কিছুই ভালো লাগে না!

শান্তনু চৌধুরী
শান্তনু চৌধুরী শান্তনু চৌধুরী
প্রকাশিত: ০৯:১৮ এএম, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯

কিছুই ভালো না লাগার রোগ কমবেশি আমাদের সবার মাঝেই রয়েছে। হঠাৎ হঠাৎ মনে হয়, লাগছে না ভালো আর, কান্না পাচ্ছে সারারাত। বা মনখারাপের এক একটা দিন নিকষ কালো একলা লাগে, কেউ বুঝে না এই আমাকে, আপনাকে, আমাদেরকে। বা বুঝলেও সেই বোঝা হয়তো মনঃপূত হয় না। মনের আকাশ ক্রমেই ঢেকে যায় বিষণ্ন চিমনির ধোঁয়ায়। তাই এ ধোঁয়া আর দূষণের শিকার শহরে প্রতিনিয়ত মানুষ বিষণ্নতায় ভোগে। প্রতিনিয়ত এটা নিয়ে কথা হয়, সংবাদমাধ্যমের মানুষগুলো নিজেদের চাকরি নিয়ে বিষণ্নতার কথা ভুলে গিয়ে অন্যকে কীভাবে বিষণ্নতা থেকে রক্ষা করবে সেই উপায় খুঁজে বের করে। ফিচার ছাপে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বিষণ্নতা কমে না।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা বিআইডিএস চলতি বছরের জুন-জুলাই মাসে ঢাকায় প্রায় সাড়ে বারো হাজার মানুষের ওপর একটি সমীক্ষায় চালায়। এতে বেরিয়ে এসেছে যে, শহরের ৬৮ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো ভাবে অসুস্থ। এছাড়া মোট জনগোষ্ঠীর ৪৪ শতাংশই বিষণ্নতায় ভুগছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মনে করছে, বিষণ্নতা নিয়ে কথা বলা উচিত। তাদের অনুমিত হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ বিষণ্নতা রোগের বোঝা এর সর্বোচ্চ শিখরে অবস্থান করবে। মানুষ বিষণ্ন হলে সামগ্রিকভাবে সেটি তার নিজের পাশাপাশি সমাজের জন্যও ক্ষতিকর। পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক বিষণ্নতাযুক্ত নাগরিকের অনুৎপাদনশীলতা ও চিকিৎসাব্যয়ের কারণে রাষ্ট্র ও সমাজে প্রভাব পড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, সারা বিশ্বে প্রতিদিন তিন হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে থাকে, বছরে প্রায় আট লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে। এর মধ্যে বেশির ভাগ আত্মহত্যাই ঘটে বিষণ্নতার কারণে।

আমরা যারা ঢাকায় থাকি, আমাদের চারপাশে বিষণ্নতা ছাড়া কোনো গতি নেই। বিষণ্নতায় পেয়ে বসার উপাদান ছড়িয়ে আছে চারপাশে। যে কোনো কাজ করাতে যান ঘুষ দুর্নীতি নিত্য সমস্যা। কোনো সমাধান নেই। বিশেষ করে সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে কোনো কাজের জন্য গেলেই নানা হয়রানি। স্বাভাবিক যেটা পাওয়ার কথা সেটা পাবেন না। আবার এমন না যে এসবের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো প্রতিকার হয়। বরং উল্টো হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।

আমরা যদি চিকিৎসার কথা বলি, সেখানে কোনো উন্নতি নেই। হয়তো বিভিন্ন হাসপাতাল নির্মিত হচ্ছে, শয্যা বাড়ছে। কিন্তু ডাক্তারদের ফিসহ নানা বাণিজ্য সার্বিকভাবে প্রভাব ফেলছে চিকিৎসার ওপর। আপনি বেশি টাকা নিয়ে ভালো বেসরকারি ক্লিনিকে যাবেন, সেখানেও বিশেষ ভরসা নেই। তাই হাজার হাজার লোক ছুটে যাচ্ছে পাশের দেশ ভারতে। সেখানে চিকিৎসা যাই হোক ডাক্তার অন্তত মনযোগ দিয়ে রোগীর কথাতো শুনে। আমাদের দেশে যেটা চিন্তা করাও যায় না। কিন্তু যারা নিম্নবিত্ত তাদেরতো দেশের বাইরে যাওয়ার উপায় নেই, তাই রোগ শোক নিয়ে তাদের বিষণ্নতা বাড়ে। এই শহরে শৈশব বলে কিছুই নেই। খেলার মাঠ নেই। হাঁটার জায়গা নেই। যা আছে তা হলো স্কয়ার ফিটের হিসেবের ঘর। আর এর মধ্যে কম্পিউটার বা মোবাইলে খেলাধুলা। শৈশবের রঙ তাই আগেই চুরি হয়ে যায়, হারিয়ে যায়। একটা বিষণ্ন প্রজন্ম তাই গড়ে উঠছে।

এক দিনের নারী শিশু থেকে শুরু করে মেয়েদের নিরাপত্তা নেই বললেই চলে এখানে। রাস্তাঘাটে, পথে চলতে গিয়ে তাই নানা নির্দেশনা শুনতে হয় মেয়েদের। এমনকি খোদ পুলিশ সদরদপ্তর বাধ্য হয়ে গাড়িতে মেয়েরা কীভাবে চলবে তার নির্দেশনা জারি করে। সাংবাদিকতার শিক্ষক শেখান ভেজা চুলে যাতে নারীরা সাংবাদিকতা করতে না যায়, এতে নাকি পুরুষের কামনা বাড়ে। কী আজব! যার কামনা বাড়ে তার দোষ নেই। কিন্তু একজনের অধিকার কীভাবে খর্ব করে দেয়ার পাঁয়তারা চলছে।

কথায় বলে, ঢাকায় টাকা উড়ে। হয়তো ঠিক। কিন্তু সেই টাকা কিছু মানুষের জন্য। তাই দারিদ্র্য এর সাথে যাদের নিয়ত বসবাস তারা বিষণ্ন হবে সেটাই স্বাভাবিক। আবার নিজেদের থাকার জায়গা নেই বলে বেশিরভাগ লোকেরই থাকতে হয় ভাড়া বাসায়। আর ভাড়া বাসা মানেই বেশিরভাগই ভাড়ায় কেনা অত্যাচার। বাড়ির মালিকদের নানা নিয়ম আর ফি বছর ভাড়া বাড়ানোর হুজ্জত। শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কোনো আশার আলো নেই। সেটি পুরোপুরি বাণিজ্য। নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা, চাকরির বাজার মন্দা। কোথাও সুখবর নেই। তাই বিষণ্নতা এসে গ্রাস করে। ঢাকার পরিবেশ ক্রমেই দূষিত হয়ে উঠছে। ট্রাফিক জ্যাম, রাস্তা ঘাটের সমস্যা। সমস্যার কোনো অন্ত নেই। তাহলে সমাধান কী?

অনেকে বলে থাকেন, বিষণ্নতা কাটানোর জন্য প্রয়োজনে কথা বলুন। মন খুলে। কিন্তু সেখানেও বিপত্তি। পাশাপাশি হয়তো কয়েকজন বসে আছেন। কিন্তু কেউ কারো সাথে কথা বলছেন না। কারণ সবাই ব্যস্ত মুঠোফোনে। এটা ঠিক যে, যানজট প্রতিনিয়ত মানুষকে মানসিক চাপে ফেলছে কিন্তু রাতারাতি রাস্তাঘাট, ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল করে হয়তো এই সমস্যার সমাধান হবে না। তবে চেষ্টা থাকতে হবে সেটি কমিয়ে আনার।

অনেকগুলো সমাধানযোগ্য সমস্যা রয়েছে সেগুলো সরকার আন্তরিক হলেই সমাধান করা সম্ভব। জোর করে নয়, জনগণকে সচেতন করে যথাযথ পদক্ষেপ নিলেই কিন্তু অনেক সমস্যা থেকে কিছুটা হলেও বেরিয়ে আসা সম্ভব। নাগরিকদের সহজ স্বাচ্ছন্দ জীবন দিতে পারলেই মুক্তি ঘটবে বিষণ্নতা থেকে। এমনিতে কাউন্সিলিং করানো, সেটা মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের কাজ। বা সেটি প্রয়োজন ব্যক্তি বিশেষের ক্ষেত্রে। কিন্তু সাবির্কভাবে জাতি হিসেবে আমরা যে বিষণ্নতায় আক্রান্ত হচ্ছি তার সমাধান কিন্তু দিতে পারে একমাত্র রাষ্ট্রীয় বিধানাবলি। সেটি যদি জনস্বার্থে হয়, জনগণের বেঁচে থাকার প্রয়োজনে হয় তবে ঝেটিয়ে বিদায় হবে বিষণ্নতা। যেটি ব্যক্তির পাশাপাশি নষ্ট করছে সম্প্রীতিও। তৈরি করছে দেশ ধ্বংসকারী বিধ্বংসী মানববোমা।

লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক।

এইচআর/পিআর

এক দিনের নারী শিশু থেকে শুরু করে মেয়েদের নিরাপত্তা নেই বললেই চলে এখানে। রাস্তাঘাটে, পথে চলতে গিয়ে তাই নানা নির্দেশনা শুনতে হয় মেয়েদের। এমনকি খোদ পুলিশ সদরদপ্তর বাধ্য হয়ে গাড়িতে মেয়েরা কীভাবে চলবে তার নির্দেশনা জারি করে। সাংবাদিকতার শিক্ষক শেখান ভেজা চুলে যাতে নারীরা সাংবাদিকতা করতে না যায়, এতে নাকি পুরুষের কামনা বাড়ে। কী আজব! যার কামনা বাড়ে তার দোষ নেই। কিন্তু একজনের অধিকার কীভাবে খর্ব করে দেয়ার পাঁয়তারা চলছে