বিনয়াবনত জ্ঞান অন্বেষণ এবং বাস্তবতা

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:০০ এএম, ২২ অক্টোবর ২০১৯

কাজী শাহনেওয়াজ

আমরা পরিবর্তনশীল জগতে বাস করি। পরিবর্তন আমাদের নিত্যসঙ্গী। এই পরিবর্তনের পরিমাণ-মাত্রা-দিক যতটুকু আমাদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালনা করতে পারলে প্রগতি ও উৎকর্ষ লাভ সম্ভব হতো সেটা আমরা পারছি কি না সেটা এখন কোটি টাকার প্রশ্ন। পুঁজিবাদী সমাজের বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে, প্রতিযোগিতা, ব্যক্তিস্বার্থ, পুঁজির স্ফীতি। অন্য কথায় বললে পেছনে ফেলার প্রতিযোগিতা। তার মানে এই নয় যে মানবিক গুণাবলী নিয়ে কেউ চলে না। বরং এই সমাজে যারা অসুস্থ প্রতিযোগিতায় সামিল না হয়ে নিজেকে জানা, নিজের উৎকর্ষ সাধন, জ্ঞান গরিমায় প্রতিনিয়ত নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সাধনায় মগ্ন থাকে তারাই এক সময় সিদ্ধিলাভ করে।

সব কিছুর মূলে আত্মজ্ঞান। নিজের অজ্ঞতা কে জানা। নিজের অজ্ঞতা কে স্বীকার করে জ্ঞানের পথে ধাবমান হওয়া। আর জ্ঞান অন্বেষণ এবং মানুষ হওয়ার প্রথম শর্তই হচ্ছে বিনয় যা দ্বারা জগৎ কে বশীভূত করা যায়। সমাজ সংস্কৃতি রাষ্ট্রভেদে আচরণের ভঙ্গিতে পার্থক্য থাকলেও বিনয় যুগে যুগে তার বিরাট সম্মোহনী, বিস্ময়কর জাদুকরী ক্ষমতা নিয়ে স্বমহিমায় সমুজ্জ্বল হয়ে আছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য এই যে আমরা এখনো বিনয়ী হতে পারিনি। সর্বত্র আমাদের মাঝে আমিত্ব, হামবড়া একটা ভাব আছে। দাঁড়ানো, বাচন ভঙ্গি, মতবিনিময়, হাঁটা, চলাফেরায় স্বাভাবিকতা ছেড়ে আলাদা একটা দৃষ্টিকটূ ধরনের ঢঙ আছে।

এটা আসলে আমাদের অশিক্ষা কুশিক্ষা কেই নির্দেশ করে। এই সমাজ আসলে জ্ঞানচর্চাকে উৎসাহিত করে না। এই সমাজ বুদ্ধিজীবী বা বিজ্ঞানী নয়, এই সমাজ শুধু চাকুরীজীবী আর ব্যবসায়ী উৎপাদন করে। আর এ কারণেই জ্ঞানী বা বিচক্ষণ ব্যক্তির মানদণ্ড হচ্ছে ভালো চাকরি বা বড় ব্যবসা। আর অদ্ভুতভাবে এটা আমাদের মননে বিশাল একটি জায়গা করে নিয়েছে। যে ভালো গাড়ি কিংবা ভালো বাড়িতে থাকে বেশিরভাগ সময়ই সে নিজেকে অন্যের চেয়ে স্মার্ট, আধুনিক, উন্নত মানুষ মনে করে। আর এ কারণে সে বিশেষ মনোযোগ এবং সম্মানও দাবি করে।

কেউ যদি তুলনামূলক উন্নত জায়গায় থাকে বেশিরভাগ সময়ই দেখা যায় তার আচরণে একটা অযাচিত ঔদ্ধত্য দেখা যায় অথচ এ কারণে তার আরো বিনয়ী হওয়া উচিৎ ছিল। আমি বিশাল কিছু এটা না ভাবলে আমাদের চলেই না। সেটা ভাবলেও হতো। বিপত্তি বাঁধে তখনই, যখন বিরাট কিছু হতে গিয়ে আমরা ক্রমাগত অন্যদের ছোট করে বেড়াই। এই তো ক'দিন আগে বাঙালি অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় নোবেল পুরুস্কার পেলেন। নোবেল পুরস্কার পাবার পর কেমন লাগছে জানতে চাইলে ভদ্রলোক এমন ভাবে উত্তর দিলেন শুনে আপনার মনে হবে; পুরস্কার পেয়ে তিনি ভীষণ ভাবে লজ্জিত। এই পুরস্কারটা আরও অনেকেই পেতে পারতো। অনেকের অবদান আছে। কথা বলার ভঙ্গিতেও খুব সঙ্কোচ আর বিনয়। আসলে ফলবান বৃক্ষ হলে যা হয় আর কী।

আমরা বড়ই হচ্ছি এমন পরিবেশে যেখানে আজকাল শুদ্ধ বাংলায় কথা বললে গেয়ো আর ইংরেজদের মতো করে ইংরেজি বললে স্মার্ট মনে করি। উত্তর গোলার্ধ, দক্ষিণ গোলার্ধ বলে যে একটা ব্যাপার আছে; এক গোলার্ধে শীতকাল হলে, আরেক গোলার্ধে গরম কাল থাকে, এর যে একটা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে, সেটা জানার কোন দরকার নেই। অথচ ইংরেজি বলতে পারলেই আমরা বিরাট শিক্ষিত আর স্মার্ট! আমাদের বিনয়ী হতে হবে, জ্ঞানার্জন করতে হবে সর্বোপরি ভাল মানুষ হতে হবে এটা সমাজ বা রাষ্ট্র আমাদের শেখায় না। আমাদের শিক্ষা দেয়া হয় বড় হতে হবে, সফল হতে হবে, অনেক টাকার মালিক হতে হবে। এর জন্য প্রয়োজনে অন্য কাউকে হেয় করাও যাবে। অঢেল টাকা পয়সার মালিক হয়ে কিংবা বড় চাকরি করে সব কিছুতে ফায়দা নেওয়া যাবে।

আর এ কারণেই আমাদের নতুন প্রজন্ম নিজের আগ্রহের দিকে না হেঁটে শর্ট-কাট ওয়েতে বড় হতে চাইছে। নতুন প্রজন্মের কাছে নীতি- নৈতিকতা, জ্ঞানচর্চা গৌণ এবং অসার মনে হচ্ছে যা রীতিমত ভীতিকর। আশপাশে কান পাতলা শোনা যায় মানুষের মনোযোগ কিভাবে টাকা রোজগার করতে হবে, কিভাবে বড়োলোক হওয়া যায়, কিভাবে একটা দামী ব্র্যান্ডের গাড়ি কেনা যায় সে দিকে।

এইসব কর্মকাণ্ড দেখে যারা পুরো জীবনে জাগতিক এইসব চাওয়া পাওয়া থেকে দূরে থেকেছে বা থাকছে তারাও মাঝে মাঝে নিরুৎসাহিত বোধ করেন। সুশিক্ষা, নৈতিকতা শক্ত ভিতের উপর না থাকলে একসময় হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে।

সময় হয়েছে গভীরভাবে উপলব্ধির। আমার আমিকে দ্রুত’ই খুঁজে নিতে হবে। যে কিনা কখনো কোন বস্তগত চাওয়া-পাওয়ার পেছনে ছুটেনি; সবসময়ই জানতে চেয়েছে, শিখতে চেয়েছে; নিজেকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করেছে। কখনোই বড় হতে চায়নি। চেয়েছে বিনয়ের সঙ্গে ছোট হয়ে থেকে আরও বেশি কিছু জানতে।

লেখক: পিপিএম-সেবা, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) পিরোজপুর।

এইচআর/এমকেএইচ

এইসব কর্মকাণ্ড দেখে যারা পুরো জীবনে জাগতিক এইসব চাওয়া পাওয়া থেকে দূরে থেকেছে বা থাকছে তারাও মাঝে মাঝে নিরুৎসাহিত বোধ করেন। সুশিক্ষা, নৈতিকতা শক্ত ভিতের উপর না থাকলে একসময় হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে। সময় হয়েছে গভীরভাবে উপলব্ধির। আমার আমিকে দ্রুত’ই খুঁজে নিতে হবে। যে কিনা কখনো কোন বস্তগত চাওয়া-পাওয়ার পেছনে ছুটেনি; সবসময়ই জানতে চেয়েছে, শিখতে চেয়েছে; নিজেকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করেছে। কখনোই বড় হতে চায়নি। চেয়েছে বিনয়ের সঙ্গে ছোট হয়ে থেকে আরও বেশি কিছু জানতে।