আম্ফান বিধ্বস্ত করোনাকালের কৃষি

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:৩৬ এএম, ৩০ মে ২০২০

মোহাম্মদ লোকমান হোসেন মজুমদার

করোনা মহামারির এ ক্রান্তিকালে সুপার সাইক্লোন আম্ফান আবির্ভূত হয়েছে মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে। ক্ষয়ক্ষতির মূলকেন্দ্র দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকূল হলেও সমগ্র উপকূলীয় এলাকা ও উত্তরাঞ্চলসহ সারাদেশে হয়েছে কমবেশি ক্ষতি। ভারীবৃষ্টির সাথে জোয়ার ও জলোচ্ছ্বাসের তোড়ে বেড়িবাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে বিস্তীর্ণ এলাকা, ভেসে গেছে অসংখ্য মৎস্যঘের ও পুকুর।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় এক লাখ ৭৬ হাজার হেক্টর জমির ধান, সবজি ফসল, ভুট্টা ও ফলের বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঝড়ে ঘরবাড়ি, ফার্ম ও গবাদি পশু-পাখির আশ্রয়স্থলের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে আম ও লিচু, যার পরিমাণ প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে সামগ্রিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

করোনার প্রভাবে বিশ্বে খাদ্য সংকটের সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা সকল বিশেষজ্ঞ একবাক্যে স্বীকার করছেন। সে ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রতি ইঞ্চি আবাদি জমি সদ্ব্যবহারের নির্দেশনা দিয়েছেন। তাই উৎপাদন বাড়াতে উচ্চফলনশীল, বালাইসহনশীল এবং উচ্চ অভিযোজন ক্ষমতাসম্পন্ন ফসল এবং ফসলের জাত চাষ করতে হবে। দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় কৌশলগত উৎপাদন ব্যবস্থাপনা হাতে নিতে হবে। সরকারি-বেসরকারি নার্সারিগুলোতে অতিরিক্ত বীজ বা চারার ব্যবস্থা রাখতে হবে যাতে ফসল একবার নষ্ট হয়ে গেলেও দ্রুত আবার চাষ করা সম্ভব হয়। রোগ-বালাই এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

উপকূলীয় এলাকায় বিশেষ নজর: আম্ফান আক্রান্ত এলাকাসহ উপকূলীয় এলাকায় ভেঙে যাওয়া বাঁধ মেরামত এবং মাটির লবণাক্ততা শোধন করা (মূলত কমিয়ে আনা) বিশেষ প্রয়োজন। এ অঞ্চলের প্রধান ফসল আমন এবং আগাম রবিশস্যের জন্য এ কাজ যত দ্রুত শুরু করা যায় তত মঙ্গল। ভারীবৃষ্টির এ মৌসুমটা লবণাক্ততা ধুয়ে কমিয়ে আনার (ওয়াশ আউট) উপযুক্ত সময়। পার্শ্বনালা দ্বারা এ কাজ করা উত্তম, অর্থাৎ যতটা সম্ভব এক জমির পানি অন্য জমির উপর দিয়ে প্রবাহিত না করা। জমিতে নালা কেটে সারি সারি করে উঁচু বেড (রিজ অ্যান্ড ফারো) তৈরি করেও লবণাক্ততা কমানো যায়, যার উপরে সবজি চাষ করা সম্ভব।

এছাড়া চিংড়ি ও মৎস্যঘেরের পাড়ে এবং সর্জান পদ্ধতিতে সবজি ও ফল চাষ (নারিকেল, পেয়ারা, আমড়া, সফেদা, কুল, আমলকি, লেবু, তেঁতুল, তাল) উপকূলীয় এলাকার জন্য কার্যকরী পদ্ধতি। পরীক্ষিত লবণাক্ততা সহনশীল ফসল বা ফসলের জাত নির্বাচন সবচেয়ে ভালো উপায়। এ জন্য আমন মৌসুমে ব্রি-ধান ৫৩, ৫৪, ৭৩, ৪১ ও ৪২; বোরো মৌসুমে ব্রি-ধান ৪৭, ৬১, বিনা ধান ৮ ও ১০ চাষ করা যেতে পারে। মৌসুমভেদে লবণাক্ততা সহনশীল বিভিন্ন ফসল যেমন: মুগ, ছোলা, খেসারি, ফেলন, বাঁধাকপি, ওলকপি, ঢেঁড়শ, শিম, বরবটি, ভুট্টা, গম, যব, চীনাবাদাম, তিল, সয়াবিন, সূর্যমুখী, সুগারবিট, আখ, তুলা ও পাট এবং চরাঞ্চলে কুমড়া জাতীয় সবজি, তরমুজ, বাঙ্গি, খিরা ও মিষ্টি আলু চাষ করা যেতে পারে।

বন্যাপ্রবণ এলাকার জন্য করণীয়

বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা পানি যোগ হয়ে দেখা দিতে পারে বন্যা। বন্যাপ্রবণ এলাকায় চলতি আউশ মৌসুমে জলাবদ্ধতা সহনশীল ব্রি-ধান ৮৫; আমন মৌসুমে নিমজ্জিত অবস্থায় টিকে থাকার ক্ষমতাসম্পন্ন ব্রি-ধান ৫১, ৫২, ৭৯, ৯১, বিনা ধান ১১ ও ১২ এবং বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর নাবী জাতের আমন ধান বিআর ২২, ২৩, ব্রি-ধান ৪৬, ৭৬, ৭৭ চাষ করা যেতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধ এলাকায় ভাসমান চাষাবাদ (কচুরিপানার স্তূপে সামান্য মাটি দিয়ে টমেটো ও লাউ জাতীয় সবজি) করা যেতে পারে।

খরাপ্রবণ এলাকায় জন্য করণীয়

খরা সহনশীল ধানের জাত যেমন- আউশ মৌসুমে ব্রি-ধান ৪২, ৪৩, ৬৫, বিনা ধান ১৯; আমন মৌসুমে ব্রি-ধান ৫৫, ৫৬, ৫৭, ৬২, ৬৫, ৬৬, বিনা ধান ১৭ এবং আগাম ও স্বল্পমেয়াদি জাত যেমন- ব্রি-ধান ৩৩, ৩৯, ৭১, ৭৫ চাষ করা যেতে পারে। মৌসুমভেদে খরা সহনশীল ফসল যেমন: ভুট্টা, যব, গম, বাজরা, শিম, মাসকালাই, ছোলা, মসুর এবং কুল, পেয়ারা, লেবু, ড্রাগনসহ বিভিন্ন ফলের বাগান। সেচ সুবিধাবিহীন জমিতে খড়কুটা বা কচুরিপানা দিয়ে জাবড়া প্রয়োগ করে স্থানীয় জাতের আলু চাষ করা যেতে পারে। বৃষ্টিনির্ভর ফসলে সম্পূরক সেচের ব্যবস্থা রাখতে পারলে উত্তম।

ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন

চলমান আউশ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত বীজতলায় অংকুরিত বীজ দিয়ে দ্রুত চারা তৈরি করে নেয়া যেতে পারে। তবে বিলম্ব ঝুঁকি এড়াতে আউশ ও আমন উভয় মৌসুমে চাষ উপযোগী জাত যেমন ব্রি-ধান ৪৮, স্বল্পমেয়াদি জাত ব্রি-ধান ৬৫ ও ৮৩ সহ অন্যান্য উপযোগী জাত বেছে নেয়া যেতে পারে। দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনা করে আমন ধানের বীজ সংগ্রহ ও বীজতলা তৈরির প্রস্ততি নিতে হবে এখন থেকেই। আম্ফানের প্রভাবে মাত্র ১০% বোরো জমি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে খুব একটা সমস্যা হবে না।

প্রণোদনা, কৃষিঋণ ও ভর্তুকিসহ উপকরণের সহজলভ্যতা নিশ্চিতকরণ

করোনার মোকাবিলায় ৯ হাজার কোটি টাকাসহ আম্ফানে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য প্রণোদনার কথা ঘোষণা করেছেন মাননীয় কৃষিমন্ত্রী। ৪% সুদে প্রণোদনার পাঁচ হাজার কোটি টাকা ও নিয়মিত ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকাসহ অন্যান্য কৃষিঋণ, ভর্তুকি ও প্রণোদনার টাকা যাতে অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় না হয় সে জন্য কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষিকার্ড হালনাগাদকরণ বা ডিজিটাল কৃষক অ্যাপ ব্যবহার করে টাকা বা উপকরণ সরাসরি প্রকৃত কৃষকের হাতে তুলে দিতে হবে।

কৃষি যান্ত্রিকীকরণে কৃষকদের সম্পৃক্তকরণ

ফসল রোপণ, উৎপাদন, সংগ্রহ ও সংগ্রহত্তোর ব্যবস্থাপনা দ্রুত, সহজ ও স্বল্প খরচে সম্পন্ন করা এবং মোক্ষম সময়ে শ্রমিক সংকট কমাতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর কর্তৃক ৫০-৭০% ভর্তুকিমূল্যে কৃষকদের মাঝে কৃষিযন্ত্র সরবরাহ করা হচ্ছে। এবার শ্রমিক সংকট ও দুর্যোগ এড়িয়ে দ্রুততম সময়ে হাওরের ধান সংগ্রহে কর্তন ও মাড়াই যন্ত্র বিশেষত কম্বাইন্ড হারভেস্টারের ব্যবহার একটি দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ। কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে এবং এ জন্য সমকালীন কৃষি নিশ্চিত করতে হবে।

করোনা পরিস্থিতি যাই হোক, টেকসই খাদ্যনিরাপত্তার জন্য আম্ফানের ক্ষতি মোকাবিলা করে উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। আগামী রবি মৌসুমে ডাল, তেল, সবজি ও মসলা জাতীয় ফসল এবং আলু, গম, ভুট্টা ও বোরো আবাদ নির্বিঘ্ন করতে উপযোগী ও প্রয়োজনীয় বীজের সংস্থান এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আগাম আমদানির কথা মাথায় রাখতে হবে। অপুষ্টি সমস্যা সমাধানে মাঠফসল উৎপাদনের পাশাপাশি উদ্যানফসল অর্থাৎ ফলমূল এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও বিশেষ নজর দিতে হবে।

লেখক : কৃষিবিদ এবং পরিবেশবিদ

এইচআর/বিএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]