সহাবস্থান

ডা. বিএম আতিকুজ্জামান
ডা. বিএম আতিকুজ্জামান ডা. বিএম আতিকুজ্জামান
প্রকাশিত: ১১:১৪ এএম, ০৪ নভেম্বর ২০১৯

আজ রোববার। অরলান্ডোর আবহাওয়া ভারী চমৎকার। গরম নেই, বাতাসে আদ্রতা নেই। কটকটে রোদ্দুরও নেই। ঘরের বাইরে সারাটা দিন কাটানো যায়। বনভোজনে যাওয়া যায়।

গতকাল আমাদের পাড়ার জামে মসজিদের ইমাম হাফেজ তারেক আমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, আজ দুপুরে আমাদের মসজিদের আঙিনায় অন্য সব ধর্মাবলম্বীদের দাওয়াত করা হয়েছে কাবাব খাবার (Bar B Que Party) জন্য। প্রতি দুমাস অন্তর এ অনুষ্ঠানটি হয়। আমি যাবার চেষ্টা করি।

Party-3

এ অনুষ্ঠানের আয়োজনের পেছনে একটি ছোট্ট কাহিনী আছে। ভারতের লখনৌতে জন্মগ্রহণকারী হাফেজ তারেক তা বেশ ঘটা করে বলেন।

অরলান্ডোর একটি সুন্দর জায়গাতে জামে মসজিদ বানানো হয়েছিল প্রায় তিরিশ বছর আগে। তখন এ শহরে খুব বেশি মুসলমান ছিল না। মসজিদে দু-তিনশো মানুষ ধরবার জায়গা ছিল। এখন এ শহরে মসজিদ হয়েছে এক ডজনেরও বেশি। আর সব মসজিদেই জুমার দিন মানুষ উপচে পড়ে।

বছর পাঁচেক আগে জামে মসজিদ বাড়ানোর প্রকল্প হাতে নেয়া হলো। টাকা পয়সাও উঠে গেল রাতারাতি। তবে আমাদের এলাকার অধিকাংশ অমুসলমান অধিবাসীরা তাতে বাঁধ সাধলেন। অধিকাংশ ভিন্নধর্মীদের ভয় মুসলমানদের সম্পর্কে। এমনকি আমাদের অনেকের প্রতিবেশীরা পর্যন্ত এ প্রকল্পের ব্যাপারে নারাজ হলেন।

Party-3

ব্যাপারটি আমাদের অনেককে অবাক করে দিল। আমরা অনেকেই ব্যথিত হলাম। তখন হাফেজ তারেক বললেন, ‘আমাদের সম্পর্কে ওদের জানবার সুযোগ করে দিতে হবে আমাদের। আমাদের ঘর খুলে দিতে হবে ওদের জন্য। মূলস্রোতে থাকতে হবে আমাদের।’

সেই থেকে শুরু হলো Interfaith Lunch কিংবা Dinner, যাতে করে খোলাখুলিভাবে মুসলমানদের ধর্ম, কৃষ্টি, ইতিহাস সম্পর্কে তারা জানতে পারে। এভাবে সমাজে তাদের অবদানগুলো তুলে ধরা হলো। এমনকি ইফতারে পর্যন্ত তারা আমন্ত্রিত হলো। এ শহরের বড় বড় গির্জার যাজক, গুরুদুয়ারার পুরোহিত, ইহুদি উপাসনালয়ের রাবাই, মন্দিরের পুরোহিত সবাইকে আমন্ত্রণ করা হলো তাতে।

Party-3

এর ফলাফল হলো চমৎকার। আস্তে আস্তে সবার মধ্যে মুসলমানদের প্রতি সহনশীলতা বেড়ে গেল। এখন শহরের বড় বড় গির্জাগুলোর যাজকরা তাদের অনুষ্ঠানে মুসলমানদের দাওয়াত করেন। একে অন্যকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন।
‘মুসলিম মোবাইল কিচেন’ নামের চলমান গাড়ির রান্নাঘর থেকে এ শহরের দুস্থ মানুষদের বিনা পয়সায় খাবার বিতরণ করা হয় প্রতি সপ্তাহে।

সে সময় থেকেই এখানকার গণমাধ্যমে মসজিদের ইমাম, গির্জার পুরোহিত, ইহুদি উপাসনালয়ের রাবাইদের নিয়ে আমাদের সবার নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারগুলোতে সব ধর্মের মূল বাণীর সহাবস্থানের ব্যাপারটি ‘Three Wise Men’ নামের একটি অনুষ্ঠানে প্রতি সপ্তাহে প্রচারিত হয়। খুবই জনপ্রিয় এ অনুষ্ঠানটি।

বরাবরের মতো আজও চমৎকার একটি দুপুর কেটেছে। আমাদের শহরের বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক ধর্ম বিষয়ের অধ্যাপক সকাল থেকে তার পাঁচজন ছাত্রছাত্রী নিয়ে চলে এসেছেন সাহায্য করবার জন্য। দু বছর আগে আমাদের এ অঞ্চলের সব অমুসলমান অধিবাসীরা সম্মিলিতভাবে এ মসজিদ বাড়ানোর প্রকল্পটিতে তাদের সম্মতি এবং সহযোগিতা জানিয়েছে। পুরনো মসজিদের পাশেই হচ্ছে নতুন মসজিদ। সবাই ঘুরেফিরে দেখলেন তার মেরামতের অগ্রগতি।

Party-3

নতুন এ মসজিদে চার হাজারেরও বেশি মানুষ নামাজ পড়তে পারবে। এখানে সবার জন্য একটি কমিউনিটি হল, খেলবার জায়গা, ইসলামিক কৃষ্টি জাদুঘর ও পাঠাগারও তৈরি হচ্ছে প্রায় বিশ একর জায়গার ওপর।

একটি সহনশীল সমাজে বিভিন্ন কৃষ্টি, ধর্ম, মতামতের মানুষরা সহাবস্থান আর পারস্পরিক সহযোগিতার মাঝে কেবল সামগ্রিক উন্নতিই করতে পারে। আমাদের এ লোকালয় তার অনন্য উদাহরণ।

এসআর/পিআর