আবরারকে ‘জঙ্গি নিবরাস’ বানাবেন না তসলিমা নাসরিন

জব্বার হোসেন
জব্বার হোসেন জব্বার হোসেন , সাংবাদিক, কলামিস্ট
প্রকাশিত: ১২:২৩ পিএম, ১২ অক্টোবর ২০১৯

সবচেয়ে সস্তা, নিন্মমানের রুচিহীন সহজতম কাজ সম্ভবত অন্যের চরিত্রহনন। তাও সেটি যদি হয় যে মানুষটি নেই, যে মানুষটি মৃত তার সম্পর্কে। বেঁচে না থাকা মানুষ সম্পর্কে যেকোনো মন্তব্য করে ফেলা সবচেয়ে সহজ এবং দায়িত্বহীন একটি কর্ম। কর্ম বলবার চেয়ে এটিকে অপকর্ম বলা ভালো।

খ্যাতিমান লেখিকা তসলিমা নাসরিন এই অপকর্মটি করেছেন। অসভ্যতা করেছেন। শুধু অসভ্যতা বলছি কেন, আবরার’কে নিয়ে তার ফেসবুক স্ট্যাটাস, মন্তব্য যারপরনাই অশ্লীলও। শুধু আবরার নয়, চিকিৎসক মোস্তফা মোর্শেদ আকাশের আত্মহত্যার পরও তিনি তার চরিত্রহনন করেছিলেন অযৌক্তিকভাবে, অন্যায়ভাবে। বলেছিলেন, স্ত্রীকে হত্যা না করতে পেরে আকাশ আত্মহত্যা করেছে। স্ত্রীর পরকীয়া, যৌন অযাচার মেনে নেওয়া পক্ষে তাবৎ অযৌক্তিক যুক্তি দাঁড় করাবার চেষ্টা করেছিলেন।

আকাশের স্ত্রীর বহুগামীতা, লাম্পট্যকে প্রশ্রয় দিতে গিয়ে পুরুষতান্ত্রিকতাকে উস্কে দিয়েছিলেন সেদিন। আর আজ, সারাদেশ যখন বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরারের হত্যাকাণ্ডকে শোকে মূহ্যমান, তখন তসলিমা তাকে নিয়ে নিজের মনগড়া, যাচ্ছেতাই মন্তব্য করেছেন। যা রীতিমত অশ্লীল। আবরারকে শিবির, জঙ্গি, জামায়াত বানানোর অপচেষ্টা তিনি কোন মাত্রায় কম করেননি। তাহলে যে খুনিরা, সন্ত্রাসীরা, হত্যাকারীরা অন্যকে শিবির-জামায়াত বানিয়ে হত্যা জাস্টিফাইকরতে চায়, তাদের সঙ্গে তসলিমার পার্থক্য কি? যে তসলিমা দীর্ঘকাল ভিন্নমত, ভিন্নচিন্তার জন্য সংগ্রাম করেছেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছেন, নিজের চরিত্রহননের বিরুদ্ধে নিজেই যিনি প্রতিবাদ; কী করে পারেন সেই তসলিমা অন্যের সম্পর্কে অমন অপপ্রচার করতে? চরিত্রহনন করতে? নাকি বার্ধক্য এলে অনেক মেধাবী, যুক্তিপ্রবণ মানুষও এলোমেলো হয়ে যায়- সেটিই সত্যি!

তসলিমা লিখেছেন, ‘মেধাবী হওয়াটা নিশ্চয়ই গুণ কিন্তু ২১ বছর বয়সে ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়াটাতো গুণ নয়, বরং দোষ’। তসলিমা তার অনেক লেখাতেই বলেছেন, লোকে তাকে এন্টি-ইসলামিস্ট বলে লেভেলিং করে। কিন্তু তিনি তা নন। কথা হচ্ছে, তিনি নামাজ পড়াকে, স্রষ্টার প্রতি প্রার্থনাকে ‘দোষ’ বলবেন আর বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠি তাকে ভালোবেসে ফুলের মালা দেবে অমন ভাবাটাতো স্বাভাবিকও নয়।

বিশ্বাস যার যার। ধর্ম পালন প্রতিটি মানুষের অধিকার। অন্যের ধর্ম পালনকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করা, ঠাট্টা তামাশা করা নেহাত ইতরামি, ফাতরামি, ছোটলোকি ছাড়া আর কিছু নয়। কোন মহৎ মহান মানুষ অন্যের ধর্ম চর্চা নিয়ে, স্রষ্টার প্রতি ভক্তি নিয়ে, নিবেদন নিয়ে তামাশা করতে পারে না। কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করতে পারে না। সে যে-ই হোক। সে অনাধুনিক। আধুনিকতা মানেতো অন্যের অধিকার নষ্ট করা নয়। শুধু ইসলামের গীবত করা নয়। বিশাল জনগোষ্ঠির মানুষকে অসম্মান করা নয়।

কেউ বিশ্বাস বা অবিশ্বাস করতে চাইলে সেটি তার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। চিকিৎসক, মনোবিজ্ঞানী আর বিজ্ঞানী কিন্তু এক নয়। তসলিমা কি করে জানেন, আবরার বিজ্ঞানমনস্ক ছিলেন কি ছিলেন না? দুনিয়ার অনেক বড় বড় বিজ্ঞানীতো তাদের নিজেদের মত করে ধর্মচর্চা করেছেন। তাই বলে কি তারা অবিজ্ঞানী হয়ে গেছেন। বিজ্ঞানমনস্কতা মানেই নাস্তিকতা একথা কে বলেছে? বিশ্বাস আরযুক্তি এ দু’টোকে কেন এক করে মেলাতে হবে? তসলিমার সবচেয়ে জঘন্য অপরাধটি হলো, তিনি আবরারকে নিবরাস ইসলাম বানিয়ে ফেলেছেন। জোড় করে কেন আবরারকে নিবরাস বানাতে হবে? নিবরাসতো জঙ্গি ছিল। সন্ত্রাসী ছিল। ধার্মিক ছিল না ধর্মান্ধ ছিল। ধর্মীয় মৌলবাদী ছিল। মানুষকে হত্যা করে ভুল ইসলামের মতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল।

আবরারতো তার কিছুই করেনি। কাউকে খুন-হত্যা করতে যায়নি। সন্ত্রাসী ছিল না, ধর্মীয় জঙ্গিও না। আবরারের সঙ্গে নিবরাসের তুলনা দেওয়া তাহলে অসভ্যতা ছাড়া আর কি? তিনি আরও বলেছেন, ‘আবরারকে যারা পিটিয়েছিল, আমার বিশ্বাস, মেরে ফেলার উদ্দেশে পেটায়নি। কিন্তু মাথায় আঘাত লেগেছে, মরে গেছে’। কী করে জানেন তিনি, তার কি কথা হয়েছে হত্যাকারীদের সঙ্গে হত্যার পূর্বে? তা নয় তো খুনিদের সমর্থনে তার অমন ‘বিশ্বাস’ই বা কেন?

আমরা লেখক হতে চাই, শিল্পী হতে চাই, শিক্ষক হতে চাই, বুদ্ধিজীবী হতে চাই। আলোচনায় থাকতে চাই, চাই আলোচিত হতে। নীতি নৈতিকতা, বোধ-বিবেচনা, মনুষ্যত্ব সকল কিছু বিসর্জন দিয়ে হলেও। মনে রাখতে হবে, জীবনের চেয়ে বড় কিছু নেই। নেই মানুষের চেয়ে বড় কিছু। যে মানুষটি নেই, যে মানুষটি আর আসবে না কোনও দিন তাকে নিয়ে মন্তব্য করবার আগে শুধু ‘তসলিমা’ নন, একটি বারের জন্য হলেও যেন ভাবি, আমি আপনি সকলেই। নয়তো যত খ্যাতিমানই হই না কেন, মানুষ হিসেবে আমরা খুব নিন্ম।

লেখক : সম্পাদক, আজ সারাবেলা। ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, মিডিয়াওয়াচ। পরিচালক, বাংলাদেশ সেন্টার ফর ডেভলপমেন্ট জার্নালিজম অ্যান্ড কমিউনিকেশন। সদস্য, ফেমিনিস্ট ডটকম, যুক্তরাষ্ট্র।

এইচআর/এমএস

‘শুধু আবরার নয়, চিকিৎসক মোস্তফা মোর্শেদ আকাশের আত্মহত্যার পরও তিনি তার চরিত্রহনন করেছিলেন অযৌক্তিকভাবে, অন্যায়ভাবে। বলেছিলেন, স্ত্রীকে হত্যা না করতে পেরে আকাশ আত্মহত্যা করেছে। স্ত্রীর পরকীয়া, যৌন অযাচার মেনে নেওয়া পক্ষে তাবৎ অযৌক্তিক যুক্তি দাঁড় করাবার চেষ্টা করেছিলেন।’