কয়লার পর ময়লায়ও থাবা : মিলমিশে ভাগযোগ

মোস্তফা কামাল
মোস্তফা কামাল মোস্তফা কামাল , সাংবাদিক
প্রকাশিত: ১০:০৩ এএম, ১৬ অক্টোবর ২০১৯

বাকি ছিল ময়লা-আবর্জনা। বর্জ্য। সেখানেও থাবা। বিশাল অংকের কারবার। রাজধানীতে বাসাবাড়ি, হোটেল-রেস্তোরাঁ, হাসপাতালের বর্জ্যের দিকেও ক্ষমতাধরদের লোলুপ চোখ। গড়ে উঠেছে মাফিয়া চক্রও। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাসা বা ফ্ল্যাট থেকে প্রতিমাসে কিছুদিন ৫০-৬০ টাকা করে তুলতো কিছু লোক। সেটা আপসেআপ গত বছর কয়েকে এক’শ থেকে দেড়’শতে উঠেছে। কোথাও কোথাও দু’শ-তিশ’শও আদায় করা হচ্ছে। আর হোটেল প্রতি নেয়া হয় এক- দেড় হাজার থেকে পাঁচ-ছয় হাজার টাকা পর্যন্ত। রেস্টুরেন্টের মালিকেরা টাকা দিতে অনেকটা বাধ্যগত। বড় বড় অফিস থেকে দাগানো হয় আরো বেশি।

বাংলাদেশে বছরে শহরগুলোতে বর্জ্য উৎপাদনের পরিমাণ ধরা হয় ২২.৪ মিলিয়ন টন অথবা বছরে মাথাপিছু বর্জ্য উৎপাদনের পরিমাণ ১৫০ কেজি৷ ২০২৫ সাল নাগাদ প্রতিদিন বর্জ্য উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়াবে ৪৭,০৬৪ টন৷ দেশের মোট বর্জ্যের ৩৭ ভাগ উৎপাদিত হয় রাজধানী ঢাকায়৷ অথচ সেখানে বর্জ্যের কোনো পরিকল্পিত ব্যবহার নেই৷ এখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বলতে বোঝায় বর্জ্য সংগ্রহ করে তা আবর্জনার স্তূপে পাঠিয়ে দেয়া।

ময়লা কারবারীরা কারা? জবাব পরিষ্কার নয়। কোথাও বলা হচ্ছে, সিটি কর্পোরেশনের লোক। কোথাও পরিচয় দেয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরের। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিভিন্ন ভাইব্রাদারের। ময়লা টোকানোর কাজে বর্তমানে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে তিন শতাধিক প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত আছে। কিন্তু, এদের বিষয়ে কোনো নীতিমালা সিটি করপোরেশনের নেই। তাদের বাইরে বহু ব্যক্তি ও সংগঠন বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য নিচ্ছে। নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত দুই পার্টির নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাসীনদেরই কব্জায়।

নগরীর ব্যস্ত জীবনে ময়লা পার্টির পরিচয় খোঁজার সময়ই বা কই? ময়লা-আবর্জনা নিয়ে বাড়তি কথায় যেতেও চান না অনেকে। এই সুযোগে তাদের হাতে জিম্মি রাজধানীর বাড়িঅলা-ভাড়াটিয়া সবাই। এক হিসাবে জানা গেছে, ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৫ হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। কিন্তু বাসাবাড়ি বা রেস্তোরাঁ থেকে সরাসরি বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা ঢাকার একটি সিটি করপোরেশনেরও নেই। সিটি করপোরেশনের কর্মীরা রাস্তার পাশে ময়লার কনটেইনার এবং ময়লা রাখার ভাগার থেকে বর্জ্য তোলে। এর আগের পর্বে সেখানে ময়লাগুলো জড়ো করে বিভিন্ন গোষ্ঠি ও প্রতিষ্ঠান। ট্রেডিংটা সেখানেই। কোনো কোনো কাউন্সিলর ও নেতারও রয়েছে বর্জ্য সংগ্রহের প্রতিষ্ঠান।

টাকার পুরো বা সঠিক অংকটা বের করা কঠিন। এ সংক্রান্ত নির্দিষ্ট তথ্যও কারো কাছে নেই। কারণ, অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের রসিদ দেয় না তারা। অথচ ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন প্রতিবছর গৃহকরের ৩ শতাংশ নেয় পরিচ্ছন্নতা বাবদ। গত অর্থবছরে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নাগরিকদের কাছ থেকে এ বাবদ আদায় করেছে দেড়’শ কোটি টাকার বেশি। অথচ তারা বাসাবাড়ি থেকে সরাসরি বর্জ্য না নিয়ে কাজটা করাচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের নেতা–কর্মীদের তদারকিতে। যা প্রকারান্তরে লুটপাটের সুযোগ করে দেয়া। এ সুযোগে তারা ময়লার অবস্থা যা-ই হোক টাকা তোলার কাজটা আচ্ছা মতো করছে।

মাসে মাসে নেয়া টাকা কোথায় কার কাছে যায়, কে কালেকটর-সেটা জানার সুযোগ কম। জানতে আগ্রহীও কম। কোনো কোনো গণমাধ্যম বলছে, বছরে ময়লার কারবার কমছে কম সাড়ে চার’শ কোটি টাকা। দুই সিটি করপোরেশনে ৩ লাখ ৯৫ হাজার ৮৫৫টি হোল্ডিং, প্রতি হোল্ডিংয়ে ৬ থেকে ১২টি বাসা, সাত হাজারের বেশি রেস্তোরাঁ ধরলে হিসাব এমনই দাঁড়ায়। লাভজনক ব্যবসাটি বাগাতে তদ্বির, প্রভাব, খবরদারির ব্যাপার রয়েছে। এ নিয়ে মাঝেমধ্যে বিশেষ বিশেষ এলাকা দখলেও খরচপাতি হয়। টুকটাক মারামারি-মহড়াও হয়। সেটা কমে এসেছে নেতাদের মধ্যস্ততায়। ময়লার টোকাইদের মধ্যে তাই এখন বেশ মিলমিশ।বর্জ্য অপসারণের নামে ওজন জালিয়াতি করে কোটি কোটি টাকার অতিরিক্ত বিল ভাগাভাগি নিয়ে কামড়াকামড়ির খবর চাপা রাখা সম্ভব হয়েছে এ মিলমিশের সুবাদে।

বাংলাদেশ ব্যাংকে ভল্টের সোনা নয়-ছয়ের পর সামনে এসেছিল কয়লা খাওয়ার খবর। এ নিয়ে মিডিয়াগুলোতেও ছিল সরেস আলোচনা। বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির মজুদ থেকে বিশাল পরিমাণ কয়লা উধাও হয়েছে। সেটার পরে তেমন ফলো আপ হয়নি। এক লাখ ৪৪ হাজার মেট্রিক টন কয়লা কোথায় গেল-সেই জিজ্ঞাসা নেই। সব ঠিক হয়ে গেছে। কয়লাখোরদের কিছু হয়নি। সোনা-দানার তুলনায় কয়লা কিছু নয়। আর ময়লা তো কোনো বিষয়ের মধ্যেই পড়ে না। এ ছাড়া কয়লা ধুইলেও ময়লা যায় না-এমন একটা প্রবাদ রয়েছে আমাদের স্টকে। সঙ্গে মানানসই বাস্তবতাও।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন।

এইচআর/পিআর

বাংলাদেশ ব্যাংকে ভল্টের সোনা নয়-ছয়ের পর সামনে এসেছিল কয়লা খাওয়ার খবর। এ নিয়ে মিডিয়াগুলোতেও ছিল সরেস আলোচনা। বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির মজুদ থেকে বিশাল পরিমাণ কয়লা উধাও হয়েছে। সেটার পরে তেমন ফলো আপ হয়নি। এক লাখ ৪৪ হাজার মেট্রিক টন কয়লা কোথায় গেল-সেই জিজ্ঞাসা নেই। সব ঠিক হয়ে গেছে। কয়লাখোরদের কিছু হয়নি। সোনা-দানার তুলনায় কয়লা কিছু নয়। আর ময়লা তো কোনো বিষয়ের মধ্যেই পড়ে না। এ ছাড়া কয়লা ধুইলেও ময়লা যায় না-এমন একটা প্রবাদ রয়েছে আমাদের স্টকে। সঙ্গে মানানসই বাস্তবতাও