সম্মানী-অপসংস্কৃতির অবসান হোক

সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ
সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ
প্রকাশিত: ০৯:৩০ এএম, ২১ অক্টোবর ২০১৯

সরকারের সকল উন্নয়ন প্রকল্পে ন্যূনতম ১ লক্ষ টাকা থেকে ৩০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ রাখা হয় Honorarium বা সম্মানী প্রদানের জন্য। শুধু উন্নয়ন বাজেটে নয় রাজস্ব বাজেটের প্রকল্পেও এরকম সম্মানী প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে। সেই সঙ্গে সভায় লাঞ্চ প্যাকেটের আয়োজন করা হয়। এই লাঞ্চ প্যাকেট অফিসের সীমানা পেরিয়ে বহুদূর গমন করে।

কারা এই সম্মানী পেয়ে থাকেন। কোন অতিথিকে কোন অবদান বা ভূমিকা রাখার জন্য আমন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান থেকে সম্মানসূচক কিছু অর্থ প্রদান করা হয়। একেতো আর পারিশ্রমিক বলা যায় না। কিন্তু সরকারের প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে যে সভা অনুষ্ঠিত হয় সেখানে কারা যোগদান করে থাকেন। একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায় বিভিন্ন কমিটি গঠন করা হয়। সেসব কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয় কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার প্রস্তাবের জন্য যেমন দরপত্র আহ্বান কমিটি, মূল্যায়ন কমিটি, বাস্তবায়ন কমিটি এসব কমিটিতে শুধু কার্যকরী বিভাগ বা মন্ত্রণালয় নয়, সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের লোকজন ডাকা হয়। বর্তমানে এসব কমিটির সভায় সম্মানী এবং খাবার দেয়া হয়। সম্মানীর পরিমাণ ৫ শত টাকা থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত।

একজন কর্মকর্তা এধনের সভায় অংশ নিয়ে মাসে ৫০ হাজার টাকা থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত উপার্জন করে থাকেন। একজন সরকারি কর্মকর্তা/ কর্মচারী ২৪ ঘন্টার জন্য নিয়োজিত। কাজের শৃঙ্খলা বা সিস্টেমের জন্য নির্দিষ্ট সময় অফিসে উপস্থিত থাকতে হয়। অন্যথায় তিনি ২৪ ঘন্টার জন্যই সরকারি কর্মচারী নিয়োজিত। দ্বিতীয় অংশ যেটি গুরুত্বপূর্ণ তাহলো তাকে সরকারি যে কাজটি করতে দেয়া হবে, সেটা তার জন্য অবশ্য করণীয়। যেমন অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা সড়কে নির্মাণ সংশ্লিষ্ট একটি প্রকল্পে নথিপত্র নিয়ে হাজির হতে বলা হলো। এটি তার নিয়মিত কাজের অংশ। এর জন্য তাকে আলাদা মজুরি বা সম্মানী দেয়ার প্রশ্ন ওঠে না।

বর্তমানে যে অবস্থা চলছে, তাতে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য কি বিকল্প পথের চিন্তা করতে হবে। একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে সম্মানীর নামে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এই বিশাল অংকের অর্থের হরিলুট কোনক্রমেই কাম্য নয়, এই অর্থ জনগণের। এর চেয়ে বরঞ্চ কাজটি বাস্তবায়নের জন্য ভিন্নœ প্রতিষ্ঠানের হাতে সমর্পণ করে দেয়া যেতে পরে তারা সমাপ্ত কাজটি সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করবে। তাহলে সরকারের এই অতিরিক্ত ব্যয় বেচে যাবে। সরকারি কর্মকর্তাদের সমস্যা পোহাতে হবে না।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বহু আগেই নির্দেশ দিয়েছেন যে এ ধরনের সম্মানী প্রদানের কালচার বন্ধ করতে কিন্তু তা এখনও কার্যকর হচ্ছে না। মানীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা সরকারি কর্মকবর্তা/কর্মচারীদের বেতন দ্বিগুণ করে দিয়েছেন। তাছাড়া অনেক রকম সুযোগ সুবিধাও প্রদান করা হয়েছে। সরকারি খরচে ক্ষেত্রবিশেষে বিদেশে চিকিৎসার ব্যয়ভারও সরকার বহন করে থাকে। এর কৃতজ্ঞতা স্বরূপ সরকারি কর্মকর্তাদের সম্মানী নেয়ার মত অনৈতিক কাজ বহু আগে বন্ধ করা উচিত ছিল। অনৈতিক এজন্য যে একাজ তার কর্তব্যের ভেতর পড়ে। আর একজন্য তাদেরকে এত বেতন ভাতা সুযোগ সুবিধা দেয়া হয়। জনগণের প্রতি সরকারের দায়িত্ব অনেক যা পালন করতে বহু অর্থের প্রয়োজন।

সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা প্রদানের কর্মসূচির কথায় আসা যাক। এই কর্মসূচির অধীনে বয়স্ক ভাতা/ দুঃস্থ মহিলা ভাতা/ বিধবা ভাতা/ প্রতিবন্ধি ভাতা প্রদান করা হয়। মাসিক ভাতার পরিমাণ ৫০০ টাকা থেকে ৭০০ টাকা। বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে কি হয় এই টাকা দিয়ে। গ্রামে একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ২ শত থেকে ৩ শত টাকা। ফসল কাটার সময় এই হার বৃদ্ধি পায়। অবশ্য এসব ভাতা ছাড়া আরো কিছু প্রকল্প রয়েছে যেমন আশ্রায়ণ। এটিও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত উদ্যোগে।

প্রয়োজনের তুলনায় সামাজিক নিরাপত্তার কর্মকাণ্ড পর্যাপ্ত নয়। এখনও বহু পথ যেতে হবে। নিয়ত চলাফেলা করার সময় লক্ষ্য করলে দেখা যাবে বিভিন্ন করুণ অবস্থা। সেদিন শুক্রবার জুমার নামাজের সময় ইমাম সাহেব আহ্বান জানালেন একজনের সাহায্যের জন্য। তিনি কোরআন শরিফে হাফিজ। তার যে অসুখ হয়েছে তাতে রগ শুকিয়ে যাচ্ছে। সপ্তাহে একটি করে ইনজেকশন দিতে হবে যার ব্যয় ৮ হাজার টাকা। বাংলাদেশে চিকিৎসার ক্ষেত্রে আর একটি ভয়াবহ অবস্থা হল দূরারোগ্য রোগের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।

ইদানিং করপোরেট সামাজিক দায়িত্বের কথা বলা হচ্ছে, অথচ এবিষয়টি নিয়ে না সরকার না ঔষধ শিল্প সমিতি তেমন একটা ভাবনা চিন্তা করছে না। কয়েকদিন আগে একটি অভিজাত মার্কেটের সামনে সন্ধ্যায় একটি শিশুকে দেখলাম যে শীর্ণ বস্ত্রে বেলুন বিক্রি করার চেষ্টা করছে। বেলুন নেবেন, একথাটা বলার শক্তিও বাচ্চাটির নেই। অথচ সে সময় তার মায়ের কোলে বসে শিশু শিক্ষা পড়ার কথা।

আমরা জানি যে সরকারের সীমাবদ্ধতা রয়েছে অতএব ইচ্ছে থাকলেও সমাজের বঞ্চিতদের জন্য শক্তিশালী নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা কঠিন। গত ১ মাস ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে লুটপাট বন্ধের যে প্রত্যয় দেখিয়েছে সরকার, সর্বক্ষেত্রে এসব অবৈধ পথ এবং বছরে যে ৭৫,০০০ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে, তা বন্ধ করলে সামাজিক নিরাপত্তা বলয় শক্তিশালী করা কঠিন হবে না। অবৈধ এবং অনৈতিক উপার্জন সমাজে লোভ এবং অনৈতিক কার্যকলাপ বাড়িয়ে চলছে। এসব বন্ধ হলে উপসর্গ কমে যাবে।

লেখক : সাবেক ইপিসিএস, কলামিস্ট।

এইচআর/পিআর

সরকারের সীমাবদ্ধতা রয়েছে অতএব ইচ্ছে থাকলেও সমাজের বঞ্চিতদের জন্য শক্তিশালী নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা কঠিন। গত ১ মাস ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে লুটপাট বন্ধের যে প্রত্যয় দেখিয়েছে সরকার, সর্বক্ষেত্রে এসব অবৈধ পথ এবং বছরে যে ৭৫,০০০ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে, তা বন্ধ করলে সামাজিক নিরাপত্তা বলয় শক্তিশালী করা কঠিন হবে না। অবৈধ এবং অনৈতিক উপার্জন সমাজে লোভ এবং অনৈতিক কার্যকলাপ বাড়িয়ে চলছে। এসব বন্ধ হলে উপসর্গ কমে যাবে