জিপিএ-৫ নয়, শিক্ষা হোক মূল্যবোধ বিকাশের

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:৫৫ পিএম, ০২ জুন ২০২০

ইমরান হুসাইন

আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকে জিপিএ-৫ পাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে। এমনকি শিক্ষার্থী কিছু শিখুক বা না শিখুক, জিপিএ-৫ পেলেই সবাই খুশি। আর যেসব শিক্ষার্থী ভালো ফলাফল করতে ব্যর্থ হচ্ছে তারা কষ্টে, ক্ষোভে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। ফলে গৌণ থেকে যাচ্ছে প্রকৃত জ্ঞানার্জনের আকাঙ্ক্ষা।

শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য জ্ঞান অর্জন করা- এই বিষয়টা আমাদের মাথায় রাখতে হবে সর্বদা। শিক্ষা শুধু ফলাফলকেন্দ্রিক এমন ধারণা যদি চলে আসে সবার ভেতর তাহলে সেই শিক্ষার কোনো মূল্য নেই। শিক্ষাটা যদি জ্ঞানার্জন, মূল্যবোধ অর্জন, একজন মানুষের মতো মানুষ হতে না শিখিয়ে যদি শুধু ফলাফলের পিছে ধাবিত হওয়া শেখায়, সমাজকে ফলাফলকেন্দ্রিক করে এর ভেতরেই সীমাবদ্ধ করে রাখে তাহলে সেই শিক্ষা হবে মূল্যহীন, মানহীন। শিক্ষার মূল অর্থটাই হারিয়ে যাবে। আর মানুষ হয়ে যাবে সারশূন্য।

এবার এসএসসি পরীক্ষায় মনোপুত ফলাফল না লাভ করায় বা জিপিএ-৫ না পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে সারাদেশে।
(১) শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলায় মোছাদিমা রহমান বর্ষা নামে এক কিশোরী জিপিএ-৫ না পেয়ে ফ্যানের সঙ্গে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছে।
(২) এসএসসি পরীক্ষায় ফলাফল মনোপুত না হওয়ায় ঝিনাইদহের মহেশপুরে খালিশপুর বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র পিয়ারুল ইসলাম গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।
(৩) হবিগঞ্জ জেলার লাখাই উপজেলায় এসএসসি পরীক্ষায় ফেল করায় মনি আক্তার নামে এক শিক্ষার্থী রাগে ও অপমানে বিষপানে আত্মহত্যা করেছে।
(৪) গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার গোসিঙ্গা ইউনিয়নের নারায়ণপুর গ্রামে এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ায় মানছুরা নামের এক ছাত্রী আত্মহত্যা করেছে।
(৫) ঠাকুরগাঁও জেলার হরিপুর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নে রোববার দুপুরে লিমা আক্তার নামে এক শিক্ষার্থী ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।
(৬) লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা উপজেলায় পরপর দুইবার এসএসসি পরীক্ষায় ফেল করায় লাইজু আক্তার (১৭) নামের এক কিশোরী বিষপান করে আত্মহত্যা করেছে।
(৭) এসএসসি পরীক্ষায় ফেল করায় দিনাজপুরের চিরিরবন্দরে পাতা রায় (১৬) নামে এক কিশোরী গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করেছে।
(৮) জয়পুরহাট সদর উপজেলার পুরানাপৈল দস্তপুর গ্রামে আবু সাঈদ নামে এক শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়ায় বিষপান করে আত্মহত্যা করে।
(৯) মাগুরার মহম্মদপুরে দাখিল পরীক্ষায় ফেল করায় আইরিন নামে এক মাদরাসাছাত্রী গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।

তবে কি এখানে জীবনের চেয়ে পরীক্ষার ফলাফল বড় হয়ে গেল! আমাদের জিপিএ-৫ বা ভালো ফলাফলের চেয়ে প্রকৃত জ্ঞানার্জনের দিকে বেশি মনোযোগী হতে হবে। আজ যদি আমরা ছেলেমেয়েদের নীতিনৈতিকতা বা মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা দিতাম তাহলে প্রত্যেক পিতামাতার উচিত ছেলেমেয়েকে চাপ নয়, স্বাভাবিকভাবে একজন মানবিক, আদর্শবান সন্তান হিসেবে গড়া তোলা।

এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় এবার মোট জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৮৯৮ জন পরীক্ষার্থী। গতবারের চেয়ে এবার ৩০ হাজার ৩০৪ জন বেশি পরীক্ষার্থী ফলের সর্বোচ্চ এই সূচক অর্জন করেছে। গতবার মোট এক লাখ পাঁচ হাজার ৫৯৪ জন পরীক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিল। এবার এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৮২ দশমিক ৮৭ শতাংশ। এই পরীক্ষায় মোট পরীক্ষার্থী ছিল ২০ লাখ ৪০ হাজার ২৮ জন। এর মধ্যে পাস করেছে ১৬ লাখ ৯০ হাজার ৫২৩ জন।

আলাদাভাবে শুধু নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ৮৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ। মাদরাসা দাখিলে ৮২ দশমিক ৫১ শতাংশ এবং কারিগরি বোর্ডের এসএসসি ভোকেশনাল পরীক্ষায় পাসের হার ৭২ দশমিক ৭০ শতাংশ।

প্রতিবছর জিপিএ-৫ ও পাসের হার ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। যা দিয়ে খুব বেশি লাভ হবে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ বেশি পাসের চেয়ে গুণগতমান ভালো হতে হবে। শিক্ষার বিষয়টা শুধু পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া কিংবা সার্টিফিকেট অর্জন করা নয় বরং শিক্ষার মানদণ্ড শুধু পরীক্ষা আর ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রকৃত জ্ঞানার্জনে হতে হবে। আমরা জিপিএ-৫ পাচ্ছি অহরহ, কিন্তু আমাদের আচরণে এই শিক্ষার কতটুকু প্রতিফলন ঘটছে? আমাদের আচার-আচরণে যদি শিক্ষিত মানুষের বহিঃপ্রকাশ না ঘটে, তাহলে সেই শিক্ষা কি দেশের জন্য ফলপ্রসূ হবে?

শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠা। কিন্তু শিক্ষা এখন হয়ে উঠেছে কেবল জিপিএ-৫ এর লক্ষ্য। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখন মূল্যবোধ এবং নৈতিকতার চর্চা একেবারেই হচ্ছে না। আমাদের শিক্ষা আসলে আজকাল সার্টিফিকেটকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে যার কারণেই প্রকৃত মানুষ হওয়ার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে আমরা হয়ে যাচ্ছি ফলাফলকেন্দ্রিক। আর তখনই আমরা প্রত্যাশিত ফলাফল যখন পাচ্ছি না তখন বেছে নিচ্ছি আত্মহত্যার পথ।

শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ফলাফলকেন্দ্রিক না হয়ে প্রকৃত উদ্দেশ্যের দিকগুলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে জাগ্রত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের ভেতর নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে। এর জন্য শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, পরিবার ও সমাজের মানুষের আরও সচেতন হতে হবে। যেন শিক্ষার্থীদের খারাপ ফলাফলের জন্য হেয়প্রতিপন্ন না করে তাদের মূল্যবোধের শিক্ষা দিয়ে থাকে। তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে।

আমরাই সমাজ গড়ার কারিগর, আমরাই দেশ গড়ার কারিগর। আর তাই এই সমাজে এই দেশকে গড়তে আমার আপনার সচেষ্ট হতে হবে সবার আগে।আমার আপনার দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে পারে সমাজের নিয়ম। শিক্ষা শব্দটা ফিরে পেতে পারে তার নিজস্ব সত্তা। ফলাফল বা জিপিএ-৫ নয়, শিক্ষা হোক মূল্যবোধ জাগ্রত হওয়ার। শিক্ষা হোক মনুষ্যত্ব বিকাশের, শিক্ষা হোক জ্ঞানার্জনের।

লেখক : শিক্ষার্থী ও সংবাদকর্মী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

এইচআর/বিএ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]