আবরার হত্যা, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও ক্ষয়িষ্ণু মানবিকতা

মিলি সাহা
মিলি সাহা মিলি সাহা
প্রকাশিত: ০১:০০ পিএম, ১০ অক্টোবর ২০১৯

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)এর ইলেক্ট্রিকেল এন্ড ইলেক্ট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ও শেরেবাংলা হলের ১০১১ রুমের বাসিন্দা আবরার হত্যার চতুর্থ দিন পেরোলো। এই হলের ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নেতারা তাদের এক সহপাঠীকে শিবির সন্দেহে অন্যায় ভাবে টানা ছয়ঘন্টা দফায় দফায় কক্ষ পরিবর্তন করে ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর ও অমানবিক নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করেছেন; হ্যাঁ, আবরার ফাহাদকে সুস্পষ্ট ও পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। কারো অত্যাচারে আবরারের মৃত্যু হয়েছে- এটি সর্বৈব মিথ্যা। কেননা, যে গ্রুপটি এই হত্যাযজ্ঞ পরিচালনা করেছে, তারা একই রুমে প্রায় প্রতি রাতে এরকম নির্যাতনের মহড়া দেন; সেদিন ছিল আবরারের পালা।

তাই বলে আবরারের মৃত্যু অনাকাঙ্খিত নয়। যারা বাইরে ক্ষত না করে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের মাধ্যমে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ভিক্টিমকে মারতে পারেন তাদের অন্ততঃ অজানা থাকার কথা নয় কতক্ষন মারলে ছেলেটি প্রাণ হারাবে। এরা হয় পেশাদার খুনি, অথবা সেরকম কারো আজ্ঞাবহ। ভিডিও ফুটেজে এসব ছেলেদের শারীরিক ভাষাই বলে দেয় নির্যাতন তাদের কাছে অন্যান্য সব কাজের মতোই সাধারণ। ছাত্রলীগে থেকে আওয়ামী রাজনীতি করে কি করে তারা কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ও সরকারের নাকের ডগায় বসে এতো দিন-বছর ধরে এই অমানবিক অনুশীলন চালিয়ে যাচ্ছে, সেটি একটি বড় আশ্চর্যের বিষয়! তারা কি সত্যিই ছাত্র? প্রধানমন্ত্রী যেখানে যুবলীগে নির্বিচারে শুদ্ধি অভিযান করছেন, সেখানে বুয়েটের মতো স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগ সাতটি টর্চার সেল খুলে ছাত্রদের নিয়মিত অত্যাচার করে যাচ্ছে বিনা উস্কানিতে - এটি রীতিমতো অবিশ্বাস্য। তাহলে কি আবরার ফাহাদ মরে না গেলে এভাবেই চলতো বুয়েট বা অন্যান্য ছাত্রলীগ শাখা? প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ প্রতিটি ইউনিটে রাজনৈতিক সন্ত্রাস নির্মূলে এই ধরণের টর্চার সেল অনুসন্ধানের নির্দেশ দেয়ার জন্য।

কয়েকটি সংবাদ সূত্র ছাড়াও গতকালের সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী আবরার খুনের সাথে জড়িত শেরেবাংলা হলের ছাত্রলীগ নেতৃত্ব ও বুয়েটে চলমান আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট ছাত্রদের মধ্যে অনুপ্রবেশকারী থাকতে পারে বলে যে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, সে ক্ষেত্রেও কি ছাত্রলীগ বা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ দায় এড়াতে পারেন? টানা দশ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন শাখায় অনুপ্রবেশকারী থাকাও যেমন স্বাভাবিক, তেমনি নিষিদ্ধ মৌলবাদী দলগুলির কর্মীদের আওয়ামী লীগে পুনর্বাসনের চেষ্টা প্রতিহত করার প্রস্তুতিও দলটির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের থাকা উচিত ছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অধিকাংশ নেতৃবৃন্দই বিভিন্ন ব্যক্তিস্বার্থে দলীয় আদর্শের বিরুদ্ধমতের অনেক নেতাকর্মীকে দলে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। যদিও এই খুনের ঘটনায় অনুপ্রবেশের কোনো অজুহাতই সাধারণ জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না যতক্ষণ না সেটি প্রকাশ্যে প্রমাণিত হয়। মন্দের ভালো এই অজুহাতে অন্যকোনো নেতৃবৃন্দ বেফাঁস মন্ত্যব্য করে জল ঘোলা করার আগেই প্রধানমন্ত্রী এটির দায়িত্ব নিয়েছেন। ফাহাদের মৃত্যুর পর জামায়াতে ইসলামিসহ মৌলবাদী দলগুলির প্রতিবাদের তৎপরতা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিথ্যা ছবি দিয়ে অপপ্রচার এবং ফেসবুকে শহীদমিনারে 'নারায়ে তাক্বদীর' স্লোগান শুনতে চাওয়ার আগ্রহ থেকে ছেলেটির সেই দলগুলির সাথে সংশ্লিষ্টতা বেশ পরিষ্কার।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে ছেলেটির ২০,০০০ এর বেশি ফলোয়ার থাকে সে কি শুধুই একজন মেধাবী ছাত্র? যতটা মেধার সাক্ষর আবরার বুয়েটে ভর্তির আগে রেখেছে, তা কি পরবর্তীতে ধরে রাখতে পেরেছিলো? তার ৩.৪ সিজিপিএ কি তা বলে? অস্বীকার করার উপায় নেই এই মৃত্যুকে ঘিরে বুয়েটের অন্যান্য ছাত্রদের যে প্রতিক্রিয়া তাতে এইটুকু পরিষ্কার যে বুয়েট ছাত্রলীগের অনেক নেতা-কর্মীই অনেক শিক্ষার্থীকে 'শিবির' সন্দেহে বা জোর করে 'শিবির' বানিয়ে নির্যাতন করেছেন। তাহলে কি ছাত্রলীগের হাইকমান্ড সংগঠনটির নেতা-কর্মীদের শিবির খুঁজে বের করে শাস্তি দেয়ার মতো কোনো নির্দেশনা দিয়ে রেখেছেন? যদিও একসময় ছাত্রলীগের অসংখ্য নেতা-কর্মী শিবির কর্মীদের হাতে নির্মম ভাবে খুন হয়েছেন, তবুও কি এমন কোনো আদেশ দেয়া বৈধ বলে বিবেচ্য হবে?

তাছাড়া, ঠিক যে সময়টিতে আওয়ামী লীগ নিজ দল ও সরকারের মধ্যে দুর্নীতি বিরোধী অভিযান চালিয়ে জনগণের আস্থা অর্জন করছে ঠিক সেই সময়ে শুধু মাত্র সন্দেহ বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব থাকার কারণে কাউকে হত্যা করার প্রয়োজন রয়েছে কি? আর যদি সে আদেশটি দেয়া না হয়ে থাকে, তাহলে এই অতি উৎসাহী নেতাকর্মীদেরই কি প্রধানমন্ত্রী অনুপ্রবেশকারী বলছেন যারা প্রকারান্তরে সরকারকে পদে পদে বিপদে ফেলছে? রাসেল, মেহেদী ও জিয়নের শিবিরের সাথে এবং মুন্নার পরিবারের বিএনপি রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্টতার তথ্য অবহেলা করার সুযোগ নেই। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফায় আবরারকে মারা হয়েছে মূলতঃ মুন্নার কক্ষে (২০০৫) যেখানে ফাহাদ মারা যায়। আবরার কি তাহলে রাজনীতির লাশ? একারণেই কি শিবিরের ওয়েব পেইজ গুলো তাকে ভারত বিরোধী আন্দোলনের প্রথম শহীদ বলে আখ্যায়িত করছে?

সবচে' হতাশার যে চিত্রটি এই মৃত্যুর ঘটনায় ফুটে উঠেছে তা হলো শিক্ষার্থীদের অধিকার ও নিরাপত্তা বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় হলগুলির প্রশাসনের উদাসীনতা ও অবহেলা; হয়তো এটি তাদের রাজনৈতিক পরিচয় ও ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের সাথে আপোসের প্রতিফলন। কি ভয়ঙ্কর নিরাপত্তাহীনতা বুয়েটের এই হলটিতে! ছাত্র নেতারা পিটিয়ে খুন করা লাশ নিয়ে প্রকাশ্যে ছাত্রাবাসের অভিভাবককে এটা-সেটা বোঝাচ্ছেন! একবিন্দু ভয় নেই তাদের চোখে মুখে! যেসব শিক্ষকদের রীতিমতো ছাত্র নেতাদের সাথে সমঝোতা করে চলতে হয়, তারা কি করে পারবেন বাকি ছাত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে? কিছুদিন আগে একটি লেখায় আমি ঠিক এই বিষয়টিই উল্লেখ করেছিলাম, রাজনৈতিক শিক্ষকদের পক্ষে কখনোই ছাত্র-অধিকার সমভাবে নিশ্চিত সম্ভব নয়। দুর্ভাগ্যক্রমে আবরার হত্যার ভিডিও ফুটেজে হল প্রশাসনের সেই দুর্বলতা ও বৈষম্যের চিত্রটি যত ভয়াবহ ভাবে প্রকাশিত হয়েছে তাতে কি এই দেশের অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলিতে পাঠানোর আগে নিরাপত্তা নিয়ে দু'বার ভাববেন না? উপরন্তু, এমন একটি নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর ক্যাম্পাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ সর্বোচ্চ অভিভাবক উপাচার্যের দীর্ঘ অনুপস্হিতিই বলে দেয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা খুব কম সংখ্যক শিক্ষকই তাদের কর্তব্য সঠিক ভাবে পালন করছেন বা করতে পারছেন। আশার কথা, বুয়েটে দ্বিতীয় বারের মতো শিক্ষক রাজনীতি বন্ধের ঘোষণায় ঢাকাসহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস গুলিতেও সাধারণ ছাত্রদের অধিকার ও নিরাপত্তার বিষয়টি আমলে নেয়া হচ্ছে।

রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দিক দু'টি বাদেও আবরারের মৃত্যুর ঘটনায় শেরেবাংলা হলের ছাত্রদের, বিশেষ করে যেসব ছাত্ররা তার বন্ধু বা রুমমেট ছিল; যারা নির্যাতনের পুরো সময়টায় বলতে গেলে নিষ্ক্রিয় থেকেছে, তাদের মানবিক সচেতনতার জায়গাটি আমার কাছে ভীষণ রকম প্রশ্নবিদ্ধ।যখন তারা জানে এই দলটি ছেলেদেরকে নিয়মিতই নির্যাতন করে, আবরারকে ফোন ও ল্যাপটপসহ নিয়ে গেছে, ছয়টি ঘন্টা ছেলেটি রুমে ফেরেনি; দু'দফায় ওর কাপড় নিতে এসেছে; তখনও কি ওদের কারো মনে হয়নি ছেলেটির সাথে কি হচ্ছে তা জানতে? একবারও মনে হয়নি হল প্রশাসন বা অভিভাবক কাউকে জানাতে হবে?

আবরার খুনের পর যেসব ছাত্ররা বিভিন্ন সময়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তাদের অনেকেই বুয়েটিয়ানদের এই স্বার্থপরতা বা উদাসীনতার কথা উল্লেখ করেছে হতাশার সুরে। তাহলে কি আমরা বিজ্ঞান শিক্ষাকে সমাজের জন্য যথেষ্ঠই মানবিক করে তুলতে ব্যর্থ হয়েছি? নাকি সামগ্রিক ভাবে শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের জায়গাটুকু অবহেলিত হচ্ছে? একেবারে নিজের নিরাপত্তার হুমকি না হওয়া অব্দি কি এরা অন্যের বিপদে হাত বাড়াবে না? এই সমস্যাটুকু নিয়েও কি আমাদের ভাবার সময় আসেনি?

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

এইচআর/জেআইএম

আবরার খুনের পর যেসব ছাত্ররা বিভিন্ন সময়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তাদের অনেকেই বুয়েটিয়ানদের এই স্বার্থপরতা বা উদাসীনতার কথা উল্লেখ করেছে হতাশার সুরে। তাহলে কি আমরা বিজ্ঞান শিক্ষাকে সমাজের জন্য যথেষ্ঠই মানবিক করে তুলতে ব্যর্থ হয়েছি? নাকি সামগ্রিক ভাবে শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের জায়গাটুকু অবহেলিত হচ্ছে? একেবারে নিজের নিরাপত্তার হুমকি না হওয়া অব্দি কি এরা অন্যের বিপদে হাত বাড়াবে না? এই সমস্যাটুকু নিয়েও কি আমাদের ভাবার সময় আসেনি?