‘আইএস টুপি’র তাৎপর্য কী

আমীন আল রশীদ
আমীন আল রশীদ আমীন আল রশীদ , সাংবাদিক, কলামিস্ট
প্রকাশিত: ১০:১৩ এএম, ০৩ ডিসেম্বর ২০১৯

আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের কোনো নির্ধারিত টুপি নেই। কিন্তু তাদের একটি লোগো বা মনোগ্রাম আছে। সেই মনোগ্রামযুক্ত দুটি টুপি নিয়েই বিতর্ক। বিতর্কটা এ কারণে যে, ২৭ নভেম্বর হলি আর্টিসান মামলার রায় ঘোষণার পর দু্ই আসামি আদালতের ভেতরেই এই টুপি মাথায় দিয়েছে এবং খেলাফত প্রতিষ্ঠা হবে বলে স্লোগান দিয়েছে। অথচ তাদের যখন কারাগার থেকে আদালতে নেয়া হয়, তখনও তাদের মাথায় টুপি ছিল না।

ফলে এ ঘটনায় কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে: ১. আদালতের ভেতরে তাদের টুপি কে বা কারা সরবরাহ করল? ২. টুপি কি তাদের পকেটেই ছিল? ৩. তারা যখন আদালতে টুপি মাথায় দিল, সেখানে উপস্থিত আইনশৃঙ্খলা বা গোয়েন্দা বাহিনীর লোকরা কি টুপিতে আইএসের লোগোটা চিনতে বা বুঝতে পারেনি? ৪. এ রকম একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর মামলার রায় উপলক্ষে আদালতের ভেতরে ও বাইরে যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল, তা কি যথেষ্ট ছিল? ৫. আইএসের টুপি বলতে কিছু থাকুক বা না থাকুক, এই ঘটনা আসলে কী বার্তা দিয়েছে? ৬. যে কারাগারকে বলা হয় সংশোধনাগার, সেখানে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়া তরুণদের আদৌ কি কোনো সংশোধনের ব্যবস্থা আছে? ৭. জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি যে আদর্শিক লড়াইয়ের কথা বলা হয়, সেই লড়াইটা কি শুরু হয়েছে বা হবে?

ঘটনার পর আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও বলেছেন, জঙ্গিদের মাথায় কী করে ওই টুপি গেল, সে বিষয়ে তদন্ত হবে এবং তদন্ত চলছেও। কারা কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে তদন্ত শেষ করেছে এবং কমিটির প্রধান কর্নেল আবরার হোসেন গণমাধ্যমকে বলেছেন, তারা সিসি ক্যামেরার ছবি দেখে এবং সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছেন, কারাগার থেকে ওই টুপি যায়নি। বরং এজলাসে থাকা অবস্থায় কেউ তাদের টুপি সরবরাহ করেছিল। কিন্তু এর আগে পুলিশের তরফে দাবি করা হয়, আইএসের প্রতীকসংবলিত কালো টুপি কারাগার থেকেই এক জঙ্গি আদালতে নিয়ে এসেছিল বলে তারা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে।

পুলিশের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের যুগ্ম কমিশনার মাহবুবুল আলম সাংবাদিকদের বলেছেন, কারাগার প্রাঙ্গণে থাকা সিসি ক্যামেরার ফুটেজ তারা দেখেছেন। জঙ্গি রাকিবুল আদালতের হাজতখানা থেকে মাথায় টুপি পরে বের হয়। সেই টুপিই পরে এজলাস থেকে বের হওয়ার সময় উল্টিয়ে পরে বলে তারা নিশ্চিত হয়েছেন।

ফলে দেখা যাচ্ছে, কারা কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের দাবি একেবারেই বিপরীত। এ অবস্থায় ১ ডিসেম্বর আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) এক মামলার শুনানিতে জঙ্গির মাথায় আইএস টুপির বিষয়ে হাইকোর্ট বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং মন্তব্য করেন, নিম্ন আদালতে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেও দণ্ডিত দুই আসামির মাথায় আইএসের চিহ্নসম্বলিত টুপি কীভাবে এলো? কে তাদের এই টুপি দিল? ফেরেশতা নাকি শয়তান?

ধরা যাক, কারাগার থেকে বের হওয়ার সময় টুপি দুটি জঙ্গিদের পকেটেই ছিল। ধরা যাক আদালত থেকে বের হওয়ার সময়ও তাদের মাথায় টুপি ছিল এবং উল্টানো ছিল। কিন্তু রায় ঘোষণার পর তারা যখন পকেট থেকে বের করে উল্টিয়ে আইএসের লোগো প্রদর্শন করে টুপি দুটি মাথায় দিল, সেই দৃশ্য আদালতে দায়িত্বরত পুলিশ ও গোয়েন্দা বাহিনীর লোকরা চিনতে পারেননি? একজন সাধারণ পুলিশ কনস্টেবল না বুঝলেও জঙ্গি ইস্যুতে কাজ করেন, এমন পুলিশ অফিসার ও গোয়েন্দা বাহিনীর কর্মকর্তারা সেখানে ছিলেন না? তারা আইএসের লোগো চেনেন না? শুধু আইএস কেন, তাদের তো পৃথিবীর সব জঙ্গি সংগঠনের লোগোই চেনার কথা। যদি চিনে থাকেন তাহলে সাথে সাথে তাদের মাথা থেকে ওই টুপি খুলে নেয়ার কোনো পদক্ষেপ তারা নিয়েছিলেন? যদি না নেন তাহলে এখানে তাদের গাফিলতি ও দায়িত্বহীনতার জন্য তাদের কেন জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে না? আর যদি তারা এটা বুঝতেই না পারেন যে, টুপিতে আইএসের লোগো ছিল কিনা, সেটি আরও বড় অযোগ্যতা। এ রকম অযোগ্য ও অদক্ষ লোকদের দিয়ে জঙ্গিবাদ নির্মূল হবে না।

প্রশ্ন উঠেছে, এ রকম একটি চাঞ্চল্যকর মামলার রায়ে আদালতে যে পরিমাণ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয়ার কথা ছিল, সেটি নিশ্চিত হয়েছিল কিনা? এ রকম একটি বড় মামলার রায়ে আদালতকক্ষে প্রচুর মানুষ ভিড় করে। সেখানে আইনজীবী, আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্য এবং সাংবাদিকের পাশাপাশি জঙ্গিদের কোনো দোসরও ঢুকে পড়েছিল কিনা, তার নিশ্চয়তা কী? কারা কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, কেউ যদি এজলাসে বসেই জঙ্গিদের হাতে টুপি দিয়ে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে সেখানে তাদের লোক ছিল। তাহলে জঙ্গিদের লোক কোথায় কোথায় আছে, তাদের এক্সেস কত দূর পর্যন্ত- রাষ্ট্র সেটি জানে?

ধরা যাক, আইএসের টুপি বলে কিছু নেই। কিন্তু লোগো বা মনোগ্রামের তো একটা প্রতীকী গুরুত্ব আছে। যেকোনো সংগঠনের এই লোগো বা মনোগ্রামই তাদের ব্র্যান্ডিং করে। নাৎসিদের মনোগ্রাম সারাবিশ্বের মানুষ চেনে। এটাকে এমনভাবে ব্র্যান্ডিং করা হয়েছে যে, ওই লোগোর কাছাকাছি কোনো প্রতীক দেখলেও মানুষের মনে নৃশংসতার ছবি ভেসে ওঠে। আবার এর বিপরীতে কোনো ভালো সংগঠনের প্রতীক যেমন রেডক্রস বা রেডক্রিসেন্টের প্রতীক দেখলে মানুষের মনে এক ধরনের প্রশান্তির অনুভূতি হয়। ফলে আইএসের টুপি বলে কিছু আছে কি নেই, তার চেয়ে বড় কথা, জঙ্গিরা যে উদ্দেশ্যে আদালতে মাথায় ওই টুপি পরেছিল, সেই উদ্দেশ্য সফল। অর্থাৎ রায়ে সাতজনের ফাঁসির বিষয়টি ছাপিয়ে আলোচনা ও বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছে টুপি।

গল্পটা সম্ভবত সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশকে নিয়ে। তাকে একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন, ইরাক দখল করার পর আপনি প্রথমে কী করবেন? বুশ বলেছিলেন, আমি বাগদাদের প্রাণকেন্দ্রে একটি সাইকেলের টায়ার ফুটো করে দেব। ওই সাংবাদিক বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলেন, সাইকেলের টায়ার কেন? বুশ বললেন, যাতে মানুষ এটা নিয়েই আলোচনা করে এবং ইরাক দখলের কথা ভুলে যায়।

হলি আর্টিসানের জঙ্গিরাও নিজেদের রায় ভুলিয়ে দিতে এমন একটি বিষয় সামনে আনল, যা নিয়েই আলোচনা চলছে এবং বলার অপেক্ষা রাখে না, ব্যাপক নিরাপত্তার মধ্যেও যে দুজন জঙ্গির মাথায় আইএসের লোগোসম্বলিত টুপি তারা পরল এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেরও নজরে এলো, এর মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের শক্তিমত্তাকেই মূলত প্রদর্শন করল এবং তাদের এই হিরোইজম যে কিছু তরুণকে প্রভাবিত করবে, তাতে সন্দেহ নেই। ফলে যে প্রশ্নটির এখন উত্তর জানা জরুরি তা হলো, কারা এই জঙ্গিদের এ রকম একটি কাজ করতে সহায়তা করল? পুলিশ-গোয়েন্দা বাহিনী বা কারা কর্তৃপক্ষ- কেউ কি দায় এড়াতে পারে?

আমীন আল রশীদ: বার্তা সম্পাদক, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর

এইচআর/বিএ/জেআইএম