ক্লাব সংস্কৃতির ওপর ক্যাসিনোর ছাপ!

অঘোর মন্ডল
অঘোর মন্ডল অঘোর মন্ডল , এডিটর, দীপ্ত টিভি
প্রকাশিত: ১০:০০ এএম, ০৬ অক্টোবর ২০১৯

ক্যাসিনোকাণ্ড বাংলাদেশের ক্লাব সংস্কৃতিতে কী প্রভাব ফেলল? প্রশ্নটা ঘুরপাক খাচ্ছে ক্রীড়াঙ্গনে। তবে তার উত্তর খুঁজতে হবে আরও বড় ক্যানভাসে। শুধু ক্রীড়াঙ্গন নয়, বঙ্গসমাজের সঙ্গে বেমানান ভয়ঙ্কর নেতিবাচক একটা দিক উন্মোচিত হলো ক্যাসিনোকাণ্ডে। রাজনৈতিক পরিচয় ভাঙিয়ে অনৈতিক কতরকম কর্মকাণ্ড চলছে তার ছোট একটা উদাহরণ, বিভিন্ন ক্লাবে অভিযানের ফল ক্যাসিনোর সরঞ্জামাদি জব্দ। তবে ক্যাসিনো শুধু ক্রীড়া-ক্লাবে নয়, অনলাইনেও চলছে। সেটা অভিজাত এলাকায়। একদিন, দুদিন, এক বছর, দুই বছর ধরে চলছে তাও নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অজান্তে এগুলো এতদিন ধরে চলছে এটা অবিশ্বাস্য! তবে দায়টা ঢালাওভাবে শুধু প্রশাসন আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর চাপালে অন্যায় হবে। এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে কেউ না কেউ আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছেন। তা না হলে থানা-পুলিশ থেকে ঢিলছোড়া দূরত্বে এগুলো পরিচালিত হতে পারত না।

ক্রীড়ামন্ত্রী বলছেন, তারা ক্লাবগুলোর ওপর নজরদারি করার ক্ষমতা চায়। এতদিন খবরদারি করতে না পারার কারণ হিসেবে বলেছেন- অধিকাংশ ক্লাব লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে তালিকাভুক্ত। তাদের অনেক কমর্কাণ্ডের অনুমোদন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দিয়ে থাকে। লিমিটেড কোম্পানি, ভালো কথা। কিন্তু এর পরিচালক করা? ওই কোম্পানির উদ্যোক্তা হিসেবে কাদের নাম আছে? তাদের আয়ের উৎস কী? তারা কি নিজেদের আয়-সম্পদের ঠিকঠাক হিসাব দিয়েছেন? কিংবা তাদের সেই সম্পদ কতটা বৈধ আর কতটা অবৈধ সেটাও পরিষ্কার হওয়া দরকার। যেসব ক্লাব লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে নথিভুক্ত তারা কেন জুয়া খেলার লাইসেন্স পাবে? জুয়া কি বাংলাদেশে কোনো বৈধ ব্যবসা! নিশ্চয়ই না। ক্লাবপাড়ায় কি শুধুই ক্যাসিনো বা জুয়া খেলা হতো, নাকি সেখানে বিনা লাইসেন্সে দেশি-বিদেশি মদ কেনাবেচাও হতো। পত্রপত্রিকায় ক্যাসিনোর পাশাপাশি আরও অনেক খবর বের হচ্ছে। তবে সেসবের সত্য-মিথ্যাও যাচাই-বাছাই হওয়া দরকার।

ক্রীড়াসংস্কৃতির ওপর ক্যাসিনোকাণ্ড রীতিমতো কালির ছাপ ফেলেছে। তা মুছতে হলে যে সার্ফ এক্সেল দরকার সেটা সরকারকেই প্রয়োগ করতে হবে। না হলে সেই দাগ মুছবে না। আপাতত কিছুদিনের জন্য ঢেকে রাখা যেতে পারে। ধীরে ধীরে আবার সেটা দৃশ্যমান হবে। যা আরও ভয়ঙ্কর হতে পারে।

ক্যাসিনোকাণ্ডে ক্লাবগুলোতে অভিযান চালানো হয়েছে। যাকে আমরা বলছি শুদ্ধি অভিযান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শুভ উদ্যোগেই এই অভিযান। আসলে এটা ক্লাবপাড়ার শুদ্ধি অভিযান ঠিক তা নয়। এটা সমাজকে কলুষমুক্ত করার অভিযান। শাসকদলকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ মুক্ত করার অভিযান। আরও মোটাদাগে বললে বলতে হবে রাষ্ট্র-সমাজ-প্রশাসন-দল সব জায়গায় যে দুর্বৃত্তায়ন হয়েছে, সেগুলো থেকে মানুষকে একটা স্বস্তির জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্যই প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগ। যা খানিকটা দুঃসাহসিক। তবে অবশ্যই প্রশংসিত। বঙ্গবন্ধুকন্যার কাঁধেই দায়িত্ব বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বির্নিমাণের। সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সময় রাজনৈতিক কারণে তাকে অনেক কিছু ছাড় দিতে হয়েছে। কিংবা তিনি বাধ্য হয়েছেন ছাড় দিতে। কিন্তু আর কত? দল আর তার নাম ভাঙিয়ে, বঙ্গবন্ধুর ‘মুজিব কোট’ গায়ে জড়িয়ে কিংবা বঙ্গবন্ধুর ছবির ছাপমারা টি-শার্ট পরে সমাজে যারা ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছেন, তারা আর যাই হোক বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী নন। শেখ হাসিনার শুভাকাঙ্ক্ষী নন। তারা দল, রাষ্ট্র, সমাজের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। এদের ছাড় দিলে আরও ভয়াঙ্কর হয়ে উঠবে। দল, দেশ, দেশের সম্পদ সবকিছু গিলে খেয়ে ফেলবে।

আজ যারা বঙ্গবন্ধু পরিবারের নাম ভাঙিয়ে বিভিন্ন ক্লাব, সংগঠন, সংস্থায় ঢুকে পড়ছেন, তারা কি সত্যিই বঙ্গবন্ধুর রেখে যাওয়া বাংলাদেশের জন্য কিছু করছেন, নাকি নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন? ক্রীড়াঙ্গনে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সম্পর্ক বঙ্গবন্ধুরও আগে থেকে। তার বাবা একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়েও অসম্ভব ক্রীড়াপ্রেমী ছিলেন। সেটা বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়লেই জানা যায়। বঙ্গবন্ধু নিজে ছিলেন ক্রীড়াপ্রেমী এবং ক্রীড়াসেবী। ঢাকা ওয়ান্ডার্রাস ক্লাবের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তিনি। আর শেখ কামাল বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসের সূচনাপর্বের নায়ক। আবাহনীর মতো ক্লাব প্রতিষ্ঠা করতে তাকে ক্যাসিনা চালাতে হয়নি। আবাহনীর মধ্য দিয়ে তিনি এদেশের ক্রীড়াঙ্গনে আধুনিকতার ছোঁয়া দিয়েছিলেন। ক্রীড়াঙ্গনের মানুষকে আধুনিকমনস্ক করে গড়ে তুলেছিলেন। আজকের প্রধানমন্ত্রীর ক্রীড়াপ্রেম নিয়ে কথা বলা মানে- তাকে ছোট করা। কিন্তু তার সময়ে ক্রীড়াঙ্গনকে যারা কলুষিত করলেন এবং যাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে করলেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে না পারলে প্রধানমন্ত্রীর অনেক অর্জন ব্যর্থ হয়ে যাবে। ক্ষতি হবে ক্রীড়াঙ্গনের, সমাজের। তার নিজের দলের। আর এদেশের সাধারণ মানুষের। যা ছোট করে বললে বলতে হবে; সেই ক্ষতি হবে ‘অপূরণীয়’। ‘মুজিব বর্ষ’ শুরুর আগে ক্রীড়াঙ্গনকে কলুষমুক্ত করার উদ্যোগটা সরকারকেই নিতে হবে এবং সেটা এখনই।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

এইচআর/বিএ/এমকেএইচ

ক্যাসিনো শুধু ক্রীড়া-ক্লাবে নয়, অনলাইনেও চলছে। সেটা অভিজাত এলাকায়। একদিন, দুইদিন, এক বছর, দুই বছর ধরে চলছে তাও নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অজান্তে এগুলো এতদিন ধরে চলছে এটা অবিশ্বাস্য!