সাকিবের নিষেধাজ্ঞা এবং অনেক প্রশ্ন

অঘোর মন্ডল
অঘোর মন্ডল অঘোর মন্ডল , এডিটর, দীপ্ত টিভি
প্রকাশিত: ০৯:২১ এএম, ০৩ নভেম্বর ২০১৯

মাঠে তিনি নেই। কিন্তু দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি আছেন। দারুণভাবে আছেন। কারণ তিনি সাকিব আল হাসান। বিশ্বের এক নম্বর অলরাউন্ডার। বুকিদের প্রস্তাব পেয়ে তিনি সাড়া দেননি বটে। তবে বিষয়টা আইসিসিকে জানাননি। সেই অপরাধে দুই বছরের নিষেধাজ্ঞায় তিনি। যদিও স্থগিত নিষেধাজ্ঞা বাদ দিলে তিনি মাঠে থাকতে পারছেন না এক বছর। সে ক্ষেত্রে কার্যত তার নিষেধাজ্ঞা এক বছরের। কিন্তু সাকিবের এই এক বছরের অনুপস্থিতি খুব স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারছেন না বাংলাদেশের ক্রিকেটানুরাগীরা। বিশেষ করে সাকিবভক্তরা।

সাকিব অনুরাগীদের ব্যাপারটা হয়তো আবেগতাড়িত। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সাকিবের অনুপস্থিতি বাংলাদেশ ক্রিকেটকে বড় এক চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। জন্ম দিয়েছে হাজার রকম প্রশ্ন। সাকিব ভুল করেছেন বুকিদের প্রস্তাব পাওয়ার খবর আইসিসি বা বিসিবিকে না জানিয়ে। কিন্তু এ রকম ভুল অতীতে আরও অনেকে করেছেন। ব্রেন্ডন ম্যাককলাম ম্যাচ ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব পেয়েছিলেন তার এক সময়ের টিমমেট ক্রিস কেয়ার্নসের কাছ থেকে। একবার নয়, তিন-তিনবার। তিনি অবশ্য বছর তিনেক পর বিষয়টা জানিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটের অ্যান্টি করাপশন ইউনিট প্রধানকে। ম্যাককালাম পাশে পেয়েছিলেন তার বোর্ডকে।

শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটরাররাও প্রস্তাব পেয়েছিলেন। তারাও অনেকে সময়মতো জানাননি। কিন্তু ক্রিকেট শ্রীলঙ্কা নির্দিষ্ট একটা সময় বেঁধে দিয়ে সাধারণ ক্ষমার মতো ঘোষণা দিয়ে জানাতে বলেছিলেন। আইসিসির সহায়তাও পেয়েছিলেন তারা। ভারতের সাবেক অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনির নাম উঠেছিল। বিসিসিআই কি তার পাশে ছিল? ধোনির কি কোনো শাস্তি হয়েছিল?

এ রকম অনেক প্রশ্ন জনমানসে। এ বিষয়গুলো বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রশাসনিক দিক নিয়ে। সেই প্রশ্ন আরও জোরাল আওয়াজের মতো মানুষের কানে বাজে যখন, ক্যাসিনোর মতো জুয়ার চালানোর সঙ্গে জড়িয়ে যায় একজন বোর্ড পরিচালকের নাম। যার বর্তমান ঠিকানা জেলখানা। বিদেশে ক্যাসিনোতে যাতায়াত অনেক বোর্ড পরিচালকের। ক্যাসিনো যদি জুয়া হয়, সেটা বিদেশ বা দেশে যেখানেই খেলতে যান না কেন, সেখানে জুয়াড়িদের সঙ্গেই আপনার ওঠা-বসা হবে। কিন্তু ক্রিকেট বোর্ডের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে ক্যাসিনোতে গিয়ে অনৈতিক কাজেন সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থেকে যায় না কি?

সাকিব আল হাসান অনৈতিক এবং অন্যায় প্রস্তাব পেয়ে আইসিসি বা বিসিবির অ্যান্টি করাপশন ইউনিটকে জানাননি। কিন্তু বিসিবির অ্যান্টি করাপশন ইউনিট কি জানে? খোদ বিসিবির পরিচালক ক্যাসিনো চালান। যেখানে জুয়াড়িদের আনাগোনা। তিনি কি বিষয়টা আইসিসি বা বিসিবিকে জানিয়েছেন? বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের খেলা নিয়ে হাজার রকম প্রশ্ন।

ক্লাবকর্তারা বলেন, মাঠে নয়। খেলার ফলাফল নির্ধারিত হয়ে যায় আগেই। বিশেষ করে নিজেদের দিকের লিগ ম্যাচে! আর সেটা হয় কোন দলকে রেলিগেটেড করা হবে আর কোন দলকে উপরের স্তরে তোলা হবে সেই বিবেচনা মাথায় রেখে।

এগুলো নিয়ে বিসিবির অ্যান্টি করাপশন ইউনিটের লোকজন কি কোনো রিপোর্ট দিয়েছেন? দিলে কোনো এক বোলার এক ওভারে ৩৬টা নো-বল করে প্রতিবাদ জানাতেন না। আর এই প্রতিবাদের কথাও আইসিসিকে জানানো উচিত ছিল বিসিবির। একজন সাকিবের নিষেধাজ্ঞা অনেকগুলো প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেটাঙ্গনে।

এর আগে বিপিএলে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের দায়ে মোহাম্মদ আশরাফুল নির্বাসিত হয়েছিলেন। বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রথম সুপারস্টার ছিলেন তিনি। সেই আশরাফুলের ক্যারিয়ার ম্যাচ ফিক্সিং কেলেঙ্কারিতে নিভু নিভু। কিন্তু কে তাকে ফিক্সারদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। আশরাফুল কার কাছ থেকে টাকা নিয়েছিলেন। সেই বুকিটা কে ছিলেন? আশরাফুলকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন কে? এ রকম প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। শুধু জানা গেছে, মোহাম্মদ আশরাফুল ম্যাচ ফিক্সিং করেছিলেন। তাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এবার জানা গেল, সাকিবকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন দীপক আগারওয়াল নামের এক ভারতীয় বুকি। কিন্তু তার ব্যাপারে কি কিছু করণীয় আছে আইসিসির? বিসিবি কি সেই উদ্যোগ নেবে?

সাকিব আল হাসানকে ছাড়া আগামী এক বছর ক্রিকেট খেলতে হবে বাংলাদেশকে। সাকিব থাকবেন না। কিন্তু বাংলাদেশ দলের সঙ্গে ছায়ার মতো ঘুরতে পারে দুশ্চিন্তা। তার জায়গাগুলো ভরাট করবেন কে বা কারা? কারণ, এক সাকিবের মধ্যে তিন সাকিব। ব্যাটসম্যান, বোলার এবং অধিনায়ক সাকিব। তার জায়গা ভরাট করার মতো ক্রিকেটার পাওয়া খুব সহজ কোনো কাজ নয়। বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা ক্রিকেটার সাকিব। চাইলেই আরেকজন চলে আসবেন সেটা আশা করা বাড়াবাড়ি। কিন্তু বাংলাদেশ ক্রিকেটকে এগিয়ে যেতে হবে। ভারত সফরেই প্রমাণ পাওয়া যাবে সাকিবের অভাব পূরণের পথ কীভাবে খুঁজছে বাংলাদেশ।

সাকিবের ব্যাটিংয়ে হয়তো আপনি ব্রায়ান লারা কিংবা সৌরভ গাঙ্গুলির রাজসিক সৌন্দর্য খুঁজে পাবেন না। কিন্তু কাযর্কারিতা? সেটা বলে দেয় তার পরিসংখ্যান। তার নামের পাশের রানগুলো। তার বাঁহাতি স্পিনে হয়তো নীরব ঘাতকের লাবণ্যে মেশানো নেই। কিন্তু তার নামের পাশের উইকেটগুলো বলে দেয়, তাকে সেগুলো প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানরা উপহার দিয়ে যাননি। আর ক্যাপ্টেন সাকিব? তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ প্রথম ওভারসিজ টেস্ট সিরিজ জিতেছিল। আর টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে তিনি হচ্ছেন বাংলাদেশের স্বপ্নের ফেরিওয়ালা।

মোটাদাগে সাকিব হচ্ছেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রথম আপদমস্তক পেশাদার ক্রিকেটার। যিনি পেশাদারিত্ব আমদানি করেছেন। এনেছেন কাঠিন্য। আর সেই পেশাদারি কাঠিন্য দিয়ে আবেগ আর কান্না চেপে রেখে তিনি বলতে পারেন, ‘আপনারা পাশে থাকলে আমি আবার ফিরে আসব। আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরব।’ সাকিব হয়তো ফিরবেন। কিন্তু মাঝখান থেকে হারিয়ে যাবে তার ক্যারিয়ারের একটা বছর। যেটা ফিরে পাবেন না কোনোদিন।

তারপরও স্যালুট তার অদম্য মানসিকতার জন্য। ইস্পাত কঠিন পেশাদারি দৃঢ়তার জন্য।

লেখক: সিনিয়র জার্নালিস্ট ও কলামিস্ট।

এইচআর/বিএ/পিআর