আওয়ামী লীগকে কঠিন সংকট উত্তরণ করতে হবে

আনিস আলমগীর
আনিস আলমগীর আনিস আলমগীর , সাংবাদিক ও কলামিস্ট
প্রকাশিত: ০৯:৪৪ এএম, ১৭ অক্টোবর ২০১৯

আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পুরান ঢাকার রোজ গার্ডেনে ২৩ জুন ১৯৪৯ সালে। সংগঠনের বয়স গত জুন মাসে ৭০ বছর পূর্ণ হয়েছে। বহু চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে দলটি এ পর্যন্ত এসেছে। স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়ার কারণে দলটি তৃণমূল পর্যায়ে একটা মজবুত ভিত্তি তৈরি করেছে। আওয়ামী লীগ সবসময় তার কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে গেছে। কখনো পিছিয়ে পড়েনি। কারণ এই দলের ত্যাগী কর্মীবাহিনী ছিল। আওয়ামী লীগের জন্মের আগেই ছাত্রলীগ গঠন করা হয়েছিল। ছাত্রলীগের জন্ম হয় ৪ জানুয়ারি ১৯৪৮ সাল। ছাত্রলীগও কালক্রমে দৃঢ়ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছাত্রসংগঠনরূপে আত্মপ্রকাশ করে।

মূলত স্বাধীনতাযুদ্ধ পর্যন্ত এই দুই সংগঠন ছিল জাতীয় স্বার্থের মূল ধারক-বাহক। উভয় সংগঠনের কর্মীবাহিনী এতই ত্যাগী ও কঠোর ছিল যে তারা এক হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী পাঠান-পাঞ্জাবি সেনাদের চ্যালেঞ্জ করতেও দ্বিধা করেনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় মূলনেতার অনুপস্থিতিতে তারা দীর্ঘ নয় মাসব্যাপী মুক্তিসংগ্রাম পরিচালনা করে দেশ স্বাধীন করতে সফল হয়েছিল।

কোনো অনৈক্য ছিল না সংগঠনে। ১৯৫৭ সালে দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী দলত্যাগ করে নতুন দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন করেছিলেন। বহু নেতা ভাসানীর সঙ্গে দল ত্যাগ করে চলে গিয়েছিলেন কিন্তু আওয়ামী লীগকে বিপর্যস্ত করতে পারেননি। ১৯৬৬ সালে ইডেন কাউন্সিলে ছয়-দফা প্রস্তাব পাস হয়েছিল। তারপর তো স্বাধীনতাযুদ্ধের পটভূমি তৈরিতে কর্মীবাহিনী ব্যস্ত হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর তারা একটা রক্তক্ষয়ীযুদ্ধ পরিচালনা করে দেশ স্বাধীন করে ফেলে।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু এবং তার মুখ্য চার নেতাকে হত্যা করা হয়। অনেকে মনে করেছিলেন আওয়ামী লীগ সম্ভবত শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু ১৯৭৯ সালের আওয়ামী লীগ ঘুরে দাঁড়ায়। ১৯৯৬ সালের পর দল এখনও পর্যন্ত সর্বমোট ১৬ বছর রাষ্ট্রক্ষমতায়। অথচ এর আগে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দল ক্ষমতায় ছিল মাত্র তিন বছর আট মাস।

বাইর থেকে দেখতে মজবুত মনে হলেও দীর্ঘ একটানা ক্ষমতায় থাকার পর দেখা যাচ্ছে দল নড়েবড়ে ভিত্তির ওপর অবস্থান করছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো দলীয় প্রতীকে করার ফলে স্থানীয় পর্যায়ে দল হয়ে পড়েছে এমপি বা বড় নেতাদের পকেট সংগঠন। সর্বত্র নেতাকর্মীরা আখের গোছাতে ব্যস্ত। ত্যাগী নেতারা কোণঠাসা। নেতৃত্বের ব্যাপক পরিবর্তন না আনলে দলটির সুনামের সঙ্গে টিকে থাকা এখন মুশকিল হবে। অবশ্য দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা সবকিছু উপলব্ধি করে দল পুনর্গঠনের জন্য মূল দল এবং অঙ্গসংগঠনগুলোর সম্মেলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

আওয়ামী লীগের পাঁচ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। সংগঠনগুলো হচ্ছে- কৃষক লীগ, জাতীয় শ্রমিক লীগ, জাতীয় মহিলা শ্রমিক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও যুবলীগ। আগামী নভেম্বর মাসে এসব সংগঠনের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। মূল দল এবং সহযোগী সংগঠনগুলোর সম্মেলনের মধ্য দিয়ে নতুন নেতৃত্ব আসবে। তবে কমিটি ঢেলে সাজানোর খুব কষ্টকর হবে। কারণ এখনও যারা নেতৃত্বে আছেন তাদের অনেকেই দুর্নীতিগ্রস্ত।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তার পরিবার বলতে তিনি নিজে, তার ছেলে-মেয়ে এবং তার বোন শেখ রেহানা ও তার ছেলে-মেয়ে। এর বাইরে তার পরিবারের আর কেউ নেই। শেখ সেলিম, শেখ হেলাল, আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহরা তার পরিবারের সদস্য নয় কিন্তু অনাত্মীয় তো বলা যাচ্ছে না। আর তারা তো গত ৩৮ বছর তার সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। তবে ওমর ফারুক যুবলীগের চেয়ারম্যান হয়েছেন শেখ সেলিমের ভগ্নিপতি হিসেবে।

যুবলীগের ইসমাইল হোসেন সম্রাট বলেছেন, ওমর ফারুককে তিনি প্রচুর টাকা দিয়েছেন। সুতরাং ওমর ফারুককে পুনরায় নেতৃত্বে রাখা আত্মঘাতী হবে, এটা বোঝা যাচ্ছে। বরং যারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জড়িয়ে আছেন, আবার অসততাও বজায় রেখেছেন তাদের সংগঠন থেকে অব্যাহতি দেয়ায় উত্তম হবে। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পরপরই অসততার অভিযোগে মির্জা মনসুর, ডাক্তার আবু হেনা, আখতারুজ্জামান চৌধুরী প্রমুখকে দল থেকে বহিষ্কার করতে দ্বিধা করেননি। এরা সংসদ সদস্য ছিলেন এবং স্বাধীনতাসংগ্রামেও তাদের অবদান ছিল।

অসহযোগ আন্দোলনের সময় বঙ্গবন্ধু আবু হেনাকে কলকাতা পাঠিয়েছিলেন ঘরবাড়ি ঠিক করার জন্য। কারণ বঙ্গবন্ধু বুঝেছিলেন সহসা পাকিস্তানি সৈন্যরা অভিযান শুরু করবে এবং পোড়ামাটি নীতি অবলম্বনের অবস্থা হবে। বঙ্গবন্ধু এই ত্যাগী কর্মীদের সামান্য অসততাকে প্রশ্রয় দেননি। সুতরাং প্রধানমন্ত্রীরও উচিত হবে তার পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করা। অসততার অভিযোগ এনে কোনো নেতাকে দল থেকে বের করে দিলে তার সাধ্য থাকবে না দলকে চ্যালেঞ্জ করার।

পত্রিকায় দেখেছি পনেরো শত লোক নাকি বহিরাগত। তারা দলে প্রবেশ করেছে। তার মধ্য থেকেও যাচাই-বাছাই করতে হবে। সব লোক ক্ষতিসাধনের অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে দলে আসেনি। ১৯৬৯ সালে আব্দুস সামাদ আজাদ, সৈয়দ আব্দুস সুলতান আওয়ামী লীগে যোগদান করেছিলেন। তারা তো দলকে শক্তিশালী করার কাজ করেছেন এবং আওয়ামী লীগকে অলংকৃত করেছিলেন। বাহির থেকে লোক দলে যোগদান করবে, যাচাই-বাছাই করে তাদেরকে আত্মস্থ করাই তো নেতৃত্বের কাজ।

ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগের বৃহত্তর সংগঠন। তিনটা সংগঠনকে ঢেলে সাজানো খুবই কঠিন কাজ। থানা পর্যায়ে সম্মেলন করে জাতীয় পর্যায়ে সম্মেলনের প্রস্তুতি হারকিউলিয়াস টাস্ক। কারণ সংগঠন একটা নয়, সব সংগঠনকে ঢেলে সাজাতে হবে। আওয়ামী লীগকে ঢেলে সাজানো কঠিন হবে না কিন্তু ছাত্রলীগ-যুবলীগের সাজানো কঠিন হবে। স্বেচ্ছাসেবক লীগ নাকি স্বেচ্ছাসেবা বাকি রেখে এমন কোনো কুকর্ম নেই করেনি। নেতাদের কারও কারও আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গেছে। যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ছাত্রলীগের পদ-পদবি কেন্দ্রীয় নেতারা উচ্চমূল্যে বিক্রি করে এক জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রেখেছেন। এমন কঠিন সংকট খুবই সতর্ক পদক্ষেপ নিতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।
anisalamgir@gmail.com

এইচআর/বিএ/পিআর