শান্তি আলোচনা বাতিলের দায়ভার তালেবানরা এড়াতে পারে না

আনিস আলমগীর
আনিস আলমগীর আনিস আলমগীর , সাংবাদিক ও কলামিস্ট
প্রকাশিত: ০১:০৫ পিএম, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

দীর্ঘ সময়ব্যাপী কাতারের রাজধানী দোহায় আমেরিকা এবং তালেবানদের মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ছিলেন বিশেষ মার্কিন দূত জালমে খলিলজাদ আর তালেবানদের পক্ষে ছিলেন তালিবান উপনেতা মোল্লা আবদুল গনি বারাদার। উভয় পক্ষের আলাপ-আলোচনায় চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল। কোনো কোনো সূত্র বলছে যে, চুক্তিটি উভয়পক্ষ স্বাক্ষর করেছিলেন কিন্তু ৫ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার কাবুলে গাড়ি হামলার দায় তালেবানদের স্বীকার করার পর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ৭ সেপ্টেম্বর শনিবার একাধিক টুইট বার্তায় বলেছেন তিনি আলোচনা বাতিল করেছেন।

ট্রাম্প ক্যাম্প ডেভিডে তালেবান শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে তার যে শীর্ষ বৈঠক হওয়ার কথা ছিল তাও বাতিল করে দিয়েছেন। তালেবান নেতাদের সঙ্গে ক্যাম্প ডেভিযে যে গোপন বৈঠক হওয়ার কথা ছিল তার পরপরই আফগান প্রেসিডেন্টের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বৈঠকের নির্ধারিত কর্মসূচি ছিল। ট্রাম্প একটি যৌক্তিক কথা বলেছেন, ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শান্তি বৈঠক চলাকালে তারা যদি একটি অস্ত্রবিরতিতে রাজি না হয় আর ১২ জন নিরপরাধ ব্যক্তিকে হত্যা করে তাহলে তারা (তালেবানরা) সম্ভবত একটি তাৎপর্যপূর্ণ চুক্তির বিষয়ে আলোচনা করার যোগ্যতা রাখে না।’

ট্রাম্পের উপলব্ধি যে অহেতুক তাও নয়। বুঝতে হবে আফগানরা যার প্রতি আস্থাশীল নয় তারা তা বানচাল করে দেয়। সম্ভবত চুক্তিটি নিয়ে দীর্ঘ সময় তালেবানরা আলাপ-আলোচনা করেছে সত্য তবে চূড়ান্ত পর্যায়ে তারা মনে হয় সন্তুষ্ট হয়নি। আফগানরা কষ্টসহিষ্ণু জাতি। কোনো কিছু সংক্ষিপ্ত পথে আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে পেতে চায় না। একটা প্রাচীন ইতিহাসে পড়েছি আফগানরা হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের বংশধারা থেকে এসেছে। ইয়াকুবের আরেক নাম ইসরাইল।

আফগানদের পূর্বপুরুষের নাম ‘আফাগেনা’, যিনি বনী-ইসরাঈলের বাদশা তালুতের পৌত্র ছিলেন। আফগানরা ইহুদি বংশোদ্ভব জাত। এইজন্য পশতু ভাষায় বহু হিব্রু শব্দের সংমিশ্রণ ঘটেছে। আফগানরা যে ইসরায়েলের পুত্রগণের শাখা-প্রশাখা একথা তার এক লেখায় বলেছেন আল্লামা ইকবাল।

ইহুদি বংশধারার লোকেরা রক্ষণশীল। অত্যন্ত আধুনিক ধ্যান-ধারণার মানুষ হয়েও ইহুদিরা ধর্মীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। তালেবানরাও দেখা গেছে যে ধর্মীয় অনুশাসনে অনুরক্ত। কিন্তু তাদের আধুনিক ধ্যান ধারণা সীমিত। তালেবানদের এই বোধোদয় হলে ভালো হতো যে, আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তারা সারাজীবন যুদ্ধ করেও পারবে না। কাতারে শান্তি আলোচনার সময় যুদ্ধবিরতি মেনে চলা তাদের জন্য সর্ব অবস্থায় ‘ওয়াজিব’ ছিল। কী কূটনৈতিক, কী ধর্মীয়- উভয় দিক থেকে পালনীয় কর্তব্যকে অবহেলা করার ফলে তালেবান গোষ্ঠি আবারও পিছিয়ে গেল। তালেবানরা সবকিছু দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে যুদ্ধের আয়না দিয়ে। তাতে তারা সব সময় দৌড়ের উপর থাকে।

কাবুল সরকারের দখলে থাকা অনেক জায়গা এখন তালেবানদের অধিকারে এসেছে কিন্তু তারা সেখানে কোনো সুন্দর জীবন ব্যবস্থার আয়োজন করতে পারেনি। বিবিসির এক সাংবাদিক তালেবানদের নিমন্ত্রণে তালেবান অধিকৃত এলাকা সফর করেছিলেন ২০১৭ সালে। তিনি এসে যে বর্ণনা দিয়েছেন তাতে দেখা যায় যে কাবুল সরকারের অধীনে থাকতে যেসব এলাকায় স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল সেসব স্কুল এখনো চলছে। তালেবানরা তা বন্ধ করেনি। শিক্ষকদের বেতন এখনো কাবুল সরকার পরিশোধ করে। তালেবানরা দেখেও না দেখার ভান করে।

তালেবানদের অস্থায়ী রাজধানী হচ্ছে মুসা কালায়। সে এলাকা আফিম ব্যবসার জন্য বিখ্যাত। দুনিয়ার ৯০ শতাংশ আফিম উৎপাদন হয় আফগানিস্তানে। তালেবানদের প্রধান আয়ের উৎস হচ্ছে আফিম। আফিম ব্যবসা টাকা দিয়ে তালেবানরা চলে অথচ এই ব্যবসার রোজগারের বৈধতা নিয়ে ইসলামী পণ্ডিতদের মাঝে বিতর্ক রয়েছে। বিতর্কজনক রোজগার থেকে বিরত থাকা খোদাভীতির লক্ষণ। ক্ষুধার্ত মানুষের মৃত প্রাণীর মাংস খাওয়া জায়েজ, এমন সিদ্ধান্তে যদি তালেবানরা আফিম ব্যবসার টাকা ব্যবহার করে থাকে তবে অনুরূপ সিদ্ধান্তে আধুনিক জীবন ব্যবস্থা গ্রহণ করাও জায়েজ। কারণ মুসলিম সমাজ আধুনিক জীবন ব্যবস্থা থেকে পিছিয়ে গেলে হারিয়ে যাবে। অথচ তালেবানরা আধুনিকতাকে গ্রহণ করতে খুবই শঙ্কিত। তাদের অস্থায়ী রাজধানী মুসা কালাতে মোবাইল ফোন এবং ইন্টারনেট নিরাপত্তা ও ধর্মের কারণে নিষিদ্ধ।

যাহোক আলোচনা আরম্ভ করেছিলাম তালেবানদের সঙ্গে আমেরিকানদের কাতার বৈঠক ও শান্তি চুক্তি বাতিল প্রসঙ্গে। তালেবানরা বলেছে শান্তি আলোচনা বাতিল করে আমেরিকানরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে শান্তি আলোচনা চলার সময় কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টিত কূটনৈতিক এলাকায় গাড়িবোমা হামলা এবং প্রতিপক্ষের সৈন্য হত্যা নিশ্চয়ই সভ্যতা বিরোধী কাজ। তার জন্য তালেবানদের অনুতপ্ত হওয়া উচিত। যে-হাতে সন্ধির সফেদ পতাকা রয়েছে তা বড়ই পবিত্র। তা রক্তাক্ত করা তালেবানদের উচিত হয়নি। তারা বর্বরতার পরিচয় দিয়েছে।

এখন আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি সরাসরি আলোচনার প্রস্তাব করেছেন। আমি মনে করি তালেবানদের উচিত সেই প্রস্তাব গ্রহণ করা। আমেরিকার এত প্রয়াস কাবুল সরকারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তার চলে যাওয়ার জন্য। কাবুল সরকার এবং তালেবানেরা উভয়ে আফগান। পরস্পরের সরাসরি প্রতিপক্ষ। সুতরাং উভয় পক্ষ যদি সরাসরি আলোচনায় বসে একটা সমাধানের পথ খুঁজে বের করে তা হবে সর্বোত্তম। মনে রাখতে হবে আফগানদের একটা সমৃদ্ধ ইতিহাস ছিল। অন্তর্কলহে তারা সব হারিয়েছে।

ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক শের শাহ সুরি ছিলেন আফগানেরই সন্তান। যে জাতির আত্মগ্লানির পরিবর্তে আত্মবিস্মৃতির প্রাদুর্ভাব হয়, সে জাতি আর টিকে থাকেনা। এখন আফগানদের টিকে থাকার জন্য নিজেদের মাঝে বিরোধের অবসান ঘটিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন। তাতে আমেরিকানরা সম্মান বাঁচিয়ে আফগানিস্তান ছেড়ে যাওয়ার পথ পেতে পারে। আঠারো বছর যুদ্ধ করে যুদ্ধক্লান্ত আমেরিকাও চলে যেতে আগ্রহী।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।
[email protected]

এইচআর/জেআইএম

তালেবানরা বলেছে শান্তি আলোচনা বাতিল করে আমেরিকানরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে শান্তি আলোচনা চলার সময় কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টিত কূটনৈতিক এলাকায় গাড়িবোমা হামলা এবং প্রতিপক্ষের সৈন্য হত্যা নিশ্চয়ই সভ্যতা বিরোধী কাজ। তার জন্য তালেবানদের অনুতপ্ত হওয়া উচিত। যে-হাতে সন্ধির সফেদ পতাকা রয়েছে তা বড়ই পবিত্র। তা রক্তাক্ত করা তালেবানদের উচিত হয়নি। তারা বর্বরতার পরিচয় দিয়েছে।