স্টেমসেল কি শুধু পরাবাস্তবতা!

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯:২৫ পিএম, ০৯ জুন ২০২০

ডা. মো. শহীদুল ইসলাম (শোভন)

মানুষের ত্বক থেকে কয়েকটা কোষ নিয়ে যদি গবেষণাগারে একটা যকৃত বা লিভার তৈরি করা যায়, ভাবতে কেমন লাগবে! বিষয়টা এখন আর শুধু ভাবনাতে নেই। জাপানি বিজ্ঞানী কাজুকি তাকেইশি ও তাঁর দল পুরোপুরি কার্যকর একটা ‘মিনি-লিভার’ তৈরি করে দেখিয়েছেন। এই টেকনোলজি কাজে লাগানো গেলে রোগীর শরীর থেকে কোষ নিয়ে ল্যাবে তৈরি হবে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যা মানবশরীরে প্রতিস্থাপন করা যাবে।

পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, শুধু আমেরিকায়ই ৩০ মিলিয়ন মানুষ লিভারের অসুখে ভুগছেন, যার মধ্যে প্রায় ৪০ হাজার রোগের শেষ পর্যায়ের অবস্থায় আছেন। এই ক্রিটিক্যাল অবস্থার একমাত্র চিকিৎসা লিভার ট্রান্সপ্লান্ট। এই মুহূর্তে আমেরিকার প্রায় ১৭ হাজার মানুষ লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করার জন্য অপেক্ষমাণ। প্রতিটি ট্রান্সপ্লান্টে গুনতে হবে হাজার হাজার ডলার। তার সাথে রয়েছে বাকি জীবনব্যাপী ইম্যিউন-প্রতিরোধী (immunosuppressant) ব্যয়বহুল ওষুধের বোঝা।

মানুষের শরীরে দুইশোর বেশি প্রকারের কোষ রয়েছে। যদিও এই সকল কোষ মাতৃগর্ভস্থ ভ্রূণের বিশেষ প্রকারের স্টেমসেল (এমব্রায়োনিক স্টেমসেল বা ইএস সেল) থেকে আসে। এই ইএস সেলগুলো প্লুরিপোটেন্ট সেল (Pluripotent cell), যা থেকে মানুষের শরীরের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তৈরি করা সম্ভব। ভ্রূণদশা পার হওয়ার পর আর এই স্টেমসেল শরীরে পাওয়া যায় না।

stamecell

মানুষের ত্বকের কোষ থেকে ল্যাবের বায়ো-রিঅ্যাক্টরে উৎপাদিত মিনি-লিভার

কোনোভাবে যদি পূর্ণবয়স্ক মানুষের শরীরের সেলকে স্টেমসেল দশায় ফেরত পাঠানো যেত তাহলে রোগাক্রান্ত বা ক্ষয়িষ্ণু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে পুনর্জন্ম বা মেরামত করা সম্ভব হতো। এই ভাবনাকে এগিয়ে নিতেই জাপানি বিজ্ঞানী শিনআ ইয়ামানাকা ও তার দল আবিষ্কার করেন রিপ্রোগ্রামিং টেকনোলজি, যা দ্বারা একটি পূর্ণবয়স্ক মানুষের যেকোনো কোষকে ইএস-লাইক-সেলে (ES-like cells) পরিণত করতে পারেন। যাকে বলা হয়েছে ইনডিউসড প্লুরিপোটেন্ট স্টেমসেল (induced Pluripotent Stem cells) বা আইপিএস সেল (iPS cells).

এই আবিষ্কারের স্বীকৃতিস্বরূপ স্যার জন বি গারডনের সাথে ২০১২ সালে শিনআ ইয়ামানাকা যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। এই কৌশলকে কাজে লাগিয়ে শরীরের যেকোনো কোষকে মাতৃগর্ভকালীন ভ্রূণস্থ কোষের মতো স্টেমসেল (আইপিএস সেল) দশায় ফিরিয়ে নেয়া যায়। পরবর্তীতে প্রাপ্ত আইপিএস সেল যা থেকে পুনরায় শরীরের যেকোনো কোষে পরিণত করা যায়।

সেই কাজের ধারাবাহিকতায় বিজ্ঞানী কাজুকি তাকেইশি ও তাঁর দল কিছু সংখ্যক মানুষের ত্বকের কোষকে (ফাইব্রোব্লাস্ট) রিপ্রোগ্রামিং টেকনোলজির মাধ্যমে আইপিএস সেলে পরিণত করেন। পরবর্তীতে নির্দিষ্ট জৈব রাসায়নিক পদার্থের (ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর) উপস্থিতিতে যকৃতের বিভিন্ন প্রকারেরে কোষে (hepatocytes, biliary epithelial cells, and vascular endothelial cells) পরিণত করেন।

stamecell

এই ইঁদুরগুলোর দেহেই মিনি-লিভার প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল।

পরিবর্তিত এই কোষগুলোকে একটি কোষবিহীন (de-cellularized scaffold) ইঁদুরের যকৃতের কাঠামোতে প্রবেশ করিয়ে উপযুক্ত পুষ্টি সরবরাহকরণসহ শারীরবৃত্তীয় পরিবেশে (Organ-like microenvironment) কালচার করা হয়। মাত্র এক মাসের মধ্যেই বায়ো-রিঅ্যাক্টরে তৈরি হয়ে যায় ‘মিনি-লিভার’। যা ইঁদুরের দেহে প্রতিস্থাপন করা হয় এবং চারদিন পর পোস্টমর্টেম অ্যানালাইসিসের জন্য ইঁদুরগুলোকে স্যাকরিফাইস করা হয়।

চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে এই এক্সপেরিমেন্টের একটা গবেষণাপত্র ‘সেল রিপোর্টস (Cell Reports)’ জার্নালে প্রকাশিত হয়। প্রয়োজনীয় পরীক্ষাসমূহের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, মানব যকৃত থেকে উৎপাদিত প্রয়োজনীয় প্রোটিন, পিত্ত, ইউরিয়া ইত্যাদি ‘মিনি-লিভার’ও তৈরি করতে সক্ষম।

ত্বকের কোষ থেকে উৎপাদিত মিনি-লিভারের কার্যকারিতা বিজ্ঞানী দলকে আরও প্রত্যয়ী করে তুলেছে। তারা খুব শিগগিরই দীর্ঘজীবী প্রাণীতে নিরীক্ষণ শেষে মানবশরীরে প্রতিস্থাপন করবেন। আর সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে বিজ্ঞানীরা আগামী ১০ বছরের মধ্যেই চিকিৎসদের হাতে রোগীর বা অন্য কারও ত্বকের কোষ দিয়ে ল্যাবে তৈরি যকৃত (Universal Liver Graft) তুলে দিতে পারবেন বলে তারা আশাবাদী।

তথ্যসূত্র: doi.org

লেখক : পিএইচডি গবেষক, স্টেম সেল টেকনোলজি, তেহরান ইউনিভার্সিটি অব মেডিকেল সাইন্সেস, ইরান। ভিজিটিং রিসার্চার, ইউনিভার্সিটি অব সান্টিয়াগো ডি কম্পোস্টেলা, স্পেন।

এইচআর/বিএ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]