ক্ষমা করো হজরত

মাহমুদ আহমদ
মাহমুদ আহমদ মাহমুদ আহমদ , ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট
প্রকাশিত: ১০:১১ এএম, ১৪ আগস্ট ২০২০

বিশ্বের যে দিকে তাকাই শুধু অশান্তি আর অশান্তি। প্রতিদিন প্রতিনিয়ত বিশ্বের কোথাও না কোথাও রক্তপাতের ঘটনার সংবাদ পাওয়াই যায়। সম্প্রতি লেবাননেও ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। তাই মানুষের হত্যার সংবাদও এখন আর আমাদেরকে ব্যথিত করে না। ভোর হলেই মনের মাঝে অজানা এক আতঙ্ক বিরাজ করতে থাকে, না জানি আজকে কোন দেশে কত মায়ের বুক খালি হয়।

দেশজুড়ে জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় পুলিশ সদর দফতর থেকে ঈদের আগে সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। এতে বলা হয় পুলিশকে টার্গেট করে বা পুলিশ স্থাপনায় হামলা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে হত্যাকাণ্ড, নাশকতা ও ধ্বংসাত্মকমূলক কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা করছে জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) আদলে গঠিত নব্য জেএমবির সদস্যরা।

আজ পৃথিবীতে এমন কোন দেশ আছে কী যারা এ দাবি করতে পারে যে, আমরা সম্পূর্ণভাবে সন্ত্রাসী হামলা থেকে নিরাপদ? মোটেও না। সমগ্র পৃথিবীতেই যেন এক ধরনের যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। অথচ সকল মানব একই আদম হাওয়ার বংশধর এবং এক আল্লাহপাকের সৃষ্টি। অর্থাৎ আমাদের সবার সৃষ্টি একই উৎস থেকে। যেভাবে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে মানুষ! তোমাদের প্রভু-প্রতিপালকের তাকওয়া অবলম্বন কর, যিনি একই সত্তা থেকে তোমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং তা থেকে তার সঙ্গী সৃষ্টি করেছেন আর তাদের উভয় থেকে বহু নর ও নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন।’ (সুরা আন নিসা: আয়াত ১) মানুষ হিসেবে আমরা সবাই একই উম্মাহর অন্তর্ভূক্ত এবং একই বংশধর হওয়া সত্ত্বেও আজ আমরা একে অপরের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব পোষণ করছি।

আল্লাহপাক সমস্ত আদম সন্তানকে প্রভূত সম্মান ঠিকই দান করেছেন কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে আমরা সেই সম্মান ধরে রাখতে পারি নি। সব আদম সন্তানকে আল্লাহ তাআলা সমভাবে সম্মানিত করেছেন এবং কোন বিশেষ জাতি বা গোত্রের প্রতি পক্ষপাতমূলক ব্যবহার করেননি। একজন মানুষ সে যে ধর্মেরই হোক না কেন তার মূল পরিচয় হলো সে আদম সন্তান আর আদম সন্তান হিসেবে সব ধর্মের মানুষ একই উম্মত। আল্লাহপাকের কাছে সবাই সমান মর্যাদার অধিকারী।

মানুষ হিসেবে তিনি কাউকে পৃথক করেন নি। তার দৃষ্টিতে সবাই সমান এবং একই উম্মাহ কিন্তু পরবর্তিতে মানুষ বিভিন্ন দলে উপদলে বিভক্ত হয়ে যায়। যেমন কুরআনে উল্লেখ আছে, ‘আর মানবজাতি একই সম্প্রদায়ভুক্ত ছিল। পরবর্তীতে তারা মতভেদ করলো।’ (সুরা ইউনুস: আয়াত ১৯) ‘কিন্তু তারা তাদের মাঝে নিজেদের বিষয়কে বহু খণ্ডে খণ্ডিত করে ফেলেছে। প্রত্যেক দল তাদের কাছে যা আছে তা নিয়ে অহংকার করছে।’ (সুরা মোমেনুন: আয়াত ৫৩)

আসলে সমসাময়িক নবীর মৃত্যুর পরে নবীর অনুসারীরা সাধারণত নিজেদের মধ্যে মতভেদ আরম্ভ করে এবং দলে-উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। আর প্রত্যেক দলই মনে করে তারাই নবীর সত্য অনুসারী এবং অন্যান্যরা ভ্রান্ত কিন্তু সব নবী অনুসারীরাই আদম-হাওয়ারই বংশধর।

আল্লাহপাক এই পৃথিবীতে অসংখ্য নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন মানবের সংশোধন আর দলে-উপদলে বিভক্ত না হয়ে সবাই যেন একই সৃষ্টিকর্তার ইবাদত করে। এক নেতৃত্বের অধিনে থেকে জীবন পরিচালিত করাই খোদাতায়ালার ইচ্ছা আর এ লক্ষ্যেই তিনি নবী-রাসুলদের প্রেরণ করেছেন। আজ মুসলিম জাহানের অবস্থার দিকে লক্ষ্য করলে সহজেই বুঝা যায়, তাদের অবস্থা কোন পর্যায় গিয়ে পৌঁছেছে। সমগ্র মুসলিম জাহান আজ চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন।

শ্রেষ্ঠ নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসারী মুসলমানরা আজ নিজেরাই নিজেদেরকে হত্যা করছে। এর কারণ কী? আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে মনে হয় এর মূল কারণ হচ্ছে, মুসলমান আজ পবিত্র কুরআনের আদেশ ও শ্রেষ্ঠ নবীর শিক্ষার ওপর আমল করা ছেড়ে দিয়ে কার ধর্ম কি তা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। পবিত্র কোরআন কি বলে তার অনুসরণ না করে বাহ্যিকতার অনুসরণ করছে।

সমগ্র বিশ্বে মাজহাবি যুদ্ধে আজ মরছে সাধারণ নিরিহ মানুষ। আজ পাকিস্তানে যেমন সুন্নিরা আক্রান্ত হচ্ছে শিয়াদের দ্বারা শিয়ারা আক্রান্ত হচ্ছে সুন্নিদের দ্বারা আবার আহমদিয়া সদস্যরাও সেখানে আক্রান্ত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ভারতে হিন্দুদের দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে মুসলমানরা।

পাকিস্তানে আজ এমন কোনো দিন অতিবাহিত হয় না যেখানে মাজহাবের ফেরে ডজন খানেক লোককে প্রাণ হারাতে না হয়। এছাড়া ইরাক, ইরান, আফগানিস্তান, লিবিয়া, ইয়েমেনসহ বিশ্বের বহু দেশে কেবল মাত্র এই মাজহাবের কারণে প্রতিনিয়ত প্রাণ হারাতে হচ্ছে হাজার হাজার মানুষের। চালানো হচ্ছে নিরীহ নিরপরাধ অবোধ শিশুদের ওপর একের পর এক বর্বরোচিত হামলা।

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর যে নির্যাতন এর মূলেও কিন্তু মাজহাব। মিয়ানমার থেকে কোন মতে জীবন নিয়ে আমাদের দেশে আশ্রয় নেয়া লাখো রোহিঙ্গা মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে হাজারো শিশু, যাদের বয়স শূণ্য থেকে দশ বছরের মধ্যে। এসব শিশুদের একটিই প্রশ্ন ‘কেন তারা বিশ্বের অন্য শিশুদের মতো বাঁচতে পারবে না, আমাদেরকে স্বাধীনভাবে বাঁচতে দাও’। শিশুদের তো কোন মাজহাব বা ধর্ম নেই। সব শিশুই জন্মগ্রহণ করেন এক আল্লাহপাকের উম্মত হিসেবে কিন্তু পরবর্তিতে পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে একেক জন ভিন্ন ভিন্ন মত-পথ অনুসরণ করে।

বেশ অনেক বছর ধরেই মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইয়েমেনে সৌদি আরবের নেতৃত্বে চলছে মাজহাবি যুদ্ধ। ওয়াহাবী আর সুন্নিরা আক্রমণ চালাচ্ছে শিয়াদের ওপর। ইয়েমেনের রাজধানী সানায় যুদ্ধবিমান থেকে একের পর এক বোমাবর্ষণও তখন প্রায় করা হত আর এতে প্রাণ হারাত শতশত ইয়েমেনি মুসলমান। যেহেতু সৌদি আরবের অর্থের কোনো সমস্যা নেই তাই সৌদি আরবের সাথে মিসর, জর্ডান, মরক্কো, সুদান, পাকিস্তানসহ বেশ কয়েকটি মুসলিম দেশ একাত্মতা ঘোষণা করতেও আমরা দেখেছি।

অপর দিকে ইয়েমেনে হামলায় সৌদি আরবকে অস্ত্রপাতি সরবরাহ ও গোয়েন্দা সহায়তা দিয়ে থাকে যুক্তরাষ্ট্র। এ ধরণের বিষয়গুলো আমাদেরকে অনেক ভাবিয়ে তুলে। এক মুসলমান ভাই অপর মুসলমানের আঘাতে মড়ছে আর এর জন্য সহায়তা করছে অপর কেউ অথচ আমরা পড়ে আছি মাজহাব নামক শব্দের খাঁচায় বন্দি হয়ে।

কবি নজরুল যথার্থই বলেছেন, ‘কাহারে করিছ ঘৃণা ভাই, কাহারে মারিছ লাথি? হয়তো উহারই বুকে ভগবান জাগিছেন দিবারাতি।’ আবার তিনি গেয়েছেন- ‘তুমি চাহ নাই ধর্মের নামে গ্লানিকর হানাহানি, তলওয়ার তুমি দাও নাই হাতে, দিয়াছ অমর বাণী, মোরা ভুলে গিয়ে তব উদারতা, সার করিয়াছি ধর্মান্ধতা, বেহেশত হতে ঝরে নাকো আর তাই তব রহমত। ক্ষমা করো হজরত।’

ফার্সি কবি হাফেজ সিরাজী কতই না চমৎকার লিখেছেন: ‘হে পবিত্রচেতা ব্যক্তিগণ, অন্যের দোষ খুঁজে বেড়িও না, হতে পারে তার পাপ তোমার ঘাড়ে বর্তায়। আমি পুণ্যবান বা পাপি যা-ই হই, তুমি নিজের পথ দেখ, প্রত্যেকেই যেমন কর্ম করবে, তেমন ফল পাবে। সচেতন-অচেতন প্রত্যেকেই নিজ প্রভুকে খোঁজে আর প্রত্যেক স্থানই প্রণয়ঘর, তা মসজিদ হোক বা ইবাদতগাহ। চীরস্থায়ী কল্যাণ থেকে আমাকে নিরাশ করো না, কে ভালো, কে মন্দ তার তুমি কি জান? তাকওয়ার দুর্গ থেকে আমিই একমাত্র বহিষ্কৃত হইনি, আমার পিতা আদমেরও হাতছাড়া হয়েছিল বেহেশত। হে হাফেজ! মৃত্যুর আগ মুহূর্তেও যদি এক ফোঁটা অমৃত পাও হতে পারে তা তোমাকে কুপথ থেকে জান্নাতে নিয়ে যাবে।’

তাই হে আদম সন্তান! আসুন না মাজহাবের নামে রক্তের হোলি খেলা বন্ধ করি। যার যার ধর্ম সে তার মত করে পালন করুক, কেউ যদি ধর্মের নামে অন্যায় কিছু করেও থাকে তাহলে তার বিচারের ভার মহান সৃষ্টি কর্তার কাছেই ছেড়ে দেই।

এইচআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]