ধু হত্যা-পরবর্তী ৩০ বছরে মাত্র ৫,৯৬৮ (পাঁচ হাজার নয় শ’ আটষট্টি) কিলোমিটারে নেমে এসেছিল। বিলুপ্ত বা হারিয়ে যাওয়া বিশাল আয়তনের সে নৌপথ পুনরুদ্ধারের আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ব্যাপক খনন ও পলি অপসারণের মাধ্যমে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার নৌপথ ইতোমধ্যে উদ্ধারও হয়েছে।

প্রসঙ্গত নেদারল্যান্ডের সংস্থা NEDECO’এর একটি বিশেষজ্ঞ দল ১৯৬৫-৬৭ পর্যন্ত ওই জরিপ চালালেও তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান সরকার তা যথাসময়ে প্রকাশ করেনি; বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে প্রকাশ করা হয়। সুতরাং সার্বিক পর্যালোচনায় তর্কাতীতভাবেই বলা যায়, বঙ্গবন্ধুই এ দেশের নদ-নদী, নৌপথ ও সুন্দরবন রক্ষা এবং নৌ পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের প্রথম পথপ্রদর্শক।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও অধিকারকর্মী। [email protected]

এইচআর/জেআইএম

প্রিয় মাতৃভূমির শাসনভার হাতে নিয়েই নদীমাতৃক বাংলাদেশের নৌ চলাচল ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করেন বঙ্গবন্ধু। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত পাকিস্তানের রেখে যাওয়া ‘খনক’ নামের একটি মাত্র ড্রেজার (খননযন্ত্র) দিয়ে বিশাল আয়তনের অভ্যন্তরীণ নৌপথের নিয়মিত পলি অপসারণ ও নদী খনন সম্ভব নয়। শতভাগ যৌক্তিক এ উপলব্ধি থেকেই বঙ্গবন্ধু তাঁর সংক্ষিপ্ত শাসনামলে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) জন্য দু’দফায় বিদেশ থেকে সাতটি ড্রেজার সংগ্রহ করেছিলেন; যেগুলো এখনও বিআইডব্লিউটিএর বহরে যুক্ত ও সচল রয়েছে।