ধন্যবাদ উপাচার্য নাসির!

ড. মো. আসাদুজ্জামান মিয়া
ড. মো. আসাদুজ্জামান মিয়া ড. মো. আসাদুজ্জামান মিয়া , বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক
প্রকাশিত: ০৩:০১ পিএম, ০১ অক্টোবর ২০১৯

১. বশেমুরবিপ্রবি’র উপাচার্য অবশেষে পদত্যাগ করেছেন। এজন্য তাকে ধন্যবাদ জানাতেই হয়। কারণ উনি বশেমুরবিপ্রবিতে সৃষ্ট অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি বা জটিলতা নিরসনের সবচেয়ে সহজ পন্থাটাই অবলম্বন করেছেন। নিলর্জ্জের মতো মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তর জন্য অপেক্ষা করেননি। যদিও ইউজিসি তার অপসারণের জন্য ইতিমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করেছে। তবে এই সুপারিশ কবে কার্যকর হবে বা আদৌকার্যকর হবে কিনা এ নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকেও হয়তো সিদ্ধান্ত নিতে হয় আরো উপর মহলের সাথে কথা বলে। তাই উপাচার্যদের অপসারণের সিদ্ধান্তটা নিতে সময় লেগে যায়।

বিগত এক দশকে বাংলাদেশে উপাচার্যদের তাদের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের জন্য সরকার কর্তৃক অপসারণের নজির খুব কম। উপাচার্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ে যত খারাপ কাজই করুক না কেন বা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য বিরোধী আন্দোলন যতই তীব্র হোক না কেন বা ইউজিসি তাদের বিরুদ্ধে যতই সুপারিশ করুক না কেন এতে উপাচার্যদের কিছুই হয় না। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে বহাল তবিয়তে থেকে যান। উপরন্তু বিপদে পড়ে আন্দোলনকারীরা, ইউজিসি’র সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে। সেই হিসেবে বশেমুরবিপ্রবি’র উপাচার্য পদত্যাগ করে সবাইকে বাঁচিয়েছেন বলা যায়।

২. বশেমুরবিপ্রবি’তে উপাচার্য প্রফেসর খন্দকার নাসিরের কর্মকাণ্ড ছিল অনেকটা স্বৈরশাসকদের মতো। পত্রপত্রিকায় উনার নামে অনেক খারাপ খারাপ খবর এসেছে। প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ, সীমাহীন নিয়োগ বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি এবং নারী কেলেংকারীসহ প্রায় সব অপকর্মই তিনি করেছেন। উপাচার্যের ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রভাবশালী মহলের মদদে শক্ত সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন এবং ২য় বারের জন্য উপাচার্যের দায়িত্ব বাগিয়ে নিয়েছিলেন। বশেমুরবিপ্রবি’র মতো জেলা শহরের অপেক্ষাকৃত ছোট ও নতুন বিশ্ববিদ্যালগুলোতে উপাচার্যরা অনেক অপকর্মই করে থাকেন যা সবসময় পত্র পত্রিকায় আসে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, কর্মকর্তারা অসহায়ের মতো সব মেনে নেয়। অবস্থা যখন চরম খারাপ পর্যায়ে চলে যায় তখন আমরা দেশবাসী তা জানতে পারি। যেমনটি হয়েছে সম্প্রতি বশেমুরবিপ্রবি’কে নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রী যে উপাচার্যের গদি নড়বড়ে করতে পারে তা প্রফেসর খন্দকার নাসির হয়তো কোনোদিন কল্পনাও করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত তাকে পদত্যাগ করতেই হলো। আসলে অন্যায়-অত্যাচার যখন পাপের পর্যায়ে চলে যায় তখন দুনিয়ার কেউ আর রক্ষা করতে পারে না।

৩. দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে (বিশেষ করে জেলা শহরের ছোট ও অপেক্ষাকৃত নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে) উপাচার্য নিয়োগ বা অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতিতে উপাচার্য অপসারণ/পরিবর্তনের ব্যাপারে সরকারকে আরো সুনজর দেওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক বিবেচনা ছাড়াও উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, গবেষণা, সততা, সক্ষমতা, ব্যক্তিত্ব, দেশপ্রেম, দায়িত্ববোধ আমলে নেয়া প্রয়োজন। যদিও অনেকসময় দেখা যায় যে, একজন ভালো প্রফেসরকে দায়িত্ব দেয়া হয় আর তিনিই সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি করেন।

উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের নিজস্ব পূর্ব-পরিকল্পনা থাকা দরকার। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা উপাচার্য হওয়ার জন্য যা করেন তা খুবই লজ্জাজনক। অনেকসময় এদেরকে রাজনৈতিক কর্মীর মতো আচরণ করতে দেখা যায়। উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি বিষয় এখন প্রায়ই পরিলক্ষিত হয়, যারা উপাচার্য হতে চায় তারা সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের বা রাজনৈতিক নেতাদের সহায়তায় পদটি বাগিয়ে নেন। কেউ কেউ ২য় বারের জন্য এক্সটেনশনও পেয়ে যান। যেন সরকার এদের নিয়োগ দেন না বরং এরাই তদবির করে নিয়োগ নেন(!)। উপাচার্য হওয়ার এই প্রচলন বন্ধ করতেই হবে। তা না হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চশিক্ষার গুণগত মান রক্ষা করা খুব কঠিন হবে। আবার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দুর্নীতির জন্য বা যে কোনো অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতিতির জন্য উপাচার্য অপসারণ/পরিবর্তনের ব্যাপারে সরকারকে ত্বরিৎ পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। এখানে ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কিছুটা সমন্বয়হীনতা থাকতে পারে। অবশ্য আরো একটি কারণও আছে, যেমন-অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের লাভ-লোভের কারণে বিনা কারণে বা ছোট্ট অজুহাতে উপাচার্য বিরোধী আন্দোলনে নেমে পড়ে এবং উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি করে। যাই হোক, বশেমুরবিপ্রবি’র উপাচার্য প্রফেসর খন্দকার নাসির আমাদের দেশে উপাচার্য নিয়োগের দুর্বল পদ্ধতিরই ফসল নইলে তার মতো লোক ২য় বার কিভাবে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান।

৪. বিশ্ববিদ্যালয়ে সবসময়ই কিছু ছাত্র-ছাত্রী থাকে যারা বিভিন্ন অন্যায় অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকে এবং আন্দোলনের ডাক দেয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য বিরোধী আন্দোলন হচ্ছে সর্ব্বোচ আন্দোলন। এই আন্দোলনে জয়ী না হলে উদ্যোগীদের প্রচুর খেসারত দিতে হয়। তাছাড়া উপাচার্যের নিজস্ব চাটুকার বাহিনীর (কিছু শিক্ষক, কর্মকর্তা ও ছাত্র) ভয়ে এই আন্দোলন কেউ করতেও চায় না, এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের যতই ক্ষতি হোক না কেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি যখন খুব খারাপের দিকে চলে যায় তখন সবাই এতে সমর্থন দেয়া শুরু করে। বশেমুরবিপ্রবি’তেও তাই ঘটেছে। উপাচার্যের দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, অন্যায়, অত্যাচার, স্বজনপ্রীতি, স্বৈরশাসন যখন চরমে পৌঁছেছে এবং সর্বশেষ উনি যখন আন্দোলনরত ছাত্র-ছাত্রীদের উপর লাঠিয়ালবাহিনী লেলিয়ে দিয়েছেন তখন সারাদেশ উনার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে এবং আন্দোলনকারীদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সবাই উনার অপসারণ চেয়েছে। অবশ্য উনি ইচ্ছে করলে আরো বেশ কিছুদিন সবাইকে ভোগাতে পারতেন। অপেক্ষা করতে পারতেন উনার অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত। উনার স্বভাবের সাথে তো সেটাই মানানসই। কিন্তু তিনি তা করেননি। হয়তো এবার তিনি তার পতন ঘন্টা শুনে ফেলেছেন। মরার আগ মুহূর্তে যেমন মানুষ বুঝতে পারে যে সে আর বাচঁবে না। তবে বশেমুরবিপ্রবি’কে আরো ক্ষতি করার চেষ্টা না করে শেষতক তিনি পদত্যাগ করেছেন তাই তাকে ধন্যবাদ।

লেখক : বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, গবেষক ও কলামিস্ট।

এইচআর/পিআর

উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি বিষয় এখন প্রায়ই পরিলক্ষিত হয়, যারা উপাচার্য হতে চায় তারা সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের বা রাজনৈতিক নেতাদের সহায়তায় পদটি বাগিয়ে নেন। কেউ কেউ ২য় বারের জন্য এক্সটেনশনও পেয়ে যান। যেন সরকার এদের নিয়োগ দেন না বরং এরাই তদবির করে নিয়োগ নেন (!)। উপাচার্য হওয়ার এই প্রচলন বন্ধ করতেই হবে। তা না হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চশিক্ষার গুণগত মান রক্ষা করা খুব কঠিন হবে। আবার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দুর্নীতির জন্য বা যে কোনো অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতিতির জন্য উপাচার্য অপসারণ/পরিবর্তনের ব্যাপারে সরকারকে ত্বরিৎ পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। এখানে ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কিছুটা সমন্বয়হীনতা থাকতে পারে