মৌলিক অধিকার বনাম মানবাধিকার

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:৫৮ পিএম, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯

শাহাদাৎ হোসেন মুন্না

মৌলিক অধিকারগুলোই কি মানবাধিকার। নাকি মানবাধিকারের খানিক অংশ মৌলিক অধিকার? দুটি বিষয়ই কি এক? একটা কি অপরটির পরিপূরক নাকি প্রতিটিই স্বতন্ত্র? প্রশ্নগুলো অনেক সময়ই দ্বিধায় ফেলে। বুঝি আবার ঠিক বুঝতে পারছি না এমন ইতস্তত পরিস্থিতিতে পড়েন অনেকেই। গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি খোলাসা থাকা জরুরি।

মৌলিক অধিকার বলতে আমরা সেসব অধিকারকে বুঝি, যা কোনো দেশের সংবিধান স্বীকৃত এবং যা বাস্তবায়নের ব্যাপারে সাংবিধানিক নিশ্চয়তাও দেয়া হয়। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, মৌলিক অধিকারগুলো সবই মানবাধিকার, তবে পার্থক্য আছে। বিশেষ কারণেই রাষ্ট্র মৌলিক অধিকারকে মানবাধিকারভুক্ত হিসেবে ঘোষণা দিতে চায় না। আইন বিশ্লেষকদের দাবি, মানবাধিকারগুলো আইনগতভাবে প্রয়োগ বাধ্যতামূলক নয়। মৌলিক অধিকার আদালতের মাধ্যমে প্রয়োগ করতে পারবেন। সংবিধানে কিছু মৌলিক অধিকার নির্দিষ্ট আছে।বাংলাদেশে কোনো আইন যদি মৌলিক অধিকার পরিপন্থী হয় তাহলে তা বাতিল হবে।

আমি মনে করি, মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকারের সুস্পষ্ট সূক্ষ্ম বিভাজনটার বিষয়ে না জানার কারণে অধিকার আদায় প্রশ্নে কিছু ফাঁক থেকে যায়। এসব নিয়ে কাজ করতে বাংলাদেশের দায়িত্বশীল সংস্থার সংখ্যাও কিন্তু হাতেগোনা।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সুলতানা কামালের মতে, মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকারের পার্থক্যের বেশি নয়। মানবাধিকারের সূত্রগুলো মৌলিক অধিকারের ওপর ভিত্তি করেই হয়। একজন মানুষ মানুষ হিসেবে জন্মেছে বলেই কিছু অধিকার সে দাবি করতে পারে। মানবাধিকারে তার চলাচলের অধিকার, জীবনের অধিকার থাকবে, বিশ্বাসের অধিকার থাকবে, বাকস্বাধীনতা থাকবে। এগুলোও মৌলিক অধিকার।

তিনি আরও মনে করেন, রাষ্ট্র যে মৌলিক অধিকারগুলো সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে কখনও কখনও সেগুলোকে মানবাধিকার বলে স্বীকার করতে চায় না। কারণ, নাগরিক সেই অধিকার না পেলে রাষ্ট্র দিতে বাধ্য থাকে।

বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হলো তখন পাঁচটি মৌলিক অধিকার নির্ধারিত হলেও সেগুলো মানবাধিকার হিসেবে গৃহীত হলো না। কিন্তু আমাদের ৩১ থেকে ৩৫ ধারায় মানবাধিকারের বিষয়গুলো আনা হলো। অর্থনৈতিক সামাজিক সাংস্কৃতিক অধিকারকে মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হলো না। কিন্তু নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারকে মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হলো।

বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ব্যারিস্টার তানজীব উল আলমের মতে, মানবাধিকার আইনগতভাবে প্রয়োগ সবসময় বাধ্যতমূলক নয়। মানবাধিকারের বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক সনদের মাধ্যমে বলা আছে। মানবাধিকারগুলো আইনগতভাবে প্রয়োগ করতে সব দেশ সবসময় বাধ্য নয়। সংবিধানে কিছু মৌলিক অধিকার নির্দিষ্ট আছে। বাংলাদেশের কোনো আইন যদি মৌলিক অধিকারপরিপন্থী হয় তাহলে বাতিল হবে। মৌলিক অধিকার অনেক শক্তিশালী, নাগরিককে ব্যাপক অর্থে নিরাপত্তা দেয়। সব মানবাধিকার মৌলিক অধিকার নয়। মানবাধিকার অনেক উঁচু মাপের অধিকার, যেটির মধ্যে মৌলিক অধিকারের কথাও রয়েছে।

মানবাধিকারকর্মী নূর খান বলেন, মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অতীব জরুরি অধিকার সেগুলো মৌলিক অধিকার। এ অধিকারের পাশাপাশি এটি নিশ্চিত করার জন্য মানুষের কথা বলা, প্রতিবাদ করা, সমস্যার কথা তোলা, এই অধিকারটাই মানবাধিকার।

বাংলাদেশে সেই অধিকার কতটুকু নিশ্চিত হচ্ছে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অনেক উন্নয়ন সাধিত হলেও মানুষের স্বস্তির জায়গা, বেঁচে থাকার জন্য যে অধিকার দরকার সেগুলো অনেকক্ষেত্রেই সংকুচিত। গুম-ক্রসফায়ারের নামে যে ঘটনা, বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি প্রবাহিত, এটার মধ্য দিয়ে সমাজে একটি অংশে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। মানবাধিকার নিয়ে কাজ করেন, এমন অনেকেই মনে করেন, দেশে মানবাধিকার সংস্থাগুলো যথেষ্ট শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারছে না। না পারার কারণ থাকতে পারে। কিন্তু সমাজে রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকলে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শ. ম. রেজাউল করিম মনে করেন বাংলাদেশে প্রত্যাশিত মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে মানবধিকার নেই এটি বলার সুযোগ নেই। মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকারের পার্থক্যের জায়গা নির্দিষ্টই আছে, সেটি বিবেচনায় রাখা জরুরি।

তিনি বলেন, মৌলিক অধিকার সংবিধান সম্মতভাবে নির্ধারিত। যেকোনো নাগরিকের সহজাত অধিকারগুলোকে মানবাধিকার বলা হয়।এর নির্দিষ্ট সীমারেখা করে দেয়া হয়নি।

উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, আমি রাস্তায় চলাচলের অধিকার রাখি, যদি কেউ বলে আমি সে রাস্তায় যেতে পারব না সেটা মানবাধিকার লঙ্ঘন। কিন্তু এটি মৌলিক অধিকার নয়। একজন চাকরি পচ্ছে না, এটা মৌলিক অধিকার নয়। কিন্তু যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও চাকরি না দেয়া মানেই তার প্রতি অমানবিক আচরণ করা হয়েছে। তার মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে কোনো মানুষই যেন মানবাধিকার বা যেকোনো অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়, সেই প্রত্যাশাই করি। সচেতন শ্রেণির আমরা যারা মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করি তারা মানুষের মানবাধিকার রক্ষায় আজ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হই, এটাই আজকের কামনা।

লেখক : ভাইস চেয়ারম্যান, সৃষ্টি হিউম্যান রাইটস সোসাইটি।

বিএ/পিআর