বঙ্গমাতা : গৃহকোণ থেকে জনগণের হৃদয়ে

সুভাষ সিংহ রায় সুভাষ সিংহ রায়
প্রকাশিত: ১০:৪১ এএম, ০৮ আগস্ট ২০২০

এক

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবও তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বারবার লিখেছেন স্ত্রী রেণুর গল্প। তিনি লিখেছেন, “অনেক টাকার প্রয়োজন হলে আমি আমার বোনের কাছ থেকে আনতাম। আব্বা তাকে বলে দিয়েছিলেন আমার দরকার হলে টাকা দিতে। মায়ের কাছ থেকেও আমি টাকা নিতাম। আর সময় সময় রেণুও আমাকে টাকা দিত। রেণু যা কিছু জোগাড় করত, বাড়ি গেলে এবং দরকার হলে আমাকেই দিত। কোনোদিন আপত্তি করে নাই, নিজে মোটেও খরচ করত না। গ্রামের বাড়িতে থাকত, আমার জন্যই জমিয়ে রাখত।” এই হলেন রেণু, যিনি টাকা জমাতেন তার রাজনীতি করা স্বামীর জন্য। বাংলার স্বাধীনতা, তথা স্বাধীনতাপূর্ব ইতিহাসে যে নারীর ত্যাগ ও সংগ্রাম জড়িয়ে আছে, তিনি বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। তিনি স্বামীর জন্য অনেক অলংকার বিক্রি করেছেন। শেখ মুজিবের জেলজুলুমের প্রভাব রেণু তার পরিবারের ওপর পড়তে দেননি। পরম মমতায় সামলে নিয়েছেন সন্তানদের। স্বামীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি সন্তানদের গড়ে তোলেন। তার কাছে সহযোগিতা চেয়ে কেউ কখনো রিক্ত হাতে ফিরে যায়নি। কারাগারে আটক নেতাকর্মীদের খোঁজখবর নেওয়া থেকে শুরু করে পরিবার-পরিজনদের যেকোনো সংকটে পাশে দাঁড়াতেন তিনি। স্বামীর সবকিছুর প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন তিনি। জেলখানায় বসে রেণু নামেই চিঠি লিখেছেন।

ফজিলাতুন্নেছা সম্বন্ধে একান্ত সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু বলেন, “আমার স্ত্রীর মতো সাহসী মেয়ে খুব কমই দেখা যায়। আমাকে যখন পিন্ডির ফৌজ বা পুলিশ এসে জেলে নিয়ে যায়, আমার ওপর নানা অত্যাচার করে, আমি কবে ছাড়া পাব বা কবে ফিরে আসব ঠিক থাকে না, তখন কিন্তু সে কখনো ভেঙে পড়েনি। আমার জীবনে দুটি বৃহৎ অবলম্বন। প্রথমটা হলো আত্মবিশ্বাস, দ্বিতীয়টা হলো আমার স্ত্রী আকৈশোর গৃহিণী।”

দুই

একমাত্র বঙ্গমাতার কারণেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রচিত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থটি আমরা পেয়েছি। যে বই দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের বীজ বপনের উৎকৃষ্ট দলিল হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। জেনেছি অজানা অনেক ইতিহাস। শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের অবদান নিয়ে এই বইয়ের শুরুতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহমান বলেন, “আমার সহধর্মিণী একদিন জেলগেটে বসে বললো, বসেই তো আছো, লেখ তোমার জীবনের কাহিনী। বললাম, লিখতে যে পারি না, আর এমন কী করেছি যা লেখা যায়। আমার জীবনের ঘটনাগুলো জেনে কি জনসাধারণের কোনো কাজে লাগবে? কিছুই তো করতে পারলাম না। শুধু এইটুকু বলতে পারি- নীতি ও আদর্শের জন্য সামান্য একটু ত্যাগ স্বীকার করতে চেষ্টা করেছি।”

ফজিলাতুন্নেছা মুজিব শুধু লেখার কথা বলেই তার দায়িত্ব শেষ করেননি। তিনি রীতিমতো উদ্যোগ নিয়ে লেখার ব্যবস্থাও করে দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু তার আত্মজীবনীতে আরও উল্লেখ করেন, “আমার স্ত্রী যার ডাকনাম রেণু আমাকে কয়েকটা খাতাও কিনে জেলগেটে জমা দিয়ে গিয়েছিল, জেল কর্তৃপক্ষ যথারীতি পরীক্ষা করে খাতা কয়টা আমাকে দিয়েছেন। রেণু আরও একদিন জেলগেটে বসে আমাকে অনুরোধ করেছিল, তাই আজ লিখতে শুরু করলাম।” বঙ্গবন্ধুকে লেখার অনুরোধ, লেখার ব্যবস্থার পাশাপাশি কঠিন পরিস্থিতিতে তিনি এগুলো সংরক্ষণও করেছেন।

‘কারাগারের রোজনামচা’ বইয়ের ভূমিকায় মুজিব-কন্যা শেখ হাসিনার জবানি থেকে জানা যায়, ড. ওয়াজেদ সাহেব আণবিক কমিশনের অফিসার হওয়ায় অফিসে নিয়মিত আসা-যাওয়া করতেন, কিন্তু নজরদারি ছিল খুব। এদিকে বাচ্চারা স্কুলে যাবে, সঙ্গে ছিল না কোনো বই পুস্তক। পাকিস্তানি জওয়ানরা জানতে চেয়েছিল বই পুস্তক কোথায়? উত্তর দেওয়া হয়েছিল ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাসায়, আর যেটি ছিল পাকিস্তানি আর্মিদের দখলে। প্রসঙ্গক্রমে ৩২ নম্বর প্রবেশের অনুমতি পাওয়া গেল এবং সঙ্গে ছিলেন শেখ হাসিনা। সেই কঠিন থেকে কঠিনতম সময়ে ফজিলাতুন্নেছা মুজিব তার প্রিয় কন্যা শেখ হাসিনাকে বলেছিলেন, “একবার যেতে পারলে আর কিছু না হোক, তোর আব্বার লেখা খাতাগুলো যেভাবে পারিস নিয়ে আসিস।” এবং খাতাগুলো কোথায় পাবে বা কোথায় রাখা আছে সেটিও সুনির্দিষ্টভাবে বলেছিলেন। শেখ হাসিনা তার লেখায় আরও উল্লেখ করেছেন, “বঙ্গবন্ধু যেদিন জেল থেকে মুক্তি পেতেন, জেলগেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতেন ফজিলাতুন্নেছা মুজিব এবং বঙ্গবন্ধুর লেখা খাতাগুলো যেন ঠিকভাবে ফেরত আসে সে-বিষয়ে তিনি নজর রাখতেন।” আজ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ পৃথিবীর বিখ্যাত ভাষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি। শুধু তাই নয়, বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো। আর এই ভাষণেরও মূল সাহস জুগিয়েছেন শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। ওই ভাষণে কী বলতে হবে, কার কথা বলতে হবে, খুব কাছে থেকে শেখ মুজিবকে পরামর্শ দিয়েছিলেন বেগম মুজিব।

suvash2

তিন

পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভা ভেঙে দিলে ১৪ দিনের নোটিসে ৩নং মিন্টো রোডের বাসা ছাড়তে বাধ্য হন বেগম মুজিব। এ রকম অনেকবার তার বাসা বদল করতে হয়েছে। লাহোরে গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণের জন্য বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ বিষয়ে বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জোরালো আপত্তি জানান এবং একরকম প্রতিহত করেন। বাঙালিরা ঐক্যবদ্ধ, তাই বেগম মুজিবের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করতেই হবে। বঙ্গবন্ধু যেন শক্ত থাকেন, সে বিষয়ে তিনি পরামর্শ দেন। বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব স্মরণীয় একটি নাম। একটি ইতিহাস। মনেপ্রাণে একজন আদর্শ নারী। সন্তানদের সার্থক মাতা। বিচক্ষণ উপদেষ্টা ও পরামর্শদানকারী। আর বঙ্গবন্ধুর সুখ-দুঃখের সাথী এবং প্রেরণা ও শক্তির উৎস ছিলেন তিনি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবও (যিনি বঙ্গবন্ধুর প্রিয় রেণু) পরস্পর অবিচ্ছেদ্য নাম। বেগম ফজিলাতুন্নেছার শৈশবের সঙ্গী শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৫৪ সালে শেখ মুজিব মন্ত্রী হলে বেগম মুজিব গেণ্ডারিয়ার বাসা ছেড়ে ৩ নম্বর মিন্টো রোডের বাড়িতে ওঠেন। পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভা ভেঙে দিলে ১৪ দিনের নোটিসে ৩ নম্বর মিন্টো রোডের বাসা ছাড়তে বাধ্য হন বেগম মুজিব। এ রকম অনেকবার বাসা বদল করতে হয়েছে। অবশেষে ১৯৬১ সালে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে নিজেদের বাড়ির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় এবং ওই বছরের ১ অক্টোবর বেগম মুজিব ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িতে প্রবেশ করেন।

প্রাতিষ্ঠানিক কোনো ধরনের শিক্ষা ছাড়াই তিনি ছিলেন সূপ্রতিভাসম্পন্ন জ্ঞানী, বুদ্ধিদীপ্ত, দায়িত্ববান ও ধৈর্যশীল। জাতির পিতার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ লেখার ক্ষেত্রেও মূল প্রেরণা ও উৎসাহ ছিল তার। শেখ মুজিব তার আত্মজীবনীতেও সহধর্মিণীর সেই অবদানের কথা স্মরণ করেছেন। জীবন সংগ্রামের সব কণ্টকাকীর্ণ পথ অতিক্রম করে তিনি পরিবারও সামলেছেন বেশ গুছিয়ে।

কারাগারে সাক্ষাৎ করে বঙ্গবন্ধুর মনোবল দৃঢ় রাখতেও সহায়তা করতেন তিনি। বঙ্গবন্ধু যখন কারাগারে তখন বাঙালি মুক্তির সনদ ৬-দফা কর্মসূচি সফলের ক্ষেত্রেও তার রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। কলকাতায় অবস্থানকালে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত স্বামী শেখ মুজিবের যখনই অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হতো তখনই পিতৃসম্পত্তি থেকে অর্জিত অর্থ বিনা দ্বিধায় পাঠিয়ে দিতেন তিনি।

বঙ্গবন্ধুর ওপর জেল-জুলুম চালিয়েছে পাকিস্তান সরকার। ওই সময় নিজের ঘরের আসবাবপত্র, অলঙ্কার বিক্রি করেও দল ও নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। একজন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী হয়েও সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করতেন তিনি। তার বাড়িতে কোনো বিলাসী আসবাবপত্র ছিল না, ছিল না কোনো অহংবোধ।

চার

স্বাধীনতার পর বীরাঙ্গনাদের উদ্দেশ্যে বঙ্গমাতা বলেন, “আমি তোমাদের মা।” তিনি বলেন, “এই বীরাঙ্গনা রমণীদের জন্য জাতি গর্বিত। তাদের লজ্জা কিংবা গ্লানিবোধের কোনো কারণ নেই। কেননা তারাই প্রথম প্রমাণ করেছেন যে, কেবল বাংলাদেশের ছেলেরাই নয়, মেয়েরাও আত্মমর্যাদাবোধে কী অসম্ভব বলীয়ান।” [দৈনিক বাংলার বাণী, ১৭ ফাল্গুন, ১৩৭৮ বঙ্গাব্দ]। রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের ক্ষমতায়নে জোরালো ভূমিকা রাখেন। সরকারি বিভিন্ন চাকরির সুযোগ করে দিতেন বিভিন্ন সেক্টরে সুপারিশ করেও নারীর ক্ষমতায়নকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছেন। বঙ্গবন্ধু এর মধ্যে ফিরে এসেছেন। তিনি রাষ্টীয়ভাবে নারীদের পুনর্বাসনে পরিকল্পনা নেন। বদরুননেসা আহমেদ ও নুরজাহান মুরশেদকে তিনি দায়িত্ব দেন একটি পরিকল্পনা প্রণয়নে সেখানে শুধু বীরাঙ্গনায় নয় যারা পরিত্যক্ত, আশ্রয়হীন, বিধবা, অসহায় তাদেরও যেন পুনর্বাসন করা যায়। এ পরিপ্রেক্ষিতেই সরকার ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ সালে নারী পুনর্বাসন বোর্ড গঠন করে। এটি ছিল সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত একটি স্বায়ত্তশাসিত বোর্ড। এ বোর্ডের সভাপতি করা হয় বিচারপতি কে এম সোবহানকে। বোর্ডে বিচারপতি, লেখিকা জনপ্রতিনিধি ছাড়াও ছিলেন সদ্য বিধবারা। বিরাট অংকের টাকা। জনাব আবদুল আওয়ালকে কর্মসূচির প্রধান করা হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা সৈয়দ জাহাঙ্গীর হায়দারকে প্রশাসনিক পরিচালক ও শহীদ এমপি মামুন মাহমুদের স্ত্রী মোশফেকা মাহমুদকে করা হয় ফিনান্স ডিরেক্টর। ফলে যুদ্ধশিশুদের দত্তকের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় বিদেশে। এ জন্য ১৯৭২সালে হয় The Bangladesh Abandoned children (special prosvision) order of 1972. যুদ্ধশিশুদের পুনর্বাসনের জন্যও বঙ্গবন্ধু সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। জেনেভার ইন্টারন্যাশনাল সোশ্যাল সার্ভিসকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ জানান কিছু একটা করার জন্য। আইএসএস, বাংলাদেশের পরিবার পরিকল্পনা সমিতি ও বাংলাদেশ সেন্ট্রাল অর্গানাইজেশন ফর রিহ্যাবিলিটশনের সাহায্যে একটি কার্যক্রম গ্রহণ করে যার ফলে বহু যুদ্ধশিশু বিদেশে মা-বাবার কাছে আশ্রয় পায়। বঙ্গবন্ধু সর্বাস্তকরণে বীরাঙ্গনাদের জন্য যা সম্ভব তাই করতে চেয়েছেন পরবর্তীতে যা সব যা সবার অজান্তে একটি সামাজিক বিপ্লব ঘটিয়েছে।

suvash2

পাঁচ

মায়ের স্মৃতিচারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, “পৃথিবীতে যা কিছু অর্জন হয়, তার পেছনে প্রেরণা দেওয়ার কেউ-না-কেউ থাকেন। তা না হলে কখনো কোনো নেতাই সফলকাম হন না। ঠিক তেমনি আমার বাবার রাজনীতির পেছনে আমার মায়ের বিশাল অবদান রয়েছে। রাজনৈতিকভাবে আমার মা দৃঢ়চেতা ছিলেন।” তিনি বলেন, মার্শাল ল’ দেওয়ার পর নেতাকর্মীরা জেলে। পরিবারগুলো বাজার করতে পারে না। আমার মা কিন্তু নিজের কথা চিন্তা করেননি। আওয়ামী লীগের কোনো নেতা, কার বাড়িতে চুলা জ্বলল কি না, তার খবরটা রাখতেন, কোনো কর্মী অসুস্থ কি না তার খবরটা রাখতেন। নিজের ঘরে খাবার আছে কি না, সেটা তিনি কখনো দেখতেন না। কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী কোন অবস্থায় আছে, গরিব আত্মীয়-স্বজনকে দেখা, তাদের ছেলেমেয়েদের বিয়ে-শাদি থেকে শুরু করে লেখাপড়া, চিকিৎসা, সবকিছু যেন আমার বাসা ছিল অবারিত দ্বার। সবার জন্যই যতটুকু পারতেন সাহায্য করে যেতেন। শেখ হাসিনা বলেন, আন্দোলন কীভাবে করতে হবে, সেটা আমার মায়ের কাছ থেকেই শেখা দেখা। বঙ্গমাতা ছিলেন ‘গেরিলা’ : বঙ্গবন্ধু কারাগারে থাকা অবস্থায় তার নির্দেশনা কীভাবে গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে নেতা-কর্মীদের কাছে পৌঁছে দিতেন, সেটিও জানান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িকে ঘিরে তখনকার গোয়েন্দা সংস্থা আইবি’র নজরদারি থাকত। তারা সব সময় পাহারায় রাখত বাড়ির লোকজন কোথায় যায় না যায়। আমার মা তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ছোট ফুপুর বাসায় যেতেন আমাদের নিয়ে। ছোট ফুপুর বাসায় কিছু বিহারি থাকত, তারা বোরকা পরে চলত। (তাদের মতো) চকচকে পাথরওয়ালা স্যান্ডেল, তারপর শাড়ি নিয়ে মা ফুপুর বাসায় কাপড় চেঞ্জ করে বোরকা পরে স্কুটার নিয়ে চলে যেতেন আজিমপুর। সেখানে ছাত্র-নেতাদের সঙ্গে তিনি বৈঠক করতেন, আব্বা কারাগারে থেকে যে নির্দেশনাগুলো দিতেন বা স্লোগানগুলো দিতেন, সেগুলো পৌঁছে দিতেন। এই খবরগুলো কোনোদিন ইন্টেলিজেন্সের লোকেরা পায়নি। মানে আমার মা ছিল আসল গেরিলা। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ৬-দফা প্রস্তাব তোলার পর তাকে গ্রেফতারের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৮ মে আব্বাকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেল। এই গ্রেফতারের প্রতিবাদে ও ৬-দফা দাবির পক্ষে আন্দোলনের ডাক দিল আওয়ামী লীগ। আমার মা-ই আয়োজন করলেন ৭ জুনের হরতাল। এই আন্দোলনটাকে গড়ে তোলার জন্য আমার মা সব সময় সক্রিয় ছিলেন। বঙ্গবন্ধু স্বামী হিসেবে কেমন ছিলেন, পিতা হিসেবে কেমন ছিলেন, মানুষ হিসেবে কেমন ছিলেন, তার একটা চিঠিতে বিন্দুর মধ্যে সিন্ধুদর্শন হবে।

ঢাকা জেল
১৬-৪-৫৯

রেণু,
আমার ভালোবাসা নিও। ঈদের পরে আমার সাথে দেখা করতে এসেছো ছেলেমেয়েদের নিয়ে আস নাই। কারণ তুমি ঈদ করো নাই। খুবই অন্যায় করেছো। ছেলেমেয়েরা ঈদে একটু আনন্দ করতে চায়। কারণ সকলেই করে। তুমি বুঝতে পারো ওরা কতো দুঃখ পেয়েছে। আব্বা ও মা শুনলে খুবই রাগ করবেন। আগামী দেখার সময় ওদের সকলকে নিয়ে আসিও। কেন যে চিন্তা করো বুঝি না। আমার যে কবে মুক্তি হবে তার কোনো ঠিক নাই। তোমার একমাত্র কাজ হবে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শিখানো। টাকার দরকার হলে আব্বাকে লেখিও, কিছু কিছু মাসে মাসে দিতে পারবেন। হাসিনাকে মন দিয়ে পড়তে বলিও। কামালের স্বাস্থ্য মোটেই ভাল হচ্ছে না। ওকে নিয়মমতো খেতে বলিও। জামাল যেন মন দিয়ে পড়ে আর ছবি আঁকে। এবার একটা ছবি এঁকে যেন নিয়ে আসে আমি দেখব। রেহানা খুব দুষ্টু, ওকে কিছুদিন পর স্কুলে দিয়ে দিও জামালের সাথে। যদি সময় পাও নিজেও একটু লেখাপড়া করিও। একাকী থাকতে একটু কষ্ট প্রথম হতো। এখন অভ্যাস হয়ে গেছে কোন চিন্তা নাই। বসে বসে বই পড়ি। তোমার শরীরের প্রতি যত্ন নিও।

ইতি-
তোমার মুজিব।

এ চিঠিতে আমরা পাচ্ছি স্ত্রীর প্রতি তার ভালোবাসা, পিতামাতার প্রতি ভালোবাসা, সন্তানদের প্রতি ভালোবাসা এবং কর্তব্যবোধ, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করানোই যে প্রধান কাজ সেই বোধ, সন্তানদের স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তা, স্ত্রীর কুশল চিন্তা, স্ত্রীকেও পড়তে বলা এবং ছবি আঁকার গুরুত্ব। আর তিনি নিজে কী করছেন? পড়ছেন। আর নিজের স্বার্থত্যাগ, আত্মদান, আত্মত্যাগ। একা থাকা অভ্যাস হয়ে গেছে। চিন্তা নাই।

সাত

আমার মায়ের সময়োচিত সিদ্ধান্তই তো আমার দেশ এগিয়ে গেল। ৭ মার্চের ভাষণের আগে বঙ্গবন্ধুকে নির্ভার করেছিলেন বঙ্গমাতা। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণে তার মায়ের অবদান কতটুকু তাও জানান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ভাষণের আগে কতজনের কত পরামর্শ, আমার আব্বাকে পাগল বানিয়ে ফেলছে। সবাই এসেছে, এটা বলতে হবে, ওটা বলতে হবে। আমার মা আব্বাকে খাবার দিলেন, ঘরে নিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। মা সোজা আব্বাকে বললেন, তুমি ১৫টা মিনিট শুয়ে বিশ্রাম নিবা। অনেকেই অনেক কথা বলবে। তুমি সারাজীবন আন্দোলন করেছ, তুমি জেল খেটেছ। তুমি জান কী বলতে হবে। তোমার মনে যে কথা আসবে, সেই কথা বলবা। অন্য কারও কোনো কথা বলার দরকার নাই। বঙ্গবন্ধু এই ভাষণে সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন কি না, সে নিয়ে সে-সময় নানা জিজ্ঞাসা ছিল। আর এই সম্ভাবনার পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণের প্রস্তুতিও ছিল। তবে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দেন পরোক্ষভাবে আর সেটি বুঝতে পারেনি পাকিস্তানিরা। শেখ হাসিনা বলেন, ওই বক্তৃতায় একটা ভুল যদি হতো, লাখ লাখ মানুষ সেদিন শহিদ হতো। পাকসুবেদার, মেজর তারার কাছে এক ঘণ্টা সময় চাইলে মেজর তারা সেই অনুরোধে রাজি হয়ে ফিরে যেতে উদ্যত হলেই, মমিনুল হক খোকা মেজর তারাকে বলেন যে পাকিবাহিনীকে সময় দিলেই তারা বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে। এ কথা শুনেই মেজর তারা পাকিবাহিনীর সদস্যদের নিরস্ত্র করেন এবং তাদের সাধারণ পোশাক পরিয়ে তার সাথে নিয়ে যান, তার আগে নিশ্চিত করেন যে, বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সকল সদস্য নিরাপদে আছেন। ভেতরে গিয়ে মেজর তারা দেখতে পান নবজাতক সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয়সহ শেখ হাসিনা মেঝেতে শয্যা পেতেছিলেন বন্দী থাকাকালীন সময়ে, শেষ দুইদিন কোনো খাবারও ছিল না বঙ্গবন্ধুর পরিবারের কাছে। শুধু বিস্কিট খেয়ে কাটিয়েছিলেন তারা স্বাধীন দেশে দুইদিন।

suvash2

আট

২৫ মার্চ ১৯৭১-এর সেই কালরাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানি বাহিনী তাকে অন্তরীণ করে রাখে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট স্কুল ও কলেজের এক অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ার পর, বেগম মুজিব শেখ রাসেল ও শেষ জামালকে নিয়ে অসহায় অবস্থায় আশ্রয় নেন পার্শ্ববর্তী প্রতিবেশীদের বাড়িতে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে-সময় অন্তসত্ত্বা থাকায় শেখ রেহানাকে সাথে নিয়ে উনি আগেই চলে গিয়েছিলেন ওনার স্বামী বিশিষ্ট পরমাণুবিজ্ঞানী এমএ ওয়াজেদ মিয়ার ধানমন্ডির ১৫ নম্বর রোডের বাড়িতে। স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এ-বাসা ও-বাসা করে অবশেষে পাকিস্তান বাহিনীর সিদ্ধান্ত মোতাবেক ধানমন্ডির ১৮ নম্বর সড়কের এই বাসায় অন্তরীণ করা হয় মুজিব পরিবারকে।

বঙ্গবন্ধু তার স্ত্রী সম্বন্ধে খুব উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন। তিনি বলতেন, আমার স্ত্রীর মতো সাহসী মেয়ে কমই দেখা যায়। আমাকে যখন পিন্ডির ফৌজ বা পুলিশ এসে জেলে নিয়ে যায়, আমার উপর নানা অত্যাচার করে। আমার স্ত্রী কখনও ভেঙে পড়েন না। যদি ভেঙে পড়তো, কান্নাকাটি করতো তবে আমাকে কি মুশকিলেই পড়তে হতো। একবার তিনি বলেন, আমার জীবনে দুটি বৃহৎ অবলম্বন আছে। একটি আমার আত্মবিশ্বাস, অপরটি মৃদু হেসেব বললেন- আমার স্ত্রী, আমার আকৈশোর গৃহিণী।

বাংলাদেশ জাতীয় এয়ারলাইন্সের নামকরণ কী হবে এ নিয়ে একটি মজার কাহিনি রয়েছে। ঘটনাটি বঙ্গবন্ধুর জবানিতেই শোনা যাক। একদিন এক চামচা এসে আমাকে বলল, ‘বঙ্গবন্ধু’ আমাদের জাতির এয়ারলাইন্স-এর নাম আমরা কেন বঙ্গমাতার নাম ফজিলাতুন্নেছা রেখে দেই না। ইউরোপের একটি এয়ারলাইন্সের নাম আছে লুৎফুন্নেসা। তখন বঙ্গবন্ধু ধমক দিয়ে বললেন, “ওটা লুৎফুন্নেসা নয় লুফথান্সা (Lufthansa) জার্মান এয়ারলাইন্সের নাম। পৃথিবীর কোথাও কোনো ব্যক্তির নামে কোনো এয়ারলাইন্স নেই, এয়ারপোর্ট আছে। যাও এখানে থেকে চামচাগিরি করো না।”

১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দরের নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ১৪ গার্ড কোম্পানিকে। কোম্পানি কমান্ডার তরুণ ভারতীয় অফিসার মেজর অশোক কুমার তারা (পরে কর্নেল) ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে যুদ্ধ করে ফিরেছেন। সামরিক দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গঙ্গাসাগর। এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এমন কোনো সপ্তাহ নেই যে এখানে যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি। গঙ্গাসাগর যুদ্ধে অবদান রেখে এই তরুণ অফিসার বীরচক্র উপাধি পেয়েছেন। তার ডাক পড়ল আবার। ব্যাটালিয়নের কমান্ডার বিজয় কুমার চান্নার কাছে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছে এক রাজনৈতিক নেতা। মুজিব পরিবার এখনো বন্দী। পাকসেনাদের আচরণ খুবই হিংস্র। চান্না ডেকে পাঠান অশোক তারাকে। মুজিব পরিবারকে উদ্ধার করতে হবে তাকে। ভেতরে বেগম মুজিব, বঙ্গবন্ধুর পুত্র-কন্যারা আটকে আছে। ধানমন্ডি ৩২ নম্বর মাত্র ২০ মিনিট দূরত্ব। সেই রাজনৈতিক নেতা আর তিনজন সেনা নিয়ে জিপে চেপে বসেন অশোক তারা। মুক্তিবাহিনী জানালো আগের দিন রাতে একজন নারীসহ পাঁচজনকে হত্যা করেছে পাকসেনারা। তাদের সীমানা ভেঙে সামনে এগিয়ে যাওয়াতে এক সাংবাদিকের গাড়ি লক্ষ্য করেও গুলি চালায় পাকবাহিনী। গাড়ির ভেতরেই পড়ে ছিল সেই গুলিতে ঝাঁজরা সাংবাদিকের মরদেহ। অশোক তারা তার অস্ত্রটি জওয়ানের হাতে তুলে দেন। হাত উঁচু করে রাস্তা পার হতে শুরু করেন। ছাদ থেকে হুঁশিয়ার আসে। এক পা এগোলেই গুলি করা হবে। মেশিনগানটা একবার ফায়ার শুরু করলে কভার নেওয়ার কোনো জায়গা পর্যন্ত নেই।

অশোক তারা জোরগলায় জানালেন তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন অফিসার। তিনি বিনা অস্ত্রে এসেছেন। তারপর তিনি বলেন, “আমি এখানে অস্ত্র ছাড়া এসেছি কারণ তোমাদের বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে। তুমি অফিসারের কাছ থেকে জেনে নাও।” তখনই জানা গেল তাদের অফিসার লাপাত্তা। রেডিও যোগাযোগও নেই। অশোক তারা আকাশে ওড়া ভারতীয় হেলিকপ্টারও দেখেন। তিনি কিন্তু তখনো হাঁটা থামাননি। এরপর তিনি জানালেন আত্মসমর্পণ করলে তাদের নিরাপদে দেশে যেতে দেওয়া হবে। তাদের পরিবার, স্ত্রী-সন্তানের মুখ তারা দেখতে পারবে। আত্মসমর্পণ ছাড়া তাদের জীবনের নিশ্চয়তার আর কোনো রাস্তা নেই। উল্লেখ্য, পাকসেনাদের ধারণা ছিল মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করলে জেনেভা কনভেনশনে বর্ণিত নীতিমালা অনুযায়ী আচরণ করা হবে না এবং তাদের হত্যা করা হবে। একপর্যায়ে হেঁটে হেঁটে গেটের কাছে পৌঁছে যান অশোক তারা। সেন্ট্রি বন্দুকের নল ঠেকিয়ে বসে তার বুকে। চোখ বন্ধ করে গুলির অপেক্ষায় প্রমাদ গুনছিলেন তিনি।

suvash2

“আপনি যদি আমাদের না বাঁচান তবে ওরা আমাদের নিশ্চিত মেরে ফেলবে।” বাড়ির ভেতর থেকে এক নারী কণ্ঠের চিৎকার! তিনি যেন নতুন এক উদ্যম পেলেন। তার হেরে যাওয়া চলবে না। এই পরিবারকে উদ্ধার করতে হবে। ছাদের উপর থাকা সেনার সাথে কথা বলতে বলতেই বুক থেকে বন্দুক সরিয়ে ফেলেন তিনি। সেনারাও বুঝতে শুরু করে আত্মসমর্পণই তাদের একমাত্র রাস্তা। মুজিব পরিবারের সামান্য আঁচড় লাগলেও মুক্তিবাহিনী তাদের ছাড়বে না। শেষ পর্যন্ত ১০-১২ জন সেনা আত্মসমর্পণ করে। ব্যারাকে ফেরত পাঠানো হয় তাদের। বাড়িতে ঢুকতেই বেগম মুজিব তাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, “তুমি আমার পোলা বাবা।” তারার বর্ণনা অনুযায়ী বাড়িতে কোনো আসবাবপত্র ছিল না। মেঝেতে ঘুমাত সবাই। খাবার ছিল শুধু বিস্কুট আর পানি। বঙ্গবন্ধু মুক্তি পাবার আগেই অশোক তারা মিজোরামে ফেরত যান। পরে বঙ্গবন্ধু মুক্তি পেয়ে দেশে আসার পর আবার তিনি বাংলাদেশে এসে শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করেন। ২০১২ সালে স্বাধীনতার ৪৮ বছর পর তাকে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা পদক’ প্রদান করে বাংলাদেশ সরকার।

নয়

১৯৭১ সালের ১৯ ডিসেম্বর বেগম মুজিবের সাথে জেনারেল আরোরা সাক্ষাৎ। ঢাকায় অবস্থানরত ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড প্রধান লে. জে. আরোরা, সচিব রুহুল কুদ্দুস, ডাকসু জিএস আবদুল কুদ্দুস মাখনকে সাথে নিয়ে বেগম মুজিবের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য বেগম মুজিবের বর্তমান অবস্থান ধানমন্ডি ১৮নং সড়কের বাড়িতে গিয়েছিলেন। সেখানে বেগম মুজিবের আত্মীয়-স্বজনসহ দেশি-বিদেশি সাংবাদিকরাও উপস্থিত ছিলেন। জেনারেল আরোরা বেগম মুজিবের কাছে পরিবারের সবার খোঁজখবর নেন। বেগম মুজিব তাকে দেখতে আসার জন্য আরোরাকে ধন্যবাদ জানান এবং পাক গৃহবন্দিত্ব থেকে তাকে উদ্ধারের জন্য ভারতীয় সেনা ইউনিটের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন। বেগম মুজিব জানিয়েছিলেন বিগত সময়টার পুরোটাই তাদের মেঝেতে ঘুমাতে হয়েছিল। কোনো আত্মীয়-স্বজনের সাথে দেখা-সাক্ষাতের সুযোগ দিত না। ২৬ জন সৈনিক এখানে পাহারায় থাকত। বেগম মুজিব বাংলায় কথা বলেছিলেন, একজন দোভাষী তা আরোরাকে তর্জমা করে দিয়েছিলেন। আরোরা বেগম মুজিবকে বলেন, তিনি ভারতে ফিরে শেখ মুজিবের মুক্তির ব্যাপারে তার সরকারের কাছে বলবেন। আরোরা ফিরে যাওয়ার আগে বেগম মুজিবকে ৩২ নম্বরের বাড়িতে উঠার পরামর্শ দেন। উত্তরে বেগম মুজিব বলেন, পাকিস্তানিদের বর্বরতা জনগণকে দেখানোর জন্যই তিনি সেখানে সহসা উঠছেন না। পরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কয়েকজন পাইলট বেগম মুজিবের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। পাইলটের দলটি বেগম মুজিবকে ফুলের তোড়া উপহার দেন। উত্তরে বেগম মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাদের ভূমিকার জন্য তাদের এবং তাদের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

“জগতের যত বড় বড় জয় বড় বড় অভিযান
মাতা ভগ্নী ও বধূদের ত্যাগে হইয়াছে মহীয়ান
কোন রণে কত খুন দিল নর, লেখা আছে ইতিহাসে,
কত নারী দিল সিঁথির সিঁদুর, লেখা নাই তার পাশে।
কত মাতা দিল হৃদয় উপাড়ি কত বোন দিল সেবা,
বীরের স্মৃতি-স্তম্ভের গায়ে লিখিয়া রেখেছে কেবা?
- জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম

আশার কথা যে, আজ সামাজিক পরিবর্তনের পাশাপাশি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটেছে। একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে নারী-পুরুষের সমন্বিত প্রচেষ্টায় একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে উঠছে, আর এখানেই কবির সার্থকতা প্রতীয়মান। এই আন্দোলনে ক্রমাগত লড়াই করে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতার দুই সুকন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। জাতিসংঘের ইউনেস্কোর সাবেক প্রধান ইরিনা বোকোভা ২০১৪ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে ‘শান্তি বৃক্ষ’ পদক তুলে দিয়ে বলেছিলেন, ‘শেখ হাসিনা একজন সাহসী নারী। আলোকবর্তিকা হিসেবে পৃথিবীর সবাইকে পথ দেখা দেখাচ্ছে।’ বঙ্গমাতার জন্মবার্ষিকীতে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই অমোঘ বাণী স্মরণ করতে পারি, ‘প্রাণকে নারী পূর্ণতা দেয়, এই জন্যই নারী মৃত্যুকেও মহীয়ান করতে পারে।’

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

এইচআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]