সাধারণ্যে প্রাণময় এক অসাধারণ তরুণ

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১:২৫ পিএম, ০৬ আগস্ট ২০২০

এম. নজরুল ইসলাম

১৯৭২ সালের পর থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্য আগস্ট পর্যন্ত এক প্রাণময় সময় কাটিয়েছি আমরা। তারুণ্যের সেই সূচনালগ্নে ভেসেছি প্রাণের উচ্ছ্বাসে। সদ্য স্বাধীন দেশে নিয়েছি বুক ভরে নিঃশ্বাস। ছাত্র রাজনীতি থেকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড খেলার মাঠ থেকে নাটকের মঞ্চ, সর্বত্রই ছিল আমাদের প্রাণোচ্ছল উপস্থিতি। সদ্য স্বাধীন দেশে আমরা ডানা মেলে উড়ছি তখন। এই আকাশ আমার। এই বাতাসে আমাদের অধিকার। এই আলো, এই হাওয়া- সব যেন নিজের মতো করে পাওয়া।

স্টেডিয়াম থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠ; টিএসসি থেকে মধুর কেন্টিন আমাদের কলরবে মুখর তখন। আমাদের মুখর তারুণ্যকে প্রাণপ্রাচুর্যে ভরিয়ে দিয়েছিলেন যিনি, তাঁকে স্মরণ করতেই আজ এই নিবন্ধের অবতারণিকা। শিক্ষা, ক্রীড়া, ও সংস্কৃতির অঙ্গনে অমন উদার মনের প্রাণময় মানুষ তরুণকে তো কোনোদিন আর খুঁজে পেলাম না। সব কাজে উৎসাহ দিতে কোনো কার্পণ্য ছিল না তাঁর।

আমি শেখ কামালের কথা বলছি। বলছি আমাদের প্রাণের স্বজন কামাল ভাইয়ের কথা। আমাদের কাছে তিনি শেখ কামাল নন, কামাল ভাই। খুব কি বেশিদিন আগের কথা? স্মৃতির সেলুলয়েডে আজো দেখতে পাই, এই সেদিনও শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়ের ঠিক উল্টো দিকে ৩০ মিরপুর রোডে ছিল ছাত্রলীগের অফিস। দোতলা বাড়ির নিচ তলায় মহানগর ছাত্রলীগের, দোতলায় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের অফিসে আমারও তো নিত্য যাতায়াত ছিল। বয়সে কনিষ্ঠ হলেও ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের সহসম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছি তখন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ শাখা ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে মহানগর ছাত্রলীগের সহসম্পাদক হিসেবে আমাকে মনোনীত করা হয়। আর সেই সূত্রেই তাঁর কাছে আসা। ছাত্র রাজনীতির সাংগঠনিক পরিচয়ের গণ্ডি পার হয়ে তাঁর ঘনিষ্ঠ হতে সময় লাগেনি। আমার দিক থেকে সংকোচ যে ছিল না, তা নয়। সংকোচ ও ভয় দুটোই ছিল। স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রীর ছেলে তিনি। স্বাভাবিকভাবেই একটি দূরত্ব তৈরি হওয়ার কথা। কিন্তু কামাল ভাইয়ের ব্যক্তিত্ব ও মানুষকে কাছে টেনে নেওয়ার অসামান্য ক্ষমতা সেই দূরত্ব ঘুচিয়ে দিতে একটুও সময় নেয়নি। ব্যাপারটা শেষাবধি এমন হয় যে, প্রতিদিন একাধিকবার দেখা হওয়াটাই ছিল নিয়মিত রুটিন।

সেইসব দিনগুলো আজো স্মৃতির সঞ্চয়ে অক্ষয়। রোজ তাঁর সঙ্গে দেখা হচ্ছে, স্মিত হাসিতে পিঠের ওপর হাত রেখে কাজ করার সাহস জোগাচ্ছেন তিনি। কোথায় দেখা হয়নি তাঁর সঙ্গে? সদ্য স্বাধীন দেশে তখন তো চারদিকে আনন্দের জোয়ার। সেই জোয়ারে তাঁকে আমরা পাই দক্ষ এক সংগঠকের ভূমিকায়। গানের আসরে তাঁকে পাই। নাটকের মঞ্চেও তাঁর সপ্রাণ উপস্থিতি। খেলার মাঠ? সেখানে তো অনিবার্য তিনি।

শেখ কামাল যে বাংলাদেশের এক উজ্জ্বল অ্যাথলেট ছিলেন, এ কথা কে না জানে! রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যালয়েও তাঁর সপ্রাণ উপস্থিতি। সকালে দেখছি তাঁকে। বিকেলেও সেই হাসিমুখে টেনে নিচ্ছেন কাছে। কখনো সামান্যতম ক্লান্তির ছাপ দেখিনি তাঁর অবয়বে। অসামান্য সাংগঠনিক দক্ষতার অধিকারী এই তরুণ যেকোনো মানুষকে অনায়াসে কাছে টানার শক্তি রাখতেন। জানতেন কী করে সংগঠনকে প্রাণবন্ত রাখতে হয়।

বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতিতে অন্যরকম একটা জোয়ার আনার চেষ্টা করেছিলেন শেখ কামাল। ছাত্র রাজনীতির গুণগত মানের পরিবর্তনের চেষ্টা ছিল তাঁর। সরকারের প্রধান নির্বাহী ও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তির ছেলে হয়েও দলের উঁচু পদের দিকে তাঁর কোনো মোহ ছিল না। সাধারণ কর্মী হিসেবেই কাজ করতেন সদা উদ্যমী এই পুরুষ।

আজ দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই প্রাণবন্ত তরুণ প্রতিভার চরিত্র হননের চেষ্টা করা হয়েছে। অথচ তাঁর শিল্পী মনের পরিচয় কজনের জানা আছে? অনেকেই হয়তো জানেন না, শেখ কামাল চমৎকার সেতার বাজাতেন। ছায়ানটের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে দেশের সঙ্গীত জগতে পপ সঙ্গীতের যে উত্থান, তার নেপথ্যেও শেখ কামালের অবদান খাটো করে দেখার অবকাশ নেই।

বন্ধু শিল্পীদের নিয়ে সেই সময়ে গড়ে তুলেছিলেন ‘স্পন্দন’ শিল্পী গোষ্ঠী- যে দলটি দেশের সঙ্গীত জগতে আধুনিকতার ছোঁয়া দিয়েছিল সেই সত্তরের দশকের প্রথমার্ধে। দেশের নাট্য আন্দোলনের ক্ষেত্রে শেখ কামাল ছিলেন প্রথম সারির সংগঠক। ছিলেন ঢাকা থিয়েটারের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতাও। অভিনেতা হিসেবেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যাঙ্গনে চেনামুখ ছিলেন তিনি। শৈশব থেকে ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, বাস্কেটবলসহ বিভিন্ন খেলাধুলায় উৎসাহী শেখ কামাল স্বাধীনতার পর আবির্ভূত হন ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে। উপমহাদেশের অন্যতম ক্রীড়া সংগঠন ও আধুনিক ফুটবলের অগ্রদূত আবাহনী ক্রীড়াচক্রের প্রতিষ্ঠাতা তিনি।

রাজনীতিতে তাঁর অবদান কম নয়। ছাত্রলীগের একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হিসেবে তিনি ছিলেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য। শাহাদাত বরণের সময় ছিলেন বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের অঙ্গ-সংগঠন জাতীয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ওয়ার কোর্সে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। কমিশন লাভ করে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানীর এডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শাহাদাতবরণের সময় তিনি সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এমএ শেষ পর্বের পরীক্ষা দিয়েছিলেন। জন্মেছিলেন আজকের বঙ্গতীর্থ টুঙ্গিপাড়ায় ১৯৪৯ সালে। মাত্র ২৬ বছরের জীবন। ঘাতকের বুলেটে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিহত হন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। তাঁর মৃত্যু দেশের সংস্কৃতি ও ক্রীড়া ক্ষেত্রে তো বটেই, রাজনীতিতেও এক অসামান্য ক্ষতি গতকাল ছিল তাঁর জন্মদিন। জন্মদিনের প্রাক্কালে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি সেই প্রাণময় তরুণকে, যাঁর প্রেরণা একদিন আমাদের উজ্জীবিত করেছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনীতিতে। তিনিও তো আমাদের দীক্ষা দিয়েছিলেন দেশপ্রেমের মন্ত্রে।

আজকের দিনে যখন নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাইছে সাম্প্রদায়িক শক্তি, যখন স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা করেই চলেছে একটি স্বার্থান্বেষী মহল- তখন শেখ কামালের মতো একজন দক্ষ সংগঠকের অভাব বোধ করি। আজ তাঁর মতো নেতৃত্ব বড় প্রয়োজন এই দেশে। একই সঙ্গে সংস্কৃতি ও ক্রীড়া ক্ষেত্রে অমন প্রাণময় পুরুষের আবির্ভাব হয়তো অসম্ভব। কিন্তু তাঁর আদর্শ অনুসরণের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে অসাম্প্রদায়িক একটি দেশ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

রাজনীতি যখন কারো কারো কাছে ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি, তখন শেখ কামালের দেখানো পথ ধরে রাজনীতিকে সত্যিকারের মানবকল্যাণে ব্যবহার করা সম্ভব। সব সম্ভবের দেশেও কেমন করে নির্মোহ থাকা যায়, শেখ কামাল তার দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। সরকার ও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তির সন্তান হওয়া সত্ত্বেও কেমন করে সাধারণ্যে মিশে যাওয়া যায় শেখ কামাল তারই অনন্য উদাহরণ।

লেখক : সভাপতি, সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগ এবং অস্ট্রিয়া প্রবাসী লেখক, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক।
[email protected]

এইচআর/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]