প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়ন দেখতে চায় মানুষ

সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয় সম্পাদকীয়
প্রকাশিত: ০৯:৫৯ এএম, ০৪ অক্টোবর ২০১৯

প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল বেড়েই চলেছে। সড়ক-মহাসড়কগুলো যেন পরিণত হয়েছে মৃত্যুফাঁদে। এতে অসংখ্য জীবন যাচ্ছে। প্রতিকারহীনভাবেই চলছে এই ‘দুর্ঘটনা’ নামক ‘হত্যাযজ্ঞ’। এ ব্যাপারে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে কর্তৃপক্ষকে।

বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট হার্টভিগ শ্যাফারের কণ্ঠেও সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ ঝরলো। তিনি বলেছেন, সারা বিশ্বে বছরে ১৩ লাখ মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে। এর ৯০ শতাংশই হচ্ছে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধির কারণে বিশ্বব্যাপী মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি লোকসান হচ্ছে। ফলে সড়ক নিরাপত্তার বিষয়ে কিছু করার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।

সম্প্রতি হোটেল কন্টিনেন্টালে ‘বাংলাদেশ টু ইম্প্রুভ রোড সেফটি’ বিষয়ক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। সেমিনারে প্রধান অতিথি হিবেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এ সময় অর্থমন্ত্রী বলেন, সড়কের নিরাপত্তার জন্য গত দশ বছরে ২১ হাজার কিলোমিটার নতুন রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। এখন দরকার গুণগত মান নিশ্চিত করা। এটি নিশ্চিত করতে পারলে দুর্ঘটনা কমবে। এ জন্য সরকার সড়ক উন্নয়নে একাধিক প্রকল্পও হাতে নিয়েছে।

এক হিসেবে দেখা যায়, গত ১৫ বছরে দেশে প্রায় দেড় লাখেরও বেশি সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এতে ৫০ হাজারের বেশি লোক প্রাণ হারায়। আহতের সংখ্যা এর চেয়েও কয়েকগুণ বেশি। সড়ক দুর্ঘটনাজনিত কারণে প্রতিবছর দেশের ক্ষতি হচ্ছে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ২ শতাংশ। নাজুক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামোগত সমস্যা, পরিকল্পনা ও নীতির দুর্বলতা, অসচেতনতা ইত্যাদি বিষয় সড়ক দুর্ঘটনা ত্বরান্বিত করছে। তাই সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কর্তৃপক্ষকে সেসব সমস্যা দূরীকরণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, এক বছরে প্রায় ২০ হাজার ছোট-বড় সড়ক দুর্ঘটনায় ৩ হাজার মানুষ নিহত হয়। আহত হয় এক লাখ। এদের বেশিরভাগই পঙ্গুত্ববরণ করে।

কারণগুলো জানা থাকলেও প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না দুর্ঘটনা। যানবাহনের অধিক এবং বেপরোয়া গতিই কেড়ে নিচ্ছে অনেকের প্রাণ। কিন্তু দোষী চালককে এজন্য তেমন কোনো শাস্তি পেতে হয় না। কারো শাস্তি হলে হরতাল ধর্মঘট ডেকে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা জিম্মিদশা সৃষ্টি করে। সত্যি বলতে কি নানাভাবেই পরিবহন সেক্টরের কাছে মানুষজন জিম্মি। এই দশা যে কবে কাটবে সেটাই এখন দেখার বিষয়।

সুষ্ঠু ও নির্বিঘ্ন যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিতের জন্য সমন্বিত ও আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা জরুরি। দুর্ঘটনা রোধে চালক ও পথচারীদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। যানবাহনের উচ্চগতি দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে হবে। দোষী ব্যক্তির শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। জেব্রা ক্রসিং ও ফুটওভার ব্রিজ ছাড়া রাস্তা পারাপার বন্ধ করতে হবে। যথাযথ পরীক্ষা ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়া যাবে না। ফুটপাথগুলো দখলমুক্ত করে পথচারী চলার উপযোগী করতে হবে। তুলে দিতে হবে মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন। রাস্তা চলাচলে আইন অমান্যের জন্য আরও কঠিন শাস্তি ও জরিমানা আদায় করতে হবে। তাছাড়া রাস্তায় যেখানে সেখানে গাড়ি পার্কিং, ফুটপাথ দখল করে ব্যবসাবাণিজ্য পরিচালনা, একই রাস্তায় নছিমন-করিমনসহ বিভিন্ন গতির যানবাহন চলাচল, অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালক, মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি, চালকের মাদকাসক্তি ইত্যাদি কারণে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। কর্তৃপক্ষের সুষ্ঠু ও সমন্বিত পদক্ষেপে দেশ দুর্ঘটনামুক্ত হবে এ প্রত্যাশা সকলের। দেশের মানুষ সড়কে নিরাপত্তা চায়। তারা এ ধরনের করুণ মৃত্যু ও কান্না আর দেখতে চায় না।

এইচআর/এমএস

‘সারা বিশ্বে বছরে ১৩ লাখ মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে। এর ৯০ শতাংশই হচ্ছে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধির কারণে বিশ্বব্যাপী মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি লোকসান হচ্ছে। ফলে সড়ক নিরাপত্তার বিষয়ে কিছু করার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।’