অনুপস্থিত ভোটারের ম্যান্ডেট

ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল
ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল
প্রকাশিত: ১১:০০ এএম, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০

মাত্রই শেষ হয়েছে ঢাকার দুই সিটির মেয়র নির্বাচন। নির্বাচিত হয়েছেন দুজন মেয়র। একজন নতুন হলেও অন্যজন পুনর্নির্বাচিত। সাথে নির্বাচিত হয়েছেন শতাধিক কাউন্সিলরও। তবে তাদের নিয়ে কারও তেমন একটা মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। একদম নির্বাচনের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন এমনটা ছাড়া এমনকি দলীয় নেতারাও সম্ভবত জানেন না তাদের নিজ নিজ দলের কজন কাউন্সিলর কোথায় কোথায় জিতেছেন বা হেরেছেন। নির্বাচনের আগে-পরে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়েছে বিস্তর। নির্বাচনে অনিয়ম, ইত্যাদি ইত্যাদি বিষয়ে বিরোধী দলের রুটিন অভিযোগ ছিল যথারীতি। ছিল বিদেশি দূতাবাসের কাছে লবিং আর নালিশও। অনেক দিন পর দূতাবাসগুলোর সক্রিয়তাও ছিল লক্ষনীয়, কখনও কখনও যা ছাড়িয়েছে শিষ্টাচারের মাত্রা। এ নিয়ে অভিযোগও করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকার ও সরকারদলীয় একাধিক দায়িত্বশীল ব্যক্তি। তবে সবকিছু ছাপিয়ে যা আলোচনায় এসেছে তা হলো নির্বাচনে ভোটারের অপ্রতুলতা।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জাতীয় নির্বাচনের চেয়ে ভোটার কম হবে এমনটাই প্রত্যাশিত। কারণ এ নির্বাচনে ক্ষমতা পরিবর্তনের কোনো বিষয় থাকে না। তারপরও এবারের ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে মেয়রদের পাশাপাশি শতাধিক ওয়ার্ডে কাউন্সিলর নির্বাচনের বিষয়টিও ছিল। কাজেই নয় মাস আগে ঢাকা উত্তরের মেয়রের উপনির্বাচনের সময়কার খাঁ খাঁ ভাবটা এবারে নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রগুলোয় থাকবে না বলেই নির্বাচনবোদ্ধারা ধারণা করেছিলেন। কিন্তু কার্যত হয়েছে উল্টোটা। নির্বাচনের দিন সব ছিল, ছিল পর্যাপ্ত নিরাপত্তা আর একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের সব প্রস্তুতি। ছিল মিডিয়ার দৌড়ঝাঁপও। প্রধান দুটি দলের প্রার্থীদের কেন্দ্র থেকে কেন্দ্র চষে বেড়ানো ছিল আর উপরি ছিল ভোটের নতুন অনুসঙ্গ ইভিএম মেশিন। এই প্রথমবারের মতো ঢাকার দুটি সিটি করপোরেশনের সবগুলো সেন্টারে পেপারলেস ভোট অনুষ্ঠিত হলো।

এত কিছু ছিল, ছিল না শুধু ভোটার। আমার ভোট ছিল বনানী বিদ্যানিকেতন কেন্দ্রে। নির্বাচনের দিন আমার অভিজ্ঞতাটাও এমনটাই। এ নিয়ে অবশ্য রাখঢাকও করেননি কেউই। স্বীকার করেছেন যেমন প্রার্থীরা, তেমনি স্বীকার করেছেন নির্বাচন কমিশনও। সম্ভবত ৩০ শতাংশ ভোটারও এবার নির্বাচনের দিন ছুটির আমেজ কাটিয়ে ভোটকেন্দ্রে যেয়ে ভোট দেয়ার তাগিদ অনুভব করেননি। নির্বাচনের পর থেকেই সাম্প্রতিক করোনাতাণ্ডবের আগপর্যন্ত এ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণে ব্যস্ত ছিল আমাদের মিডিয়া আর টক-শোতে বুদ্ধিজীবীরা। জনপ্রিয় প্রার্থী না থাকা, ভোটের আগে ইভিএম সম্পর্কে বিরোধী দলের নেতিবাচক প্রচার থেকে শুরু করে নির্বাচনী সহিংসতার আশঙ্কা এমনি অনেক কারণ আলোচনায় উঠে এসেছে।

ভোটের দিন যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকায় এক করপোরেশনের যেসব বাসিন্দা অন্য করপোরেশনের ভোটার তারা ভোট দিতে যেতে পারেননি। এটিও ভোটার অনুপস্থিতির কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বিজয়ী একজন প্রার্থী বলেছেন, দেশ উন্নত হতে থাকায় ভোটাররা নির্বাচনে আগ্রহ হারিয়েছেন। এটা সত্যি যে উন্নত দেশে ভোটাররা ভোট দেন কমই। আমার মনে আছে ৯৮’এ আমি যখন লন্ডনে ডাক্তারি করি, বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে ভোটের দিন লন্ডনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোট দিতে গিয়ে ভোটকেন্দ্র খুঁজে পেতেই নাভিশ্বাস ওঠার জোগার হয়েছিল। একে তো কোনো প্রচার-প্রচারণার বালাই নেই, তার ওপর নেই মানুষের আগ্রহ। অফিসফেরত মানুষের ভোট দেয়ার সুবিধার জন্য সেখানে রাত পর্যন্ত ভোট চললেও ভোটার মেলাদায়। ভোটার খুঁজে না পাওয়ার কারণ খুঁজলে-ঘাটলে কারণ পাওয়া যাবে হয়তো এমনি আরও অনেক-ই। এর কোনটা ঠিক আর কোনটা বেঠিক তা নিয়ে বিতর্ক আর আলোচনাও হতে পারে দীর্ঘ। তবে কারণ যাই হোক, অনেকেরই ধারণা ভোটকেন্দ্রে ভোটারের অনুপস্থিতি, নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি মানুষের অনাস্থার প্রতিফলন। আমার আপত্তিটা এখানেই আর এই লেখার অবতারণাটাও সে কারণেই।

আমাদের দেশের নির্বাচনী ইতিহাস যদি ঘাটেন দেখবেন এদেশে নির্বাচনে বড় সংখ্যায় ভোটারের উপস্থিতি প্রথম দেখা গিয়েছিল ১৯৭০’এ। এরপর দীর্ঘ বিরতিতে ১৯৯১’এ এবং তারপর আবার ২০০৯’এ। আর এই যে তিন দশকের তিনটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এই তিনটি নির্বাচন, এদেশের মানুষ যেগুলোতে ভোট দিয়েছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রাণের তাগিদ থেকে, এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটা বিশেষ কারণ মানুষকে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে এসেছিল। আর তা হলো এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই মানুষ পরিবর্তন চেয়েছিল। ৭০’এর নির্বাচনে ইস্যু ছিল পাকিস্তানের দুঃশাসন আর শোষণের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। ৯০’এর গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতনের পর ৯১’এ মানুষ ভোট দিতে গিয়েছিল গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনার তাগিদ থেকে। ২০০৯’এর ইস্যু ছিল প্রায় কাছাকাছি। ছদ্মবেশী সেনাশাসনে হঠাৎ পথভ্রষ্ট গণতন্ত্রকে এই নির্বাচনের মাধ্যমে এদেশের মানুষ আবার সঠিক ট্র্যাকে ফিরিয়ে এনেছিল।

এবারের ঢাকার সিটি করপোরেশন দুটির নির্বাচনে এসবের কোনো উপলক্ষই ছিল না। পাশাপাশি নির্বাচনে রাজধানীর মেয়রদের পাল্টে দিয়ে সরকারকে কোনো মেসেজও পাঠাতে চাননি নগর তথা দেশের মানুষ। দেশের যে চলমান উন্নয়ন প্রক্রিয়া তাতে সন্তুষ্ট সাধারণ জনগণ। দুর্নীতি আর অনিয়মে যেটুকু অসন্তোষ, সাম্প্রতিক শুদ্ধি অভিযানগুলোয় তাও প্রশমিত বহুলাংশেই। ১ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে মানুষ তাই পরিবর্তন চায়নি, চায়নি পরিবর্তনের মেসেজ দিতেও। কাজেই ভোটকেন্দ্রে আর সবকিছু থাকলেও ভোট দিতে আগ্রহী ভোটারের দেখা মেলেনি। এবারের নির্বচানে ভোটারের অনুপস্থিতির মূল কারণ আমার কাছে এটাই। ইদানীং টিভি টকশোতে আমাকে যা ডাকাডাকি তা মূলত করোনাভাইরাস নিয়ে বলার জন্যই। কিন্তু তার আগে নির্বাচন নিয়ে বলতে যখনই ডাক পেয়েছি আমি এই কথাই বলেছি। বলেছি সুভাষ সিংহ রায় দাদার সঞ্চালনায় বিটিভির খবর প্রতিদিনে আর জিটিভিতে অঞ্জন রায়ের জি ডায়ালগে।

ঢাকার সর্বশেষ নির্বাচনে ৭০ শতাংশ ভোটারের অনুপস্থিতি আমার দৃষ্টিতে তাই নির্বাচিত দুই মেয়রের ওপর চাপটা অনেক বেশি বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা ৩০ শতাংশ ভোটারের ভোটে নির্বাচিত মেয়র নন। তাদের পেছনে আছে আরও সত্তর শতাংশ নগরবাসীর নিঃশর্ত, মৌন সমর্থন। তাদের কাছে এদের প্রত্যাশা অনেক। সঙ্গত কারণেই নগরের পিতা হিসেবে তাদের দায়িত্বও অন্য যেকোনো সময়ের যেকোনো নগর পিতার চেয়ে অনেক বেশি। এখন দেখার বিষয় অনুপস্থিত ভোটারদের ম্যান্ডেটের যে শক্তি, তা ধারণ করে তারা আগামী পাঁচটি বছরে আমাদের কী উপহার দেন।

লেখক : অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, হেপাটোলজি বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়।
এবং সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ।

এইচআর/বিএ/এমএস