চামড়া সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিন

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:০৭ এএম, ০৪ আগস্ট ২০২০

প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম

এবারের কোরবানি ঈদের নামাজের পর সকাল ৯টায় পশু কোরবানি দিয়েছি। উঠোনের লিচু গাছের ছায়ায় সকাল থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত পশুর চামড়া রাখা ছিল। ক্রেতা আসেনি, বিক্রি হয়নি। অর্ধশতাব্দী ধরে দেখে আসছি কোরবানির পশুর চামড়ার কদর। এর আগে প্রতি বছর দেখেছি ঈদের দিন কোরবানি শুরু হওয়ার আগেই ফড়িয়া ক্রেতারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে চামড়ার দরদাম ঠিকঠাক করে কেনার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতো। গরিব মিসকিনদের বেশি দান করতে পারবেন এই আশায় যিনি বেশি দাম দিতেন তার কাছেই চামড়া বিক্রি করে দিতেন। গতবারের পর এবারও ব্যতিক্রম ঘটেছে। এবারও চামড়া কিনতে কেউ আসেনি। শেষে এক এতিমখানায় ফোন করে চামড়াগুলো নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেছি, তারা নিয়ে গেছে। তারা কোথাও সেগুলো বিক্রি করতে পেরেছে কি না জানি না!

আজকের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইন পত্রিকায় চোখ বুলাতেই কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে ট্যানারি মালিকদের কারসাজি ও কোরবানিকারীদের দুরবস্থার সংবাদগুলো খুব ব্যথিত করলো। নওগাঁর এক গ্রামে কোরবানির চামড়া বিক্রি না হলে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে। যেটা পরিবেশ দূষণের জন্য মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে কোথাও কোথাও সংরক্ষণের অভাবে ও পরিবেশ দূষণের ভয়ে মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়েছে।

করোনা মহামারি যেমন আমাদের চেতনাকে মানবিক পর্যায়ে নাড়া দিয়েছে তেমনি কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে কারসাজি ও দুরবস্থার সাম্প্রতিক চিত্রগুলো আমাদের অর্থনীতি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিকে নাড়া দিয়েছে। একটি পত্রিকা উল্লেখ করেছে, ‘এতিম গরিবদের হক মেরে দিল ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেট’। ঢাকার মহাখালীর এক মাদরাসা শিক্ষক জানিয়েছেন, সে এলাকার মানুষ কোরবানির চামড়া মাদরাসার ফান্ডে দেন। চামড়া বিক্রির এই টাকা এতিম ও দরিদ্র শিশুদের পড়ামোনা এবং খাবারের খাতে খরচ করা হয়। দেশে নওগাঁ, সুনামগঞ্জ ও মহাখালীতেই শুধু নয়, এ ধরনের হাজার হাজার বেসরকারি সাধারণ ও ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এতিম, অসহায়, অবহেলিত শিশু শিক্ষার্থীরা কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রির অর্থ দিয়ে পড়াশোনা ও খাবারের খরচ মিটিয়ে থাকে।

একটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে উদযাপিত হয়েছে এবারের কোরবানির ঈদ। প্রথমদিকে করোনার ভয়ে শহরের বিত্তশালী মানুষ কোরবানি না করার মনোভাব নিলে বাজারে পশুর দাম কমে যায়। ফলে পশু ব্যবসায়ীরা পানির দামে পশু বিক্রি করে বাড়ির পথে রওনা দিলে ঠিক ঈদের একদিন আগে রাজধানীসহ দেশের সব বড় শহরের ঈদের হাট শূন্য হয়ে পড়ে। মিডিয়ায় পশুর দাম সস্তা শুনে শহরের মানুষ পশু কিনতে হাটে ছুটে যায়। তখন ক্রেতা বেশি হওয়ায় পশু নিয়ে সংকটে কাড়াকাড়ি শুরু হয় এবং ৪০ হাজার টাকার গরুর দাম বেড়ে এক লাখ টাকা হয়ে যায়।

দাম আকাশচুম্বি শুনে রাজধানীর আশপাশের খামারি ও গৃহস্থরা তাদের ছোট-বড় সব পোষা পশু নিয়ে হাটে হাজির হলে পশুসংকট কিছুটা কেটে যায় এবং মানুষ কোন না কোনভাবে কোরবানির পশু সংগ্রহ করে। এভাবে করোনাভীতি উপেক্ষা করে মানুষ এবার কোরবানি দিতে সমর্থ হয়েছে। কিন্তু চামড়া বিক্রি নিয়ে গভীর সংকটে পড়েছে তারা। ফড়িয়া চামড়া ক্রেতারা বাড়িতে চামড়া কিনতে আসেনি এবার। ফলে অনেকে ব্যক্তিগত গাড়ি ও ভ্যান ভাড়া করে নিকটস্থ গোলায় চামড়া নিয়ে গেছে বিক্রির জন্য। পোস্তা এলাকায় চামড়া কিনতে বসা একজন ব্যবসায়ী বলেছেন, খুব সস্তায় তিনি চামড়া কিনেছেন। ১০০-২০০ টাকায় গরুর চাড়া এবং চার পিস ছাগলের চামড়া মাত্র ১০ টাকায় কিনেছেন! দূর-দূরান্ত থেকে চামড়া বিক্রি করতে এসে অনেকের ভ্যান ও ভটভটি ভাড়া ওঠেনি।

উত্তরবঙ্গের নওগাঁ, দিনাজপুরের রামনগর বাজার, রাজশাহীর বানেশ্বর প্রভৃতিতে মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা ধারদেনা করে চামড়া ক্রয় করে নিঃশেষ হয়েছে। করোনার ভয়ে সারাদেশে মাদরাসা বন্ধ থাকায় এবং সংক্রমণের ভয়ে ক্রেতারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে চামড়া কেনেনি। ঢাকার পোস্তায় ৪০ ভাগ চামড়া পচে নষ্ট হয়েছে। চট্টগ্রামে মাদরাসা ও এতিমখানায় দিয়ে আসা দানকৃত চামড়া বিক্রি করতে পারায় এবং সংরক্ষণের অভাবে পচে গেছে। সেগুলো সিটি কর্পোরেশনের লোকরা বুলডোজার দিয়ে ভাগাড়ে ডাম্পিং করার ছবি টিভিতে প্রচারিত হয়েছে। এভাবে মূল্যবান জাতীয় সম্পদ চামড়ার ক্রয় শৈথিল্যে এবং পচন, ডাম্পিংয়ে বঞ্চিত হয়েছে লাখ লাখ দুস্থ-এতিম শিক্ষার্থী।

অনেকে মন্তব্য করেছেন, পানির দামে চামড়া বিক্রি ও ট্যানারি মালিকদের কারসাজিমূলক চামড়া ব্যবসা যেন শায়েস্তা খাঁর আমলকে হার মানিয়েছে। তারা বলেন, কেন সব পণ্যের দাম এমন হয় না? জুতা, কাপড়, মাংস, ব্যাংক, বীমা, বিমান- সবাই চামড়ার দামের মতো শায়েস্তা খাঁর আমলের অবস্থানে চলে গেলে ভালো হয়। চামড়া আমাদের জাতীয় সম্পদ। এ খাতে ব্যবসার বিপর্যয়ের অর্থ হলো হাজার হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা নিয়ে টানাটানি শুরু হওয়া।

এছাড়া কওমি মাদরাসা, এতিমখানা ও লিল্লাহ্ বোর্ডিংগুলোর বার্ষিক আয়ের বড় উৎস হলো কোরবানির চামড়া। কোরবানির চামড়া বিক্রির অর্থ কোরবানিদাতারা নিজে ভোগ করেন না। এই অর্থের পুরোটাই গরিব-দুঃখীদের দান করা হয়। এত সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষের অভাব কিছুটা দূর হয়ে শান্তি ফিরে এত সামাজিক ভাঙন দূর হয়, অপরাধ কমে। এতে সামাজিক স্থিতিশীলতা তৈরি হয়। বৃহত্তর সামাজিক শান্তি ও প্রগতির লক্ষ্যে কোরবানির চামড়া বিক্রির অর্থের দাবিদার তারাই।

শুধু নিজেদের অতি মুনাফার কথা চিন্তা না করে ট্যানারি মালিকদের এ দিকটি নিয়ে ভাবা উচিত। এটাও আমাদের সমাজ ও অর্থনীতির ওপর কালো থাবা। করোনার জন্য দেশের জনস্বাস্থ্যের বর্তমানে ক্রান্তিকাল চলছে। তার ওপর পরিবেশের বিরূপ প্রতিক্রিয়া বিদ্যমান। এমতাবস্থায় দেশের এককালের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি আয়ের উৎস চামড়া শিল্পকে সিন্ডিকেটের কালো থাবা থেকে বাঁচানো জরুরি এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট অসহায়, এতিম শিশু শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা এবং গরিব, দুস্থ দুঃখী মানুষগুলোর মুখে হাসি ফুটানোর জন্য সবাইকে এগিয়ে আসা জরুরি। দেশের বিত্তশালী মানুষগুলোকে মানবিক না হলে চলবে কীভাবে?

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চামড়া সংক্রান্ত কন্ট্রোল সেলের পরামর্শের কথা আগেভাগে প্রচারিত না হওয়ায় দেশের মানুষ সে সম্পর্কে অবগত হতে পারেননি। এছাড়া বন্যা ও করোনার ভয়ে সেই পরামর্শ মেনে মানুষ আদৌ চামড়ায় লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করতে উৎসাহী হবে কি-না তা ব্যাখ্যা ও পর্যালোচনা করা হয়নি। এর চেয়ে সিন্ডিকেটের কারসাজি ভাঙ্গা নিয়ে মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ বেশি প্রয়োজন ছিল।

যেখানে বড় বড় মহারথীর মাধ্যমে দুর্নীতিকে একটা শিল্প হিসেবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করার পথ খোলা থাকে সেখানে চামড়া শিল্পে সিন্ডিকেটের গভীর কারসাজি কীভাবে খর্বিত হবে তা বলাই বাহুল্য। প্রতি বছর শুধু ঈদ সমাগত হলে চামড়া নিয়ে হুলস্থুল না করে আমাদের জাতীয় সম্পদ চামড়া শিল্পকে বাঁচাতে আগামী বছরগুলোর জন্য সুদূরপ্রসারী ভাবনার মাধ্যমে প্রেক্ষিত পরিকল্পনা নেয়া উচিত।

সীমাহীন দুর্নীতি, লোভ, প্রতারণার সিন্ডিকেট বানিয়ে কারসাজি করে যারা মানুষকে কষ্ট দেন, জাতীয় সম্পদ বিদেশে পাচার করার কাজে লিপ্ত থাকেন তাদের ব্যাপারে সরকারকে সচেষ্ট থাকতে হবে। এজন্য ঈদুল আজহা পরবর্তী বিরাজমান আর্থ-সামাজিক ও পরিবেশগত অবস্থা সংরক্ষণ ও সুবিধাবঞ্চিত দুস্থ-এতিম শিক্ষার্থীদের দুরবস্থা নিরসনকল্পে চামড়া শিল্পের বিপর্যয় রোধে সবাইকে এগিয়ে আসা উচিত।

লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

এইচআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]