অসৌজন্য কথা বলা ভারতীয়দের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে

আনিস আলমগীর
আনিস আলমগীর আনিস আলমগীর , সাংবাদিক ও কলামিস্ট
প্রকাশিত: ০৯:০০ এএম, ০২ জুলাই ২০২০

ভারতীয় মিডিয়া আর কিছু নেতা এমন কথাবার্তা বলেন যাতে বাংলাদেশের জাতীয় মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়। তাদের প্রাক্তন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকর একবার বলে বসলেন, ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীনতা উপহার দিয়েছে। ভারত বাংলাদেশকে যদি স্বাধীনতা উপহার দিয়ে থাকে তবে বাংলাদেশের ত্রিশ লাখ শহীদ আত্মত্যাগ করেছিলেন কেন! পাকিস্তানিরা যে তাদের নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস বইতে পড়ায় ভারত ষড়যন্ত্র করে পাকিস্তানকে ভেঙেছে- সেটাই কি সত্য প্রমাণ করতে চান এই মনোহর পারিকররা?

১৭ এপ্রিল ১৯৭১ কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুরের সীমান্তবর্তী এলাকা বৈদ্যনাথতলায় (পরবর্তীতে মুজিবনগর) শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার নিয়মিতভাবে সরকার যন্ত্র এবং যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছিল। বাংলাদেশকে ১১ সেক্টরে বিভক্ত করে ১১ জন সেক্টর কমান্ডার শৃঙ্খলার সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন। ৮৫ হাজার মুক্তিযোদ্ধা নিয়মিতভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন। যুদ্ধের শেষ প্রান্তে এসে ৩ ডিসেম্বর যৌথ কমান্ড গঠন করে শেষ দৃশ্যে কিছু ভারতীয় সেনা মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পাকিস্তানি সেনারা আত্মসমর্পণ করেছিল। এটাকে ভারতের স্বাধীনতার উপহার দেয়া বলব!

এই যুদ্ধে ভারতের সাধারণ মানুষের সহযোগিতা, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয়, বিহারের জনগণ এক কোটি বাংলাদেশি শরণার্থীকে আশ্রয়দানের কথা বাংলাদেশ কখনও ভুলে যায়নি। ভোলেনি ইন্দ্রিরা গান্ধীর মতো একজন মানবতাবাদী প্রধানমন্ত্রীর অবদান, যিনি দেশে-বিদেশে বাংলাদেশের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ভোলেনি ইস্টার্ন ফ্রন্টে যে কজন ভারতীয় সেনা নিহত হয়েছে তাদের আত্মত্যাগের কথা। কিন্তু ইতিহাসের স্বার্থে ইতিহাস শুধু এসব তথ্যে রচিত হয় না। আরও কিছু কথা থাকে, যা সৌজন্যের খাতিরে কোনো কৃতজ্ঞ রাষ্ট্র বলে না।

পূর্ব পাকিস্তান অর্থনৈতিক যাতনায় ২৫ বছরের মধ্যে ভারতের সঙ্গে মিশে যাবে- এ ছিল দেশভাগের সময় ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহর লাল নেহরুর পূর্বাভাস। কিন্তু সে স্বপ্ন চুরমার করে পূর্ব পাকিস্তান নিজেই ২৩ বছরের মাথায় স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এবং মাথা উঁচু করে দাাঁড়িয়ে আছে। স্বাধীনতা উপহার দেয়া আর কথায় কথায় খোঁটা দিলে ভারতের নিজের স্ট্র্যাটেজিক্যাল স্বার্থে স্বাধীন বাংলাদেশ কতটা দরকার ছিল- সে প্রশ্নও উঠে আসবে। পৃথিবীর বহুদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে অন্য রাষ্ট্র সহায়তা করেছে। এর চেয়ে অনেক বড় সহযোগিতা করেছে। তারা সে জন্য ভারতীয় মিডিয়া এবং তাদের কিছু নেতার মতো প্রতিনিয়ত অসৌজন্য কথাবার্তা বলে না।

জর্জ ওয়াশিংটন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর কর্নেল ছিলেন। তিনি তার সেনাসদস্যদের নিয়ে বৃটিশের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছিলেন। জর্জ ওয়াশিংটন বড়লোকের সন্তান ছিলেন। তিনি তার সম্পত্তি বিক্রি করে তার সেনাবাহিনীর সদস্যদের নিয়মিত বেতন দিতেন। একসময় তার সম্পদ নিঃশেষ হয়ে গেলে তিনি সেনাবাহিনীর বেতনের টাকা ব্যবস্থা করতে দুর্দশার সম্মুখীন হন। তখন তিনি তার সহকর্মী জেফারসনকে ফ্রান্সে পাঠিয়েছিলেন ঋণের প্রস্তাব দিয়ে। ফরাসি সরকার যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের যুদ্ধরত বাহিনীর বেতনের টাকা সরবরাহ করেছিল।

ইউরোপের বহুজাতির নিয়মিত সেনাবাহিনীর বহু সদস্য ওয়াশিংটনের সেনাবাহিনীতে গিয়ে যোগদান করেছেন এবং যুদ্ধ করেছেন। এমনকি জেনারেল পদমর্যাদার লোক পর্যন্ত ইউরোপ থেকে আমেরিকা গিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে যুদ্ধে যোগদান করে সহায়তা করেছিলেন। আয়ারল্যান্ডের হাজার হাজার যুবক আয়ারল্যান্ড ত্যাগ করে আমেরিকায় গিয়ে ওয়াশিংটনের সেনাবাহিনীতে যোগদান করেছিলেন। আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের পরিবারও আয়ারল্যান্ডের লোক।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্রান্সের নেতারা দেশ ত্যাগ করে ইংল্যান্ডে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আর ফ্রান্সে তখন হিটলারের তাবেদার সরকার প্রতিষ্ঠিত। ফ্রান্সের নরম্যান্ডি উপকূলে দুর্ভেদ্য প্রাচীর নির্মাণ করে রেখেছিল জার্মান সৈন্যরা। আর ১৯৪৪ সালে জেনারেল আইজেনহাওয়ার তখন ইউরোপের মিত্রবাহিনীর যৌথ কমান্ডার। তিনি নরম্যান্ডি উপকূলে সেনাবাহিনী অবতরণ করার ব্যবস্থা করে ফ্রান্সকে মুক্ত করেছিলেন। এই অভিযানে দেড় লাখ আমেরিকান সৈন্য অংশগ্রহণ করেছিল। ফ্রান্স যে এর আগে আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে সাহায্য করেছিল তা তো বৃথা যায়নি। ১৯৪৪ সালে ফ্রান্সকে মুক্ত করে ইংল্যান্ডে নির্বাসিত ফ্রান্স সরকারকে ফিরিয়ে এনেছিলেন আমেরিকান জেনারেল আইজেনহাওয়ার, যিনি পরে আমেরিকার প্রেসিডেন্টও হয়েছিলেন।

সাম্প্রতিক সময়ে চীন বাংলাদেশের বহু পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে। ভারতীয় মিডিয়া এটা নিয়ে বাংলাদেশ চীনের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে বলে নানা উদ্ভট খবর প্রকাশ করছে। চীনের ডাক্তারদের বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে এযারপোর্টে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন- এটাও নাকি তাদের গাত্রদাহ। এখন তারা তাদের ‘মনিব রাষ্ট্র’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে দিয়ে তদবির করাচ্ছে বাংলাদেশ যেন চীনের প্রতি ঝুঁকে না যায়। কারণ এ সময়ে লাদাখে চীনের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত বিরোধ তুঙ্গে। সাউথ ব্লক নাকি ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক নিবিড় পর্যবেক্ষণ করছে।

কলকাতা-কেন্দ্রিক কিছু ভারতীয় মিডিয়া বাংলাদেশকে পণ্য রফতানিতে চীন শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয়াকে বলেছে ‘খয়রাতি’ সাহায্য। ভারতীয় মিডিয়ার অনুরূপ বাক্য ব্যবহারে বাংলাদেশের মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছে। জনগণকে ক্ষুব্ধ করে সরকারের সমর্থন পাওয়া কঠিন- এটা মোদির কেনা উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী মিডিয়ার বোঝা উচিত, দুদেশের চলমান সুসম্পর্ক বজায় রাখার স্বার্থেও।

১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের লাহোরে ইসলামী সম্মেলন সংস্থার শীর্ষ বৈঠকের পূর্বে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের শতকরা ৮০ শতাংশ জনগণ মুসলমান এবং একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের অধিবাসী। তবুও আমরা ইসলামী শীর্ষ বৈঠকে যোগ দিতে আগ্রহী তবে যদি পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।’ বঙ্গবন্ধুর এই কথার পর ইসলামী সম্মেলন সংস্থার নেতারা তৎপর হয়ে ওঠেন দুই ইসলামী দেশ বাংলাদেশ-পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনে।

ওআইসি শীর্ষ বৈঠকের আগে লাহোরে ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুসারে ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে পুনর্মিলনে এবং বঙ্গবন্ধুকে লাহোরে নেয়ার জন্য শেষ মুহূর্তে সাত সদস্যের ওআইসির একটি প্রতিনিধি দলকে ঢাকায় প্রেরণ করা হয়। প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন কুয়েতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বর্তমান আমির শেখ সাবাহ আল আহমাদ আল-জাবের আল-সাবাহ। তারা ঢাকায় এসে বাংলাদেশের যোগদানের পুরো বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। প্রতিনিধি দলের এক সদস্য ওআইসির সেক্রেটারি জেনারেল হাসান আল-তোহমি লাহোরে ফিরে গিয়ে জানিয়ে দেন যে বাংলাদেশ এই শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেয়ার বিষয়ে তিনি আশাবাদী।

২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো পাঞ্জাব সংসদে তার ভাষণে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেন। এরপর ওআইসির প্রতিনিধি প্রধান কুয়েতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সন্ধ্যায় গণভবনে গিয়ে ওআইসির শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুকে আমন্ত্রণপত্র হস্তান্তর করেন। তৎকালীন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনের পরামর্শে বঙ্গবন্ধু গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করেছিলেন যে, বাংলাদেশও পাকিস্তানকে স্বীকৃতি দিচ্ছে এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ থেকে ২২ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ওআইসি সম্মেলনে অংশ নেয়ার জন্য লাহোরের উদ্দেশে যাত্রা করবে। প্রতিনিধি দলটি আলজেরিয়ার রাষ্ট্রপতি হুয়েরি বুমেডিনের প্রেরিত একটি এয়ার আলজেরীয় বিমানে ২৩ ফেব্রুয়ারি লাহোর গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুকে ব্যাপক সম্মান দেয় পাকিস্তান। এরপর সম্মেলন শেষে ২৫ ফেব্রুয়ারি মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সা'দাত দিল্লি সফর শেষে দেশে ফেরার পথে তিন ঘণ্টার জন্য বাংলাদেশ সফর করেন।

সদ্যস্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের পেট্রো ডলারের মালিক রাষ্ট্রগুলোর সুসম্পর্ক সূচনা করা বঙ্গবন্ধুর উদ্দেশ্য ছিল এবং উনার উদ্দেশ্য সফল হয়েছিল। এখন বাংলাদেশের রেমিটেন্স প্রবাহের মূল কিন্তু সেই মধ্যপ্রাচ্য। বঙ্গবন্ধুর এই যোগদান নিয়ে ভারতীয় মিডিয়া তখনও তিলকে তাল করে বহু কথা লিখেছিল। এমনকি তাদের একটি পত্রিকা হেডলাইন করেছিল- ‘আমার বধুয়া আন বাড়ি যায় আমার আঙিনা দিয়া’। তারা তখন থেকে চাইতো যে বাংলাদেশ ভারতের কাছে নতজানু হয়ে থাকুক। বাংলাদেশকে স্বাধীন সার্বভৌম সমমর্যাদার দেশ হিসেবে বিবেচনা করতে তাদের কষ্ট বোধ হয়।

যাহোক, এখন ভারত আর চীন লাদাখ সীমান্তে যুদ্ধের সব প্রস্তুতি নিয়ে মুখোমুখি হয়ে আছে। ভারতের আশপাশের প্রায় সব দেশের সঙ্গে ভারতের বৈরিতার সম্পর্ক। শুধু বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ভালো সম্পর্ক বিদ্যমান। সুতরাং ভারত এখন চাইবে যেকোনোভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে একটা সামরিক চুক্তি সম্পাদন করতে। বাংলাদেশ ভারতীয় কোনো আবদারের যেন পা না বাড়ায়- সেই বিষয়ে খুব সতর্ক থাকতে হবে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের যেমন জন্মকালের সম্পর্ক রয়েছে, চীনের সঙ্গেও সুসম্পর্ক সম্পর্ক সবসময় বিদ্যমান। বাংলাদেশের ঘাড়ে ১০ লাখ রোহিঙ্গা। চীনের সহযোগিতা দরকার এদের ফেরাতে।

বাংলাদেশের জন্য তার দুই প্রতিবেশীর সহযোগিতা দরকার। এই দুই বড় প্রতিবেশী রাষ্ট্র আণবিক শক্তির অধিকারী। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করব চীন-ভারতের বিরোধে তিনি যেন তার নিরপেক্ষ ভূমিকা থেকে নড়াচড়া না করেন। ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের সময় শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী শ্রীমাভো বন্দরনায়েক দিল্লি-পিকিং দৌড়াদৌড়ি করে একটা সমঝোতার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। প্রয়োজনে আমাদের প্রধানমন্ত্রী অনুরূপ একটি ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারবেন।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।
[email protected]

এইআর/বিএ/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]