নারী ও শিশু নির্যাতন : করোনাকালে উদ্বেগ

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১:১০ এএম, ২২ মে ২০২০

 

সোহাগ ফেরদৌস

করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে স্থবির হয়ে পড়েছে গোটা বিশ্ব। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী বিশ্বে প্রায় ৫২ লাখ মানুষ এ ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়েছেন। আর মৃত্যুবরণ করেছেন প্রায় তিন লাখ ৩৪ হাজার মানুষ। এ মৃত্যুর মিছিল প্রতিনিয়ত দীর্ঘ হচ্ছে। মৃত্যু ও আক্রান্ত ঠেকাতে দেশে দেশ চলছে লকাডাউন-কারফিউ। উন্নত দেশগুলো এ ভাইরাসের আঘাতে পর্যুদস্ত। এককভাবে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটিতে ৯৬ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তাই ট্রাম্পের দাবি সামনে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে তাকে হারাতেই চীন পরিকল্পিতভাবে এ ভাইরাসটি ছড়িয়েছে। ট্রাম্পের দাবি প্রমাণসাপেক্ষ হলেও ভাইরাসটি চীনের উহান থেকেই বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে, এ তো সত্য।

অদৃশ্য এই ভাইরাসটির আঘাতে ভেঙে পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতি। বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০০৮ সালের বৈশ্বিক মন্দার থেকেও ভয়াবহ মন্দায় পড়তে যাচ্ছে বিশ্ব। এদিকে এখনও পর্যন্ত ভাইরাসটির কার্যকরী কোনো ভ্যাকসিন আবিষ্কার না হওয়ায় দেশে দেশে বেড়ে চলছে লকডাউন পরিস্থিতি। এতে বিশ্বব্যাংকের ভবিষ্যৎবাণী বা সতর্কবার্তাটি বাস্তবে রূপ নিতে হয়তো খুব দেরি নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী ৭০টিরও বেশি দল করোনার ভ্যাকসিন বা টিকা আবিষ্কারে দিনরাত কাজ করছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রাণী ও মানবদেহে পরীক্ষামূলকভাবের এর কয়েকটি টিকার প্রয়োগ করা হয়েছে। প্রয়োগকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠান সফল দাবি করলেও এখনও এর সফলতা বিশ্ব স্বীকৃত নয়।

এদিকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যমতে, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী সেপ্টেম্বরে আবিষ্কার হতে পারে এর কার্যকরী টিকা। আবার অনেক সংস্থার মতে এখনও এক বছর বা দেড় বছর লেগে যেতে পারে করোনার টিকা আবিষ্কারে। করোনার টিকা আবিষ্কারে গবেষণা চলছে, হয়তো খুব দ্রুত সফলও হবে এ গবেষণা। এমনটাই প্রত্যাশা বিশ্ববাসীর।

বাংলাদেশে করোনা আঘাত হানে গত ৮ মার্চ। এখন পর্যন্ত এ ভাইরাসটিতে আক্রান্ত সংখ্যা ৩০ হাজার ছুঁই ছুঁই। আর মৃত্যু হয়েছে চারশরও বেশি মানুষের। লকডাউনে যখন সবাই ঘরবন্দি তখন হায়েনার মতো হিংস্র উল্লাসে মেতেছে একদল মানুষরূপী পশু। সবাই ব্যস্ত শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে জীবন বাঁচাতে ঠিক তখনই দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন-ধর্ষণ মহামারি আকার নিয়েছে।

বিভিন্ন সংস্থার তথ্যমতে, লকডাউনে বেড়েছে নারী নির্যাতন। যেসব নারী কখনও নির্যাতনের শিকার হননি তারাও করোনাকালে বিভিন্নভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বেসরকারি সংস্থার মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, গত এপ্রিল মাসে চার হাজারেরও বেশি নারী ও ৪৫৬ শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এসব নারীদের শারীরিক, মানসিক, যৌন নির্যাতন ছাড়াও ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়েছে। আর শিশুরা পারিবারিক সহিংসতা, বাল্যবিয়ে, ধর্ষণ, অপহরণ ও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। আর চলমান মে মাসের প্রথম ১৫ (১৬ মে পর্যন্ত) দিনে শুধু নারী ও শিশু ধর্ষণের প্রায় অর্ধশতাধিক ঘটনা সংবাদমাধ্যমে এসেছে।

এর মধ্যে সমকালের এক নারী সাংবাদিকের ওপর নির্যাতনের বিষয়টি সর্বশেষ আলোচিত। তার ওপর নির্যাতনকারীও আবার আরেক সাংবাদিক। যাদের সমাজের বিবেক বলা হয়, তাদের দ্বারাই যখন নির্যাতনের ঘটনা ঘটে তখন হতাশা-ক্ষোভ বাড়ে।

গত ৫ জানুয়ারি রাজধানীর কুর্মিটোলায় এক ঢাবি শিক্ষার্থী ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর সারাদেশ ক্ষোভে ফুসে ওঠে। বিশেষ করে ছাত্র সংগঠনগুলো। এরপর খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্রেফতার হয় ধর্ষক। এ বছর সবচেয়ে আলোচিত ধর্ষণের ঘটনা এটিই। আলোচিত ঘটনার বাইরে প্রতিনিয়ত যে নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে তার গুটিকয়েক হয়তো সংবাদমাধ্যমে আসছে এবং মামলা হচ্ছে। বাকিগুলো লোকলজ্জার ভয়ে অগোচরেই থেকে যাচ্ছে।

গত ২ মে ইফতারের দাওয়াত দিয়ে সিলেটের জৈন্তাপুরে লিডিং ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের এক ছাত্রীকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান তার খালা সুমি। ইফতার শেষে সুমি ওই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে চায়ের সাথে ঘুমের ও নেশা জাতীয় ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে সুমি বেগমের সহায়তায় তার স্বামী কায়েছ আহমদ ভিকটিমকে ধর্ষণ করে। আর সুমি বেগম মুঠোফোনে ধর্ষণের ভিডিও ধারণ করেন। এ ঘটনায় মামলা হলে অবশ্য গ্রেফতার হন ধর্ষক খালু।

গত ১১ মে ফরিদপুরের সদর ও মধুখালী উপজেলায় একই দিনে দুই শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আড়াই বছরের এক শিশু। আবার নাটোরে মক্তবে কোরআন শরীফ শিখতে গিয়েও একজন হাফেজের হাতে ধর্ষণের শিকার হয়েছে এক শিশু। এর আগে গত ১২ মার্চ রাজধানীতে কোরআন শিখতে গিয়ে মসজিদের মধ্যেই ধর্ষণের শিকার হয়েছে এক শিশু।

আমাদের দেশের শিশুরা ছোটবেলায়ই বিভিন্নভাবে যৌন হয়রানির শিকার হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বান্ধবী ছোটবেলায় তার স্কুলের বয়স্ক দফতারির কাছে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছিলেন। প্রায় দুই দশক পরও সেই স্মৃতি হাতড়ে এখনও শিউরে ওঠেন তিনি। এখনও নাকি মাঝেমধ্যে স্বপ্নে বিশালদেহী কেউ তাকে তাড়া করে। আর ঘুম থেকে জেগে উঠে কান্নায় ভেঙে পড়েন। এভাবেই প্রত্যেকটি শিশু ক্ষতগুলো বয়ে বেড়ায় আজীবন।

গত বছরের মার্চে মফস্বলের এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী তার টিউশনির ছাত্রীর বাবার যৌন হয়রানির শিকার হয়েছিলেন। এরপর দেখেছি হাসপাতালের কেবিনে ছাত্রীটির যন্ত্রণা। আর তার বাবার অসহায় চাহনি। আর বোনের নীরব কান্না। ঘটনার পর স্মৃতি হারিয়ে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন ওই ছাত্রী। ঘটনা ভিন্নখাতে গড়ানোর জন্য প্রভাবশালী মহল চালায় নানা ফন্দি-ফিকির। দীর্ঘ এক মাস চিকিৎসার পর স্মৃতি ফিরে পেলে ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে ওই ছাত্রী সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা করলে গ্রেফতার হয় সেই মানুষরূপী পশুটি। পরে জামিনে মুক্তিও পায়।

ঘটনার পর বদলে যায় তার পরিচিত জগৎ। তবে ওই ছাত্রী সাহসিকতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে কিছুটা স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। কিন্তু তিনি কি কখনও ভুলতে পারবেন এই ঘটনা? বরং তাকে কুড়ে কুড়ে যন্ত্রণা দেবে বাকি জীবন। এভাবে প্রতিটি ঘটনার শিকার নারী বা শিশু হয়তো কখনও আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে না। দুঃস্বপ্ন তাদের তাড়া করে প্রতিনিয়ত।

ধর্ষণ পরবর্তী সামাজিক ও আইনি হয়রানির ভয়ে ঘটনার শিকার সবাই আইনের দ্বারস্থ না হওয়ায় অধিকাংশ ঘটনাই অন্তরালে থেকে যায়। ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশুর আলামত সংগ্রহ থেকে আদালতে জবানবন্দি পর্যন্ত এক দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। আর ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে তাকে কয়েকবার মানসিক ধর্ষণের শিকার হতে হয়। এতে আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়ার উৎসাহ হারাচ্ছেন অনেকে।

আবার এসব প্রক্রিয়া পাড়ি শেষে ধর্ষকের হয়তো সাজা হয়। অনেক সময় আবার কোনো ফাঁক-ফোকর দিয়ে অনায়াসে বেড়িয়ে যায় ধর্ষক নামের নরপশুরা। বাইরে বের হয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়ায় ঘটনার শিকার নারী বা শিশুর পরিবারটিকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেয়ার ঘটনা পত্রিকায় আসে অহরহ। তাই চলমান আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগের সঙ্গে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা জরুরি। তাতে যদি কিছুটা কমে এই ভয়ঙ্কর মহামারির প্রকোপ।

দেশে তথা বিশ্বে চলমান করোনাভাইরাস মহামারির হয়তো ভ্যাকসিন বা টিকা একসময় আবিষ্কার হবে, মুক্তি পাবে মানবজাতি। কিন্তু ধর্ষণ নামক মহামারির টিকা কবে আবিষ্কার হবে বা এর টিকাই বা কী হতে পারে, কবে মুক্তি পাবে নারী আর আমাদের ছোট্ট সোনামণিরা?

লেখক : সাংবাদিক

এইচআর/বিএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]