কবে শুনবো মন ভালো করা দাবি?

রুমানা রাখি
রুমানা রাখি রুমানা রাখি
প্রকাশিত: ০৫:৩৭ পিএম, ১৪ অক্টোবর ২০১৯

জাস্টিস ফর নুসরাত, নিরাপদ সড়ক চাই, নয়ন বন্ডের ফাঁসি চাই, শাস্তির মাধ্যমে ধর্ষকের সংশোধন নয়, বিনাশ চাই, আবরারের মৃত্যুর বিচার চাই। শেষ ছয় মাসে টিভি বা পত্রিকার পাতায় এমন সব দাবি নিয়ে রাস্তায় প্ল্যাকার্ড হাতে প্রতিবাদ করতে দেখেছি আমরা। কোন মৃত্যু বা দুর্ঘটনার পর দাবি আদায়ের এসব স্লোগানের সাথে আমাদের নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মতো কিছু নেই।

বেতন-ভাতা বৃদ্ধি চাই, নিবন্ধন চাই, সরকারীকরণ করার নির্দেশ চাই, চাকরির বয়স বৃদ্ধি চাই। এমন সব চাই আর চাইয়ের দাবি নিয়েও স্লোগানে মুখরিত থাকে ঢাকার প্রেস ক্লাবের সামনের রাস্তা। সপ্তাহের এমন কোনো দিন খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে প্রেস ক্লাবের সামনের রাস্তায় দাবি আদায়ের জন্য মানুষ দাঁড়ায় না।

আমরা জানি, দাবি আদায়ের একটি মাধ্যম স্লোগান, যা শুধু একটি ধারণা বা উদ্দেশ্য। রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক, ধর্মীয় এবং অন্যান্য প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত একটি নীতিবাক্য বা শব্দগুচ্ছই হচ্ছে দাবি। কিন্তু আমাদের কি মনে আছে কবে আমরা মন ভালো করা কোন দাবির কথা শুনেছি। আমার মতো হয়তো বেশির ভাগ মানুষের কাছেই এই প্রশ্নের কোনো উত্তর জানা নেই।

আমরা বাঙালিরা হয়তো ভুলেই গেছি ভালো কোনো দাবি আদায়, নতুন কিছু শুরু করার কিংবা কোনো পরিবর্তনের জন্য মানুষ রাস্তায় দাঁড়াতে পারে। কিছু দিন আগে কিশোরী গ্রেটা থুনবার্র্গের বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তন রুখতে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়ানোর গল্প আমাদের সবার জানা। ক্লাস নাইনের মেয়ে হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে তাতে (সুইডিশ ভাষায়) ‘পরিবেশের জন্য স্কুল স্ট্রাইক’ লিখে দেশের সংসদের সামনে একা বসে পড়ল, সে বড় সহজ কথা নয়। স্বাভাবিক তো নয়ই।

এবারের জাতিসংঘ সম্মেলনে গ্রেটা থুনবার্গ ছিল অন্যতম আলোচিত চরিত্র। তবে এটাও ঠিক যে, প্রথম থেকেই সুইডিশ এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়ার অভাবনীয় মনোযোগ পেয়েছে গ্রেটা। তার এই দাবিতে সম্মতি জানিয়েছে পুরো বিশ্ব। অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছিল বিশ্বের নামকরা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে বিশ্বে সব নামকরা এক্টিভিস্টরা। দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে সচেতন সাধারণ মানুষদের।

সবার মতো আমিও অবাক হয়ে দেখেছি, কীভাবে একটি কিশোরী মেয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে তার সচেতনতা দিয়ে। এমন দৃশ্য দেখে নিজের মধ্যেই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, আজকের বাংলাদেশে একজন গ্রেট থুনবার্গ নেই, যে কিনা তার হাতের প্ল্যাকার্ডের দাবি বা স্লোগানের মধ্যে নতুন পথের আলো দেখাবে। দিনের পর দিন যে সামাজিক-রাজনৈতিক সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে আমাদের রাস্তায় দাঁড়াতে হয়, সেখানে ১৬ বছরের এই মেয়ের দাবি আমাকে ভাবায়, আমরা কবে ভালো বা নতুন কিছুর জন্য রাস্তায় দাঁড়াবো।

আমাদের মধ্যেও অনেক গ্রেটা রয়েছে। কিন্তু আমাদের এতো বড় বড় দাবির মুখে, গ্রেটারা রাস্তায় দাঁড়াতে সাহস পায় না। অনেকের হয়তো আমার কথায় দ্বিমত হতে পারে। অনেকের হয়তো মনে পরবে কিছু দিন আগে ছোট ছোট শিশুরা প্লেকার্ড হাতে দাবি আদায়ের জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে স্লোগানের দৃশ্য। যে দৃশ্য আমাদের নতুন এক বাংলাদেশকে দেখিয়েছে। কিন্তু এই ছোট শিশুরা তাদের নিরাপত্তা আদায়ের জন্য রাস্তায় নামে, যখন তাদের এক বন্ধুর মৃত্যু হয়। অনেক দুঃখ নিয়েই হয়তো ছোট শিশুরা তাদের নিরাপত্তার জন্য রাস্তায় দাঁড়ায়।

আজ হয়তো এমন কোন ভালো দাবি আদায়ের জন্য আমরা রাস্তায় নামি না। যার মধ্যে নতুন বাংলাদেশকে আমরা দেখতে পারি। এমন কোন দাবি যা আমাদের নতুন স্বপ্ন দেখায়। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাস বলে, দাবি আদায়ের জন্য স্লোগান আমাদের প্রতিনিয়ত উজ্জ্বীবিত করেছে নতুন ইতিহাস তৈরিতে। রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই, আইয়ুব খানের পতন চাই, বাংলার স্বাধীনতা চাই। আর ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের ভিত কাঁপিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিসংগ্রামের প্রবলভাবে প্রেরণা জুগিয়ে আজ আমরা স্বাধীন। বাংলাদেশের বড় বড় অর্জনের পেছনে কাজ করেছে উজ্জ্বীবিত কিছু স্লোগান।

আমরা নতুন কিছু দাবি চাই। যার পেছনে থাকবে না কোন মৃত্যুর সংবাদ। থাকবে না কোন হারানোর গল্প। আমরা একজন গ্রেটা চাই।

লেখক : সাংবাদিক, ব্রিটেন।

এইচআর/জেআইএম

আমরা বাঙালিরা হয়তো ভুলেই গিয়েছি ভালো কোন দাবি আদায়, নতুন কিছু শুরু করার কিংবা কোন পরিবর্তনের জন্য মানুষ রাস্তায় দাঁড়াতে পারে। কিছু দিন আগে কিশোরী গ্রেটা থুনবার্র্গের বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তন রুখতে প্লেকার্ড হাতে দাঁড়ানোর গল্প আমাদের সবার জানা। ক্লাস নাইনের মেয়ে হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে তাতে (সুইডিশ ভাষায়) ‘পরিবেশের জন্য স্কুল স্ট্রাইক’ লিখে দেশের সংসদের সামনে একা বসে পড়ল, সে বড় সহজ কথা নয়। স্বাভাবিক তো নয়ই।