ভারত-নেপাল বিরোধ, ঘৃণায় রূপ নিয়েছে

আনিস আলমগীর
আনিস আলমগীর আনিস আলমগীর , সাংবাদিক ও কলামিস্ট
প্রকাশিত: ১২:১৫ পিএম, ২৮ মে ২০২০

ভারতের সঙ্গে এক বাংলাদেশ ছাড়া সব প্রতিবেশীর এখন সম্পর্ক খারাপ। এই খারাপের মধ্যে এখন চীন ভারতের সঙ্গে লাদাখে যুদ্ধ বাঁধানোর প্রস্তুতি নিয়েছে। বিশেষ করে লাদাখে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর প্রবল উত্তেজনা বিরাজ করছে। চীন সেখানে ভারতীয় এলাকায় ঢুকে পড়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। ভারতের পানিসীমা ও আকাশসীমা লঙ্ঘনেরও অভিযোগ উঠছে বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে। লাদাখ ও উত্তর সিকিমে দুই দেশই সেনা ও সমরাস্ত্রের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়িয়েছে।

এদিকে, চীন-ভারত উত্তেজনা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় যত শোরগোল তার চেয়ে ভারত-নেপালের উত্তেজনা নিয়ে নেটিজেনরা হাউকাউ করছে বেশি। বিরোধপূর্ণ একটি এলাকাকে ভারত-নেপাল দুই দেশই তাদের মানচিত্রে দেখানোকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যে বিরোধ চলছে এখন, তারসঙ্গে যুক্ত হয়েছে মোদি সরকারের লেলিয়ে দেয়া কয়েকটি টিভি চ্যানেল, যাদের কাজই হচ্ছে সাংবাদিকতা বাদ দিয়ে জাতীয়তাবাদের ধোয়া তুলে সারাবছর পাকিস্তান, কখনও চীন, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, কখনওবা নেপাল-ভুটানের বিরুদ্ধে বিষবাষ্প ছড়ানো। আর নিজ দেশের মুসলমানদের বিরুদ্ধে অনবরত সাম্প্রদায়িক বিষ ছড়ানো তো আছেই। তাদের সর্বশেষ এজেন্ডা নেপাল, দৃশ্যে আসছে চীনও।

সম্প্রতি হিমালয়ের কৈলাস মানস সরোবর যাওয়ার জন্য ভারত একটি বাইপাস রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নিলে দেশটির সঙ্গে কূটনৈতিক বিরোধে জড়ায় নেপাল। সীমান্তের বিতর্কিত সেই ভূখণ্ডকে নিজেদের মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় নেপালের মন্ত্রিসভা। এটাই সাম্প্রতিক বিরোধের বহিঃপ্রকাশ, যদিও কূটনৈতিকভাবে ৩৩৫ বর্গ কিলোমিটার বিরোধপূর্ণ এলাকাটি নিয়ে তারা সমাধানে আসার চেষ্টা করছে অনেকদিন ধরে।

কালাপানি এলাকাটি যে তাদের, নেপালিরা এই দাবির পক্ষে ঐতিহাসিক দলিল-পত্র দেখাচ্ছে আর ভারতীয়রা তা মানার পরিবর্তে এলাকাটি যে কয়েক যুগ ধরে তাদের নিজেদের কব্জায় আছে সেটা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। ভারতীয়রা বেশি আহত হচ্ছে যে, নেপাল এটা সাহস পায় কী করে! কারণ নেপাল ও ভারত এমন দুটি রাষ্ট্র তাদের নাগরিকদের এক দেশ থেকে অন্য দেশে যেতে পাসপোর্ট-ভিসা লাগে না, অবাধে চাকরি করতে পারে। এমনকি ভারতের সেনাবাহিনীতে বীরত্বের সঙ্গে কাজ করছে নেপালিরা। ঘনিষ্ঠতা যখন এমন পর্যায়ে তখন নেপালের সাম্প্রতিক কাণ্ড ভারতীয়দের জন্য অবাক করারই মতোই বটে।

নেপাল ভারতের উত্তর-পূর্ব দিকে হিমালয় পর্বতের মধ্যে এক লাখ ৪৭ হাজার ৫১৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা অধ্যুষিত একটি দেশ। লোক সংখ্যা প্রায় তিন কোটি। স্থলভূমি দ্বারা পরিবেষ্টিত বলে বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য ভারত, চীন আর বাংলাদেশের ওপর নির্ভরশীল। ভারতের কলকাতা বন্দর ব্যস্ত বন্দর বলে সাধারণত নেপাল বাংলাদেশের মোংলাবন্দর তার আমদানি-রফতানির কাজে ব্যবহার করে থাকে। আর বিমানে মালামাল আনা-নেয়া করলে বাংলাদেশের সৈয়দপুর বিমানবন্দর ব্যবহার করে। বাংলাদেশের সঙ্গে সমঝোতা হওয়ায় বাংলাদেশ সৈয়দপুর বন্দরকে সম্প্রসারিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে নেপালকে।

নেপালের জনসংখ্যা হিন্দু বেশি হলেও গৌতম বুদ্ধের জন্ম নেপালে। তার জন্মস্থান লুম্বিনিতে সম্রাট অশোক ২৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে একটি বৌদ্ধস্তম্ভ নির্মাণ করেছিলেন। নেপাল নামের অর্থের মাঝেও একটি পবিত্রতা আছে। ‘নে’ মানে পবিত্র আর ‘পাল’ মানে গুহা অর্থাৎ পবিত্র গুহা। নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর উপত্যকায় প্রাপ্ত নিওলিথিক যুগের বেশ কিছু উপাদান এটাই নির্দেশ করে যে হিমালয় অঞ্চলে প্রায় নয় হাজার বছর থেকে মানুষ বসবাস করছে। নেপাল খুবই প্রাচীন জনপদ। একাদশ শতাব্দীর শেষভাগে ভারতের চালুক্য সাম্রাজ্যের অধীনে নেপাল আসে। চালুক্য রাজারা হিন্দু ধর্ম প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালায় যে কারণে বৌদ্ধরা সংখ্যালঘু হয়ে যায়।

১৭৭৮ সালে নেপালে শাহ রাজবংশের পত্তন হয়। পৃথ্বী নারায়ণ শাহ ছিলেন তার প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ছিলেন মহাপরাক্রমশালী গোর্খা রাজা। এরপর এ দেশটি রাজারা দখল করে নেয়। আমরা ছোটকালে শুনতাম তাসের রাজা আর বৃটেনের রাজা ছাড়া দুনিয়াতে আর কোনো রাজা থাকবে না। অবশ্য ১৬৮৮ সালে বিপ্লবের পর বৃটেনের রাজাকেও পার্লামেন্টের কাছে সব ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হয়। তিনি শুধু বিলে দস্তখতের মালিক। বৃটেনের পার্লামেন্ট যদি রাজার মৃত্যুদণ্ডের বিল পাস করে তবে তাকে সেই বিলেও দস্তখত করতে হবে। পার্লামেন্টের ইচ্ছায় রাজকীয় সিলমোহর প্রদানও তার কাজ।

যা হোক, শেষ পর্যন্ত নেপালেও রাজতন্ত্রের অবসান হয়েছে। এখন সংসদীয় গণতান্ত্রিক সরকার বিদ্যমান। নেপালি কংগ্রেস আর মাওবাদী নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি- প্রধান দুটি দল। ক্ষমতায় তারাই আসা-যাওয়া করছে। ভূ-প্রকৃতির বৈচিত্র্য অনুসারে নেপাল তিন ভাগে বিভক্ত- পর্বত, পাহাড়ি উঁচুভূমি এবং নিচে সমতলভূমি, যাকে তরাই বলে। মধ্যের পাহাড়ি উঁচুভূমিতে লোকসংখ্যা বেশি, নিম্নের তরাইতেও জনবসতি আছে। উত্তরের পার্বত্য অঞ্চলে লোবসতি বিরল। তরাই অঞ্চল সংলগ্ন একটি খাল কাটা হয়েছে যা উত্তরপ্রদেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আর এই খাল দিয়ে হিমালয়ের পানি মধ্যভারতে সরবরাহ করা হয়।

১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তির সময় উত্তর অংশে তিনটি রাজাশাসিত রাষ্ট্র ছিল- নেপাল, ভুটান এবং সিকিম। এই রাষ্ট্রগুলোর স্বতন্ত্র স্বাধীন অস্তিত্ব ছিল। ইংরেজরা কখনও এই রাজ্যগুলোকে তাদের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেনি। স্বাধীনতার সময় ভুটান এবং সিকিম তাদের পররাষ্ট্র এবং প্রতিরক্ষা বিষয়ে চুক্তি করে ভারতকে প্রদান করে- তাদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বজায় রাখে। নেপালের রাজা ত্রিভুবনও তা চেয়েছিলেন। কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু রাজা ত্রিভুবনকে বারণ করেন, যে কারণে নেপালের অবস্থা সিকিম, ভুটানের মতো হয়নি।

১৯৬২ সালে চীন-ভারত যুদ্ধের পর সিকিমের গুরুত্ব বেড়ে যায়। যে কারণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নানা ছলাকলা অবলম্বন করে সিকিমকে ভারতের করে নেন। পূর্বে নেপালে যেতে হলে চন্দ্রগিরি গিরিপথের একটি সরু রাস্তা বয়ে যেতে হতো। ১৯৫৬ সালে ভারত-নেপালে যৌথ উদ্যোগে ভারতের রক্সৌল থেকে নেপালের কাঠমান্ডু পর্যন্ত একটি প্রশস্ত সড়ক নির্মাণ করা হয়। এটাই কাঠমান্ডু সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান রাজপথ। এর কয়েক বছর পরে পাহাড় কেটে নেপাল ও চীনের যৌথ উদ্যোগে চীনের লাসা থেকে নেপালের কাঠমান্ডু পর্যন্ত অন্য একটি হাইওয়ে নির্মাণ করা হয়। এখন নেপালের সঙ্গে যোগাযোগের এই দুটি প্রধান পথ। দুই দিকে দুই পথ নির্মাণ করে নেপাল নিজেকে হুমকি থেকে রক্ষা করেছে।

রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় নেপাল সফরে গিয়ে পশুপতি মন্দির দেখতে যান। তার সঙ্গে সোনিয়া গান্ধীও ছিলেন। সোনিয়া গান্ধী খ্রিস্টান এই অজুহাতে পুরোহিতরা তাকে মন্দিরে ঢুকতে দেননি। রাজীব গান্ধী তাতে অপমানবোধ করেছিলেন এবং ১৯৮৯ সালে নেপালের ওপর অবরোধ জারি করেছিলেন। এই অবরোধ ছয় মাস দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল। নরেন্দ্র মোদিও প্রথমবার ক্ষমতায় এসে নেপালের ওপর অঘোষিত অবরোধ জারি করে রাখেন। দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ দিয়েছিলেন। নেপাল রাজ্য পুনর্বিন্যাসের সময় ভারত চেয়েছিল নিচের সমতলভূমি বা তরাই অঞ্চল নিয়ে একটি পৃথক প্রদেশ গঠন করা হোক। তরাই অঞ্চলে ভারতীয় বংশোদ্ভূত লোকেরা বসবাস করে। নেপাল সরকার ভারতের অনুরোধ রক্ষা করেনি বরঞ্চ তরাইকে তিন ভাগ করে তিন প্রদেশের সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছে। এতে ভারতীয় বংশোদ্ভূতরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। সেই থেকে নরেন্দ্র মোদি সরকারের সঙ্গে নেপালের একটি মনস্তাত্ত্বিক বিরোধ চলছে।

আগেই বলেছি, সম্প্রতি নেপালের সঙ্গে ভারতের সীমান্তে রাস্তা তৈরি নিয়ে আচমকা দুই রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। নেপাল এই রাস্তা নির্মাণে তীব্র প্রতিবাদ জানায়। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং রাস্তাটি উদ্বোধন করেন। হিমালয়ের একটা গিরিপথের নাম লিপুলেখ। এই গিরিপথের দক্ষিণে ভূখণ্ডটির নাম কালাপানি। এলাকাটির সামরিক গুরুত্ব রয়েছে। ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের সময় নেহরু এবং কৃষ্ণ মেননের অনুরোধে নেপাল ভারতকে সৈন্য সমাবেশ করতে দিয়েছিল। কালাপানিতে এই সমাবেশটি অব্যাহতভাবে ছিল। এখন ভারত ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি রাস্তা নির্মাণ করেছে লিপুলেখের সঙ্গে কালাপানির সংযোগ সৃষ্টির প্রয়োজনে, যাতে লোকজন সহজে লিপুলেখ হয়ে তিব্বতের কৈলাস মানস সরোবর যেতে পারে। আগে সিকিম হয়ে সেখানে যেতে প্রায় পাঁচদিন লাগতো। ভারত শুধু রাস্তা নির্মাণ করেনি, কালাপানি এলাকাকে গত নভেম্বরে তাদের নতুন ম্যাপে অন্তর্ভুক্ত করে দেখায়।

এরপরই নেপালের পার্লামেন্টে এর বিরুদ্ধে ঝড় বয়ে যায়। রাজপথ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এরমধ্যে গত ১৫ মে ভারতের সেনাপ্রধান আগুণে ঘি ঢেলে দেয়ার মতো মন্তব্য করেন যে, এই বিক্ষোভের পেছনে চীনের হাত রয়েছে। পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যায়। নেপাল দাবি করে সমগ্র এলাকা ১৮১৬ সালের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে নেপালের মধ্যে স্বাক্ষরিত সুগাউলি চুক্তি মোতাবেক নেপালের। নেপালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাঠমান্ডুতে ভারতের রাষ্ট্রদূতকে তার দফতরে ডেকে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। ভারত বলছে, ভারত নেপালের জায়গার ওপর কোনো রাস্তা নির্মাণ করেনি। ব্রিটিশরা চুক্তি করলেও একসময় ওই এলাকা আবার নিজেদের মধ্যে নিয়ে নেয়।

সিকিম নেয়ার পর থেকে ভারতের ওপর প্রতিবেশীদের একটা চরম অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে। ভুটানের সঙ্গে এতদিন চীনের কোনো সম্পর্ক ছিল না। গত বছরের সীমান্ত বিরোধের পর এখন ভুটান চীনের কাছাকাছি চলে এসেছে। দূরে সরে গেছে ভারত। এই অঞ্চলে ভারত দাদাগিরির সুবিধা করতে পারছে না চীনের কারণে।

২০০১ সালে নেপালের রাজকীয় হত্যাযজ্ঞের সংবাদ সংগ্রহ করতে কাঠমান্ডু গিয়ে নেপালের লোকদের দেখেছি চরম ভারতবিদ্বেষী। ওই হত্যাযজ্ঞে ভারতের হাত ছিল এটাও নেপালিরা বলে থাকে, যদিও তার কোনো প্রমাণ নেই। বাংলাদেশের লোকদের মধ্যেও ভারতবিদ্বেষ কম বেশি কাজ করে। কংগ্রেস সরকার আমলে সেটা অনেকটা শেষের পথে ছিল। নরেদ্র মোদি সরকারের মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংসতার নীতি এখানে আবার ভারতবিদ্বেষ বাড়াছে।

ভারতের প্রতি প্রতিবেশীদের অনাস্থার কারণে এক বাংলাদেশ ছাড়া কেউই তার বন্ধু নয় কিন্তু ভারত অকারণে সীমান্তে বাংলাদেশিদের গুলি করে হত্যার বীরত্ব ছাড়েনি। ভারত যদি বড় হতে চায় তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে বিরোধ টিকিয়ে রাখা উচিত হবে না। প্রতিবেশী অবন্ধু হলেও ভারত বেশিদূর উপরে উঠতেও পারবে না।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।
[email protected]

এইচআর/বিএ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]